ইসলামী মূল্যবোধে অবিচল আস্থা রাখতে, ঈমান বাঁচাতে, আমলের বিশুদ্ধতা নিশ্চিতকরণে ধর্মীয় শিক্ষার বিকল্প নেই। বর্তমান বাস্তবতায় সবার মাদরাসায় পড়া হচ্ছে না, সুযোগও সীমিত। কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা যে পদ্ধতিরই হোক, সবার জন্য সব ক্ষেত্রে ইসলাম শিক্ষা অতি জরুরি। ছোট্ট বাচ্চাটিও অনেক সময় বলে ‘ধর্ম বই ছুঁয়ে বলি’—এটাই ঈমান।
স্কুল-কলেজে ইসলাম শিক্ষা সম্পর্কে সর্বসাধারণের ধারণা অস্পষ্ট। অনেকে ভাবেন, এটা আরবি ভাষা-সাহিত্যের মতো কিছু, কারো কারো কাছে ইসলাম শিক্ষা হয়তো ইসলামের ইতিহাসের মতো মুখস্থনির্ভর বিষয়। ইসলাম শিক্ষা এমন নয়। ইসলাম শিক্ষা হলো সহজে ইসলাম বোঝার অনন্য উপায় এবং আদর্শ মুসলমান হওয়ার মাধ্যম।
সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের জন্য জাগতিক শান্তি, পারলৌকিক মুক্তির অবলম্বন—ইসলাম শিক্ষা। স্কুল-কলেজে ইসলাম শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে একনিষ্ঠ মুসলিমের জীবনযাপনের জন্য তৈরি করা হয়। অবাধ্য যৌবনের দুরন্তপনায় যেন নতুন প্রজন্ম অনাচার, অপরাধ ও মাদকের ছোবলে শেষ হয়ে না যায়, এ জন্যই প্রয়োজন ইসলাম শিক্ষা। এতে ইসলামের বিশ্বাসগত ও প্রায়োগিক এবং ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক ইবাদতের গুরুত্ব সম্পর্কিত বিষয় শিক্ষার্থী আত্মস্থ করতে পারে।
ঈমান-আমল ও ইবাদত, আখলাকের সুস্পষ্ট ধারণা সহজ-সাধারণ সিলেবাসে শিক্ষা দিলে শিক্ষার্থী তার পরিবার, সমাজ ও জাতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করে সহজেই ভালো-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে পারে। স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ পর্যায়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে ইসলাম শিক্ষার সিলেবাস এমনভাবে প্রণীত হয়েছে, যেন একজন শিক্ষার্থী তাওহিদ, রিসালাত, আমল, ইবাদত ও আখলাক সম্পর্কে অনুশীলনের দক্ষতা অর্জন করে। স্কুল-কলেজে ইসলাম শিক্ষার মাধ্যমে বাংলা ভাষায় ইসলামের মৌলিক বিষয়াদিসহ পবিত্র কোরআন, হাদিস, ইজমা, কিয়াস ও ফিকহশাস্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানার্জন সম্ভব। ইসলাম শিক্ষা আলিম হওয়ার বিকল্প উপায় নয়, বরং আদর্শ মুসলিম হওয়ার সহজ অবলম্বন।
মুসলিম শাসনামলে বাংলায় মুসলিম ভূ-সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ ছিল ইসলাম শিক্ষা বিস্তারে মসজিদ-মক্তবের জন্য ওয়াক্ফকৃত।
বাহাদুরশাহ জাফর ১৮৫৭ সালে বেনিয়াদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু করেন। তখন ব্রিটিশ দমনাভিযানে অসংখ্য আলেম-উলামা, সুফি-দরবেশ, কবি-সাহিত্যিককে নির্দয়ভাবে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া হয় বাহাদুরশাহ পার্কের গাছের ডালে ডালে
এমন পরিস্থিতিতেই ১৭৮০ সালে কলকাতা আলিয়া (মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আলিয়া মাদরাসা ধারা এবং ১৮৯৬/১৮৯৯ সালে (১৩১০ হি.) চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কওমি শিক্ষার সূচনা হয়।
১৯১৪ সালে শামসুল উলামা অধ্যক্ষ আবু নসর ওয়াহিদের নেতৃত্বাধীন মোহমেডান এডুকেশন অ্যাডভাইজারি কমিটি ওল্ড স্কিম ও নিউ স্কিম দুই ধরনের মাদরাসা শিক্ষা পদ্ধতির ধারণা দেন। নিউ স্কিম পদ্ধতিতে জুনিয়র ও সিনিয়র দুই ধারার শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই মুসলমানদের জন্য বিশেষায়িত স্কুল-কলেজ সৃষ্টি হয়। সেসব স্কুল-কলেজে ইসলাম শিক্ষা ও আরবির পাশাপাশি ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। তখন আরবি ও ইসলাম শিক্ষাকে একত্রে বলা হতো ‘দ্বিনিয়াত’ পরবর্তী সময়ে ‘ইসলামিয়াত’। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে বলা হতো ‘অ্যারাবিক অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ’ পরে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজ দুটি আলাদা বিভাগ হয়। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে বলা হতো ‘ইসলাম শিক্ষা’। এখন স্কুলে বিষয়টির নাম ‘ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা’।
১৯২১ সালে তিনটি অনুষদ ও ১২টি বিভাগ নিয়ে একটি আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রাকালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি বিভাগ।
একই সঙ্গে মুসলিম ও বাঙালি পরিচয়ের তাগিদে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক মুসলিম এডুকেশন ফান্ড গঠন করে ছাত্রবৃত্তি প্রবর্তন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মুসলিম শিক্ষার্থীদের স্বার্থে বাংলায় পৃথক মুসলিম শিক্ষা পরিদপ্তর গঠন এবং সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। দু:খজনক সত্য, এখন স্বাধীন দেশে ইসলাম শিক্ষাকে ভয় পায় অনেকেই। ইসলাম শিক্ষায় ভালো না করায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর গোল্ডেন এ প্লাস ছুটে যাচ্ছে। কারণ ইসলাম শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাওয়া। কলেজ পর্যায়ে স্রেফ মানবিক শাখায় ‘ইসলাম শিক্ষা’ ঐচ্ছিক। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় ‘ইসলাম শিক্ষা’ বাধ্যতামূলক হওয়া সময়ের দাবি এবং জরুরি।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান , ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ , কাপাসিয়া, গাজীপুর ।
৭ মে ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur