দুর্যোগ কখনো বলে কয়ে আসে না। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই আমাদেরকে বাঁচতে হয়। জ্বালানি তেলের মজুদ-কালোবাজারি ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ, দায়িত্বশীলতাই দুর্যোগ মোকাবেলায় বড়ো গ্যারান্টি। তবে দুর্যোগ যেন আমাদের সমাজের কিছু মানুষকে আরো অসৎ প্রবণ করে তোলে। করোনাকালীন সময় যেমন মানবিক মানুষ সৃষ্টি হয়েছে তেমনি ছিলো কিছু অসৎ মানুষের তৎপরতাও।
দুর্যোগকালীণ সময়ের জন্যই যেন কিছু মানুষ অপেক্ষা করে অধিক মুনাফা নিয়ে রাতারাতি টাকাওয়ালা হওয়ার জন্য। এসব মানুষ সমাজে ভালো মানুষ সেজে নিকেজে একজন ব্যাবসায়ী হিসেবে জাহির করে। এরা কোন সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষ নয়। তারা এই সমাজের প্রতিষ্ঠিত ভালো মানুষ হিসেবে ভালো ব্যাবসায়ী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু যখনই কোন আইন তাদেরকে পাকড়াও করে তখন মানুষ বুঝতে পারে তাদের ভালো মানসিকতার আড়াতে কতো বড়ো একটি অসৎ মানুষ লুকিয়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্ব বাজারে যখন জ্বালানী তেল নিয়ে সঙ্কট তীব্র হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সঙ্কট তীব্র হচ্ছে তখন আমাদের দেশের সরকার দেশের মানুষকে সেই দুর্যোগের কবল থেকে রক্ষা করতে প্রাণপন চেষ্টা করে চলেছেন। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে এখনো এক পয়সাও বাড়ানো হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বার বারই বলা হচ্ছে আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের সঙ্কট নেই। কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি বিচার করে আমাদেরকে কিচ্ছতা সাধন করে চলতে হবে। তাই সবাইকে জ্বালানি তেল ব্যাবহারে স্বাস্রয়ী হওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
সরকার বলছে আমাদের দেশে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে এবং প্রয়োজন মতো জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি বাংলাদেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের সাথে ইরান ও রাশিয়ার সাথে অত্যন্ত সুসম্পর্ক অটুট রয়েছে। তাই বলা যায় বিশ্ব পরিস্থিতি যতো খারাপই হোকনা কেন বাংলাদেশ অন্তত জ্বালানি তেলে ভুগবে না। তবুও পরিস্থিতি অনুযায়ি আমাদেরকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। তবে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে বিশ্বের কোন দেশই একেবারে নিশ্চিন্ত নয়। তাই সরকারের পক্ষ থেকে একদিকে যেমন অভয় দেয়া হচ্ছে তেমনি সরকার জনসাধারণকেও সরর্ক করছে। যাতে বিশ্বপরিস্থিতি যতো খারাপের দিকেই যাক না কেন আমাদের দেশ যেন জ্বালানি তেলে নিরাপদ থাকে। আর এটা সরকারের একার পক্ষে ধরে রাখা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। এর জন্য দেশের প্রতিটি নাগরিককেই দায়িত্ব পালন করতে হবে যদি আমরা সভ্য জাতি হয়ে থাকি। দেশ এখন অনেকদুর এগিয়েছে। ২৪ এর গণ অভ্যুত্থান হয়েছে, অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। সম্ভবত আমাদের মনমানষিকতা ও নীতি নৈতিকতারও একটা বিরাট পরিবর্তন হয়েছে এই চব্বিশের সফতলার মাধ্যমে। তাই বলে সব অসৎপ্রবণ মানুষ রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে ভালো মানুষ হয়ে যাবে তাও আশা করা যাবে না। সমাজের কিছু উচ্ছিষ্ট লোক অসৎপ্রবণ থেকেই যাবে। তবে তাদেরকে চব্বিশের মতোই প্রতিহত করতে হবে সকলে মিলে। চব্বিশের মতোই মুখোশ পড়া অসৎ মানুষগুলোকে টেনে আনতে হবে জনসমুখ্যে। এর জন্য প্রশাসনকে সহায়তা করতে পারলে আমরা যে কোন সঙ্কট মোকাবেলা করতে পারবো। এছাড়া যাতা মোটর সাইকেল ব্যবহার করেন তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। আমরা মনেকরি মোটরসাইকেল ব্যবহারকারিরা অত্যন্ত সচেতন। তাদেরকে বুঝতে হবে জ্বালানির দাম যতোই হোক মোটরসাইকেল বন্ধ হয়ে যাবে না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি মজুদ করার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনেকরি না। তাই এই মুহুর্তে সবাইকে আরো সচেতন হতে হবে। মোটর সাইকেল চালানোর জন্য অন্তত অসৎ হওয়ার প্রয়োজন নেই। এমন মানসিকতা সম্পন্নরাই মোটরসাইকেল চালান। অন্যান্য যানবাহনের মালিকরাও জ্বালানি মজুদ করার প্রয়োজন আছে বলে কোন যৌক্তিক কারণ নেই। কারণ সরকার যানবাহন সচল রাখার জন্য সব ধরনের পরিকল্পনা নিয়েছেন। তাই বিনা প্রয়োজনে সিজনালী অসৎ ব্যবসায়ীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া একেবারেই বেমানান তাদের জন্য। সবার দায়িত্ব হলো এখন অসাদু উপায় অবলম্বনকারীদের ঠেকানো। তাদেরকে ঠেকাতে পারলেই সবাই ভালো থাকবেন এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।
একথা সত্য যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহব্যবস্থায় বাধা তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ দেশে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, অনেক দেশেই গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। তেল সরবরাহব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন এনেছে। তেলের মজুদ ঠেকাতে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকার এও বলেছে, আপাতত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হবে না। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের আমদানি অব্যাহত রেখেছে, যাতে প্রকট না হয়ে ওঠে সংকট। তবে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের অসৎ মজুদদারি ও কালোবাজারি ঠেকানো।
জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থা এবং মনিটরিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত জ্বালানি বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে বলেন, সাধারণ মানুষ যদি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকারের নিয়ম মেনে জ্বালানি তেল সংগ্রহ এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতো, তা হলে খুব সহজেই সংকটকালীন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যেত। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষের যে কোনো সংকটে বিপরীত অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি বাজেভাবে ফুটে ওঠে।
সরকারি কর্মকর্তারা বলেন, একই মানুষ বারবার তেল সংগ্রহ করছে, পেট্রলপাম্প মালিক, ডিলার থেকে শুরু করে জ্বালানি তেল ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন মানুষের মধ্যে তেল মজুদ করার প্রবণতা প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে মজুদদারি ঠেকানো। সরকার অবশ্য সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। প্রত্যেক জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, বিভাগীয় কমিশনার সবাইকে তেলের মজুদ ঠেকাতে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে সরবরাহব্যবস্থার সামগ্রিক বিষয়ে বলেন, সরকার জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে। তবে জ¦ালানি তেল মজুদ করে রাখার প্রবণতা আশঙ্কাজনক। আমরা সারাদেশে ২ হাজার ৪২২টি অভিযান পরিচালনা করেছি। ৬৭১টির বেশি মামলা হয়েছে। প্রায় ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে। মজুদদারির অপরাধে ১২ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ সময় প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে, যার মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৯৬৫ লিটার ডিজেল, ২২ হাজার ৫৩৯ লিটার অকটেন। পেট্রল রয়েছে ৪৬ হাজার ১৪৬ লিটার।
সম্প্রতি দেশের সব পুলিশ সুপারের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। তাদের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তেলের মজুদ, কালোবাজারি প্রতিরোধে কঠোর হতে বলা হয়েছে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, জ্বালানি তেল মজুদ করার প্রবণতা নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট রয়েছে; যেখানে দেখা গেছে, তেলের সংকটকে রাজনৈতিভাবে ব্যবহার করতে চেষ্টা করছে একটি পক্ষ। যুদ্ধের কারণে এমনিতেই সরবরাহব্যবস্থা কিছুটা নড়বড়ে, সেখানে মজুদদারি করে বড় আকারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে চায় একটি গোষ্ঠী। সরকার খতিয়ে দেখেছে যে একই লোক একাধিক পেট্রলপাম্পের মালিক, আবার একদিকে তেলের ডিলার, জ্বালানি তেল পরিবহন মালিক। বিগত সময়গুলোতে কাকে কীভাবে জ¦ালানি তেলের ডিলারশিপ, পেট্রলপাম্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেসব বিষয় খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এদিকে দেশের প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দিয়েছে সরকার। গতকাল নির্ধারিত তাদের কর্মপরিধির মধ্যে রয়েছে- ফিলিং স্টেশনের দৈনিক প্রারম্ভিক মজুদ রেকর্ডভুক্ত করা, ডিপো থেকে সরবরাহ করা জ্বালানি তেল স্ব স্ব ফিলিং স্টেশনে উপস্থিত হয়ে পরিমাপ করে গ্রহণ করা এবং ফিলিং স্টেশনের পে-অর্ডার ও ডিপোর চালান-রিসিটের সাথে তেলের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা। ফিলিং স্টেশনে ডিপ রড বা ডিপ স্টিকের মাধ্যমে সরবরাহ করা জ্বালানি তেল বুঝে নেওয়া। ফিলিং স্টেশনে সংরক্ষিত রেজিস্টারে ডিপো থেকে দৈনিক জ্বালানি তেল গ্রহণের হিসাব লেখা হয়েছে কিনা তা মনিটর করা। ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং মেশিনের দৈনিক মিটার রিডিংসংক্রান্ত রেজিস্টার পর্যবেক্ষণ করে দৈনিক বিক্রির সাথে মিলিয়ে দেখা। দৈনিক বিক্রি শেষে ফিলিং স্টেশনের সমাপনী মজুদ পর্যালোচনা। ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং মেশিনের পরিমাপ যথাযথ হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত তদারকি করা। ফিলিং স্টেশন অনুমোদনপ্রাপ্তির সময় বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যানে পণ্যভিত্তিক মজুদ ক্ষমতার তথ্য এবং বিদ্যমান মজুদ ক্ষমতার তথ্য যাচাই করা। ফিলিং স্টেশনের আশপাশে অননুমোদিত ট্যাংক-স্থাপনা আছে কিনা তা পরীক্ষা করা। ডিপো থেকে পাম্প এবং পাম্প থেকে ভোক্তা সরবরাহব্যবস্থা দৃশ্যমান করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রতিটি ডিপো, ট্যাঙ্কার, পাম্প এবং খুচরা বিক্রির তথ্য একত্রে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রতিটি পাম্পে দিনে অন্তত তিনবার (সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা) স্টক আপডেট বাধ্যতামূলক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ডিপো থেকে জ্বালানি নেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খুচরা বিক্রি শুরু না করলে তা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি গ্রহণের ১ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি শুরু বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রথমবার সতর্কতা, দ্বিতীয়বার মোবাইল কোর্ট, তৃতীয়বার সাময়িক স্থগিতাদেশ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পাম্প খোলা আছে কিনা, স্টক রেজিস্টার সঠিক আছে কিনা, ডিসপ্লে বোর্ড আছে কিনা, ক্যাশমেমো দেওয়া হচ্ছে কিনা, নির্ধারিত সীমা মানা হচ্ছে কিনা, কনটেইনারে অবৈধ বিক্রি হচ্ছে কিনা, সারি ব্যবস্থাপনা কেমন এসব বিষয় জিও-ট্যাগ প্রমাণসহ রিপোর্ট করা।
॥ এম ফরিদুল ইসলাম ॥
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur