সারাদেশ

৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণে অর্থায়ন করছে না সৌদি আরব

প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের বিবেচনায় নিজস্ব অর্থায়নে এ বছরই মডেল মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে। এজন্য এ মাসেই টেন্ডার আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, প্রথম দফায় ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে ১০টি মসজিদ নির্মাণ করা হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে সর্বমোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি সৌদি অর্থায়নে হওয়ার কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে সৌদি আরব এ বিষয়ে নিরব থাকায় ধর্ম মন্ত্রণালয় নিজস্ব অর্থায়নেই এ প্রকল্পের কাজ শুরু করছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করবে গণপূর্ত অধিদফতর। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত। ৬৪টি জেলা সদর ও পাঁচটি সিটি করপোরেশনে চারতলা বিশিষ্ট এবং ৪৭৫টি উপজেলা সদরে তিনতলা বিশিষ্ট মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এছাড়া উপকূলীয় ১৬টি এলাকায় নিচতলা ফাঁকা রেখে চারতলা বিশিষ্ট মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।

জানা গেছে, মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন রকমের নাগরিক সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নিচতলায় দুর্যোগের সময় ‘সাইক্লোন সেন্টার’ হিসেবেও ব্যবহার করার সুযোগ থাকবে। মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে মোট চার লাখ ৪০ হাজার ৪৪০ জন পুরুষ এবং ৩১ হাজার ৪০০ জন মহিলার নামাজ পড়ার সুবিধা রাখা হচ্ছে। কোরআন-হাদিসের জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে ৩৪ হাজার পাঠকের জন্য লাইব্রেরি সুবিধা রাখা হয়েছে। এসব লাইব্রেরিতে প্রতিদিন ছয় হাজার ৮০০ গবেষক গবেষণা করতে পারবেন। প্রতিদিন ৫৬ হাজার মুসল্লির দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধাও থাকবে। প্রতিবছর ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর কোরআন হিফজ করার সুবিধা ছাড়াও ১৬ হাজার ৮০০ শিশুর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের ব্যবস্থাও রাখা হবে।

এছাড়াও দুই হাজার ২৪০ জন দেশি-বিদেশি অতিথির আবাসনের সুবিধাও থাকবে এসব কেন্দ্রে। মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা ছাড়াও হজযাত্রী ও ইমামদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে।

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশে প্রায় তিন লাখ মসজিদ রয়েছে। এসব মসজিদের সিংহভাগই স্থানীয় জনগণের আর্থিক সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের ২০১৪ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে উন্নত মসজিদ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। ২০১৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে লাইব্রেরি, গবেষণা কক্ষ, ইসলামিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, শিশু শিক্ষা কার্যক্রম, পুরুষ ও মহিলাদের পৃথক নামাজ কক্ষ, দেশি-বিদেশি মেহমানদের আবাসন ব্যবস্থা, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ইত্যাদি সুবিধা সম্বলিত মডেল মসজিদ নির্মাণের নির্দেশনা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৬ সালে জুনে সৌদি আরব সফরে গিয়ে সৌদি বাদশাহর সঙ্গে আলোচনায় দেশব্যাপী মডেল মসজিদ নির্মাণের বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি। এরপর সৌদি সরকার এ প্রকল্পে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। পরে ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল এ প্রকল্পের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ৯ হাজার ৬২ কোটি ৪১ লাখ টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়। এরমধ্যে আট হাজার ১৬৯ কোটি ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা সৌদি সরকারের দেওয়ার কথা। বাকি ৮৯২ কোটি ৬১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা খরচ করার কথা বাংলাদেশ সরকারের।

সূত্র জানায়, একনেকে অনুমোদন হওয়ার এ প্রকল্পে সৌদি অর্থায়নের বিষয়টি অজ্ঞাত কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মুহাম্মদ আব্দুল হামিদ জমাদ্দার বলেন, ‘সৌদি আরব অর্থ দেবে না- এমন কোনও কথা তারা বলেনি। আমরা এখনও আশাবাদী তারা এ প্রকল্পে অর্থ সহায়তা দেবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিজস্ব অর্থায়নেই মডেল মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করে দিয়েছি। এ মাসেই ঢাকাসহ দেশের আটটি বিভাগীয় শহরে ১০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এ বছরের মধ্যেই এসব মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু করার ইচ্ছা আছে।’

এ ব্যাপারে ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান বলেন, ‘তৃণমূল পর্যন্ত ইসলাম ধর্মের সঠিক প্রচার-প্রসার, ধর্মীয় সভা সেমিনার আয়োজন ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান, হজযাত্রীদের প্রশিক্ষণ, হামদ-নাত-ক্বেরাত প্রতিযোগিতা তথা ইসলামিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, ইসলামিক রিসার্চ, ইমাম মুয়াজ্জিনের ট্রেনিং, সামাজিক সমস্যা- বাল্য বিবাহ, যৌতুক ও মাদকসহ নানা সমস্যার সামাজিক সমাধানে আলেমদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে এ মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।’ এ দেশের সর্বস্তরের আলেমদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও এ প্রকল্প অনেক বড় ভূমিকা রাখবে বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রী।

Share