৩১% সড়ক দুর্ঘটনাই মোটরসাইকেলে

দেশে মোটরসাইকেলের চাহিদা ও জনপ্রিয়তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যাও। এসব ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে প্রতিবছর। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত তিন বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ১৪ হাজার ৭৯৯টি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৬ হাজার ৯৩০ জন। এই তিন বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটেছে কমপক্ষে ৪ হাজার ৬৪৮টি। এতে প্রাণ গেছে অন্তত ৪ হাজার ৬২২ জনের। অর্থাৎ এই তিন বছরে মোট দুর্ঘটনার ৩১ শতাংশই ঘটেছে মোটরসাইকেলে। আর দুর্ঘটনায় নিহতদের ২৭ শতাংশই মারা গেছেন মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়।

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১ হাজার ১৮৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৯৪৫ জন মারা গেছেন। ২০২০ সালে ১ হাজার ৩৮১টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৪৬৩ জন মারা গেছেন। ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় ২ হাজার ২১৪ জন নিহত হয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৬ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ৫০ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং প্রাণহানি বেড়েছে ৫১ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত ও সহজলভ্য না হওয়ায় এবং যানজটের কারণে মোটরসাইকেল ব্যবহারে মানুষের উৎসাহ বাড়ছে; পাশাপাশি রাইড শেয়ারিংয়ের কারণে মোটরসাইকেলের চাহিদা আরও বেড়েছে। এ ছাড়া চার চাকার যানের চেয়ে দামে সাশ্রয়ী হওয়ায় মোটরসাইকেল এখন মানুষের হাতের নাগালে। তবে মোটরসাইকেলচালকদের বেশির ভাগই কিশোর ও তরুণ। মোটরসাইকেল চালানোর সময় তাঁদের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা রয়েছে। বেপরোয়া গতিতে নিয়ম না মেনে মোটরসাইকেল চালাতে গিয়ে তাঁরা নিজেরা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং তাঁদের ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ পথচারীদেরও।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘ট্রাফিক আইন না মেনে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য মোটরসাইকেলের ব্যবহার কমাতে হবে, এ জন্য বাড়াতে হবে গণপরিবহন। কিন্তু তা না করে মোটরসাইকেলের আমদানি, উৎপাদন ও বিপণনে সমস্ত শর্ত শিথিল করে সরকার মানুষকে এই যান ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে দেশে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে। ২০১৩ সালে সারা দেশে মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে ৮৫ হাজার ৩২১টি। ২০১৪ সালে নিবন্ধন হয়েছে ৯০ হাজার ৪০১টির। ২০১৫ সালে মোটরসাইকেলের সংখ্যা হয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১০টি, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। ২০১৬ সালে ৩ লাখ ১৫ হাজার ৮৯টি এবং ২০১৭ সালে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৪৭৬টি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে। ২০১৯ সালে নিবন্ধন হয়েছে ৪ লাখ ১ হাজার ৪৫২টি মোটরসাইকেলের। ২০২০ সালে করোনার মহামারির সময় কিছুটা কমে নিবন্ধনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ লাখ ১১ হাজার ১৬টি। তবে ২০২১ সাল থেকে নিবন্ধনের হার আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, এ বছর নিবন্ধিত হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার ২৫২টি। গত বছর পর্যন্ত সারা দেশ মিলিয়ে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা হয়েছে ৩৫ লাখ ৯০৫টি। অবশ্য এর বাইরে বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত মোটরসাইকেলও চলছে রাস্তায়।

এ প্রসঙ্গে বুয়েটের সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘মোটরসাইকেলের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না। গত ১০ বছরে যে পরিমাণ মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ৪০ শতাংশ গাড়িচালকেরই লাইসেন্স নেই। এর পেছনে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিআরটিএরও দায় রয়েছে।’

লাইসেন্স ছাড়া চালক এবং বেপরোয়া গতির কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বাড়ছে স্বীকার করলেও বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ‘মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়লে দুর্ঘটনা বাড়বে ব্যাপারটা এমন নয়। দুর্ঘটনা কমাতে আমরা বছরজুড়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করছি।’

Share