২৭ বছর প্রবাসে, ১৫ বছর ‘বনবাসে’ কাটিয়ে দেশে ফিরলেন আমির
মালয়েশিয়ার গহীন জঙ্গলে ১৫ বছরসহ দীর্ঘ ২৭ বছর পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকা আমির হোসেন তালুকদার অবশেষে দেশের মাটিতে পা রেখেছেন।
দীর্ঘ তিন দশক আগে জীবিকার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমানো এই মানুষটির ফিরে আসার আশা একসময় ছেড়েই দিয়েছিলেন স্বজনেরা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এবং ব্র্যাকের সহযোগিতায় গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন তিনি পৌঁছান, তখন সেখানে এক আবেগঘন দৃশ্যের অবতারণা হয়।
তিন দশক আগে যখন আমির হোসেন মালয়েশিয়া যান, তখন তার ছেলে রফিকুল ইসলাম বাবুর বয়স ছিল মাত্র সাড়ে তিন বছর। বাবার স্মৃতি বলতে তেমন কিছুই মনে নেই তার। বিমানবন্দরে বাবাকে ফিরে পেয়ে বাবু বলেন, ‘আমার বাবা ১৫ বছর মালয়েশিয়ার জঙ্গলে পড়ে ছিলেন। সাংবাদিকদের সহায়তায় বাবাকে ফিরে পাওয়া আমাদের জন্য পরম আনন্দের। প্রথমে পুরনো ছবির সাথে বর্তমান চেহারার মিল খুঁজে পাচ্ছিলাম না, পরে ভিডিও দেখে নিশ্চিত হয়েছি যে উনিই আমার বাবা।’
আমির হোসেনের শ্যালক আব্দুর রউফ জানান, বিদেশে যাওয়ার প্রথম তিন বছর পর্যন্ত পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সেই সময় বড় মেয়ের বিয়ের জন্য তিনি টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর থেকেই হঠাৎ সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন যে হয়তো কোনো দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে। তবে ছয় মাস আগে ফেসবুকে একটি পোস্টের মাধ্যমে জানা যায়, তিনি মালয়েশিয়ার একটি জঙ্গলে টিনের ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের কর্মকর্তা মো. আল-আমিন নয়ন জানান, প্রবাসীদের মাধ্যমে আমিরের দুরবস্থার খবর পাওয়ার পর ব্র্যাক ও কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি মিলে তার পরিবারের সন্ধান শুরু করেন। প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পী কুমার দাসের সহায়তায় বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। ব্র্যাকের পক্ষ থেকে আমিরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
দীর্ঘদিন প্রতিকূল পরিবেশে থাকায় মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন আমির হোসেন। ফেলে আসা দিনগুলোর কথা স্পষ্টভাবে গুছিয়ে বলতে না পারলেও তিনি জানান, বারবার মোবাইল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাওয়ায় তিনি পরিবারের নম্বর হারিয়ে ফেলেন। একসময় অসুস্থ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেললে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ ১৫ বছর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন জঙ্গলে অন্যের দেওয়া খাবারে বেঁচে ছিলেন তিনি। তবে সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে পরিবারের কাছে ফিরতে পেরে আমির হোসেন এখন অত্যন্ত আনন্দিত। বিমানবন্দরে তাকে বরণ করে নিতে উপস্থিত ছিলেন তার দুই ছেলে ও নাতিসহ অন্য স্বজনেরা।
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
২৯ এপ্রিল ২০২৬