ফিচার

নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ মারা ‘গডফাদারদের’ শাস্তি হবে কী ?

প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় পদ্মা-মেঘনাসহ দেশের সাত হাজার বর্গকিলোমিটার নদী এলাকায় অভয়াশ্রম ঘোষণা করেছে সরকার।

এই সময়টায় নদীতে সকল প্রকার মাছ আহরণ বন্ধসহ মা ইলিশ ও জাটকা ইলিশ আহরণ, বিক্রয়, বিপনন, মজুদ কিংবা বাজারজাতকরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিগত দিনের ন্যায় এবারও মা ইলিশ রক্ষায় চাঁদপুর প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

জেলা ও উপজেলা ট্রাক্সফোর্সের চলমান ২২দিনের অভিযানে অনেক অনেক জেলে আটক করা হয়েছে।

জব্দ করা হয়েছে প্রচুর পরিমাণে জাল, নৌকা ও মা ইলিশ। জাতীয় সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের এই যে ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা, নির্ঘুম নদী পাহারা তা কিন্তু মূলত জেলেদের জন্যই। কারণ মা ইলিশের ডিম থেকে জন্ম নেয়া ইলিশ এই জেলেরাই আহরণ করবে।

এখানে প্রশাসন কিংবা অন্য পেশার মানুষ নদীতে জাল ফেলবে না। তাই রাষ্ট্রিয় সম্পদ রক্ষায় প্রশাসন অবশ্যই অান্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতার দাবীদার।

নিজেদের জীবন বাজী রেখে বিশাল এই নদীতে ক্লান্তিহীন পরিশ্রমের জন্য আমরা প্রশাসনকে ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি সাধুবাদ জানাই। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বিগত দিনের আলোকে একটা প্রশ্ন থেকে যায়। তা হলো, চলমান এই অভিযানে এতো এতো সাধারণ জেলে আটক হলেও কোন আড়ৎদার বা দাদনদার আটক হয়েছে কী???।

অথবা অতিতে আটক করা হয়েছে কী???

সরকারের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে সকল আড়তদার- দাদনদার অসহায় গরীব জেলেদের দারিদ্রতাকে পুঁজে করে তাদের নদীতে নামিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিচ্ছে- তাদের কী কোনো শাস্তি হবে না???।

মাদকের পাইকারি বিক্রেতা বা পাচারকারিদের যদি ‘গডফাদার’ বলা হয়, তবে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ নিধনকারী আড়তদার-দাদনদারদের ‘গডফাদার’ আখ্যায়িত করা হবে না কেনো???।

মাদক বিক্রি ও পাচারসহ এর সাথে বড়ভাবে জড়িত থাকার কারণে মাদকের ‘গডফাদার’দের যদি শাস্তি বড় হয়, যদি এমন বড় অপরাধের কারণে তারা ক্রোসফায়ারের আওতায় আসে তবে সরকারের নির্দেশ অমান্যকারি ইলিশ নিধনের ‘গডফাদারা’ এর চেয়েও কম শাস্তি পাবে না কোনো???।

একটু গভীরে ভেবে দেখুন, সামান্য কিছু টাকার জন্য জীবন আর জেলের ভয় পাছে ফেলে যেসকল জেলেরা নদীতে নামছে তাদের অন্য, বস্ত্র বাসস্থান কিংবা পারিবারিক অবস্থান কোথায়।

ভাগ্যের করুন পরিণামে এইসব মানুষগুলো সমাজের কোন অবস্থান থেকে বড় হচ্ছে, তাদের আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠছে!

শিক্ষা, সাস্থ্য, বাসস্থান কিংবা উন্নত জীবনযাপনের সকল সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত এসব মানুষগুলো রাষ্টের আইন-কানুন, দেশপ্রেম অথবা বিবেকবুদ্ধিতে কতটাই বা সচেতন???।

রাতের আঁধারে নদীতে ইলিশ শিকারে নেমে প্রশাসনের হাতে আটক হওয়া একেকটা জেলেদের চোখে এতটুকু মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখুন- কতটা কষ্ট, ক্ষোভ, হতাশা সেখানে প্রশ্ন তুলছে। ওদের তেলচুকচুকে রোদ্রো পোড়া কালো কপালটায় কতো হতাশা জমা আছে একটু ভেবে দেখুন!

গত কয়েকদিন প্রশাসনের সাথে মা ইলিশ রক্ষার অভিযানে অংশ নিয়ে যা উপলব্ধি করেছি তা হলো- জেলেরা এত ভয়-ডরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে কারণ তারা গরীব। পেটে ক্ষুধা থাকলে দেশপ্রেম, আইন, মানবতা, ভয়-ডর কিছুই সামনে আসে না। ভাগ্যহত এই অসহার দরিদ্র মানুষগুলোর ক্ষুধা-দারিদ্রতাকে পুঁজি করেই তো ওইসব লোভী ক্ষমতাশীল আড়তদার-দাদনদারা তাদের নদীতে নামাচ্ছে।

আমি বলছি না এখানে জেলেদের দোষ নেই অথবা আমার এমন যুত্তিতে জেলেদের সাঁজা দেয়া বন্ধ করা হোক! বলছি- জেলেদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যারা রাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন করে লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিচ্ছে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হোক। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রিয় আইন অমান্য করার অপরাধে মামলা করা হোক।

আমার জানামতে এমন বহু আড়তদার রয়েছে যাঁদের নিয়ন্ত্রণে থেকে (দাদর দেয়া) প্রতিদিন ১শ’র অধিক জেলে নৌকা নদীতে মা ইলিশ শিকার করছে। একেকটি নৌকা প্রতিদিন গড়ে (একবার নদীতে নেমে) ২০ হাজার টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকার মা ইলিশ মেরে বিক্রি করছে।

হিসেব মিলিয়ে দেখুন, এই টাকার কি পরিমাণ অংশ গডফাদারদের পকেটে যাচ্ছে। এই কাজে তাদের একমাত্র হাতিয়ার হলো রাজনীতিক দল আর টাকার প্রভাব। এভাবে টাকা কামিয়ে তারা আড়তদার থেকে রাজনীতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, বড় ব্যবসায়ী বনে যাচ্ছে। বিপরীতে অসহায় জেলেরা দাদনের জালে আটকে যুগের পর যুগ জাইল্লাই থেকে যাচ্ছে।

তাই আশা রাখি আগামীতে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ ধরার অপরাধে জেলেদের পাশাপাশি প্রভাবশালী অসাধু আড়তদার, দাদনদারদেরও আটক করা হবে। শুধু আটক নয়- কঠিন শাস্তির আওতায় আনা হবে।

নয়তো প্রশাসন যতই রাত জেগে, নির্ঘুম থেকে, না খেয়ে নদী পাহাড়া দিক… মিডিয়া যত সংবাদ করুক, সুশীল সমাজ যতই সচেতনতার বুলি আওড়াক- ক্ষুধার্ত গরীব জেলেরা নদীতে নামবেই। কারণ টাকার লোভ আর একটু ভালো থাকতে সবাই চায়।

লেখক: আশিক বিন রহিম
সাহিত্য ও সংবাদকর্মী

Share