হাজীগঞ্জে শিক্ষক তৈরির কারখানার নাম আলীগঞ্জ পিটিআই

হাজীগঞ্জ উপজেলা কমপ্লেক্সের পশ্চিম পাশে অবস্থিত আলীগঞ্জ প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সিটিটিউটটি হলো চাঁদপুরের একটি শিক্ষক তৈরির কারখানা। প্রায় ৭০ বছর ধরে হাজীগঞ্জে নতুন নতুন প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে যোগদান করা শিক্ষক -শিক্ষিকাগণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। যা চাঁদপুর জেলার প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলছে। এক কথায় বলা যায়- এটি একটি শিক্ষক তৈরির কারখানা। শুধু হাজীগঞ্জ নয় ; এটি চাঁদপুরবাসীরও একটি শিক্ষার আলোকবর্তিকা হিসেবে আলো বিতরণ করছ্।ে অথচ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদেও কোনোই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা ইন্সিটিটিউট নেই।

১৯৫৩ সালে সাড়ে ৭ একর ভূমির ওপর এ ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ নামে এটি চালু হয়। সরকারিভাবে এর নাম পরিবর্তন হয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সিটিটিউটে পরিণত হয়। এখানে মহিলা শিক্ষিকাদের আবাসিক নিরাপত্তাসহ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। এক সময় এ প্রশিক্ষণটির নাম ছিলো সি-ইন-এড। বর্তমানে এর নাম ডিপিএড। আন্তর্জাতিক চাহিদায় প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে বর্তমান এ কোর্সটি চালুূ করা হয়েছে। যোগ্যতাভিত্তিক ব্যক্তিগত বা কাংখিত কাঠামো অর্জনে এখানে সকল কারিকুলাম বিদ্যমান ।

শিক্ষকরা হলেন মানুষ গড়ার কারিগর। আর প্রশিক্ষণ ইন্সিটিটিউটটি হলো দক্ষ শিক্ষক তৈরির কারখানা। প্রতি বছরের পরিবর্তিত, মার্জিত. সংশোধিত ও সংযেজিত কারিকুলাম অনুয়ায়ী শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদান পারদর্শি করার কাজই এ প্রশিক্ষণ ইন্সিটিটিউটটির। বর্তমানে এ প্রশিক্ষণ কোর্সও নাম পরিবর্তন হয়েছে যার নাম হলো-‘ ডিপ্লোমা-ইন- প্রাইমারী এডুকেশন ’। সংক্ষেপে বলা হয়-‘ ডিপিএড’। কোর্স মেয়াদ হলো দেড় বর্ছ্।

চলতি ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মেযাদ আগামি ৩০ জুন শেষ হব্।ে প্রশিক্ষণার্থীও সংখ্যা ৩শ ৮৯ জন। দু’ সিফটে চলছে। ২ জন সহকারী সুপারিন্টেডেন্ট ও ৯ জন প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন্। নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাগদের বর্তমানে এ ‘ ডিপ্লোমা-ইন-প্রাইমারী এডুকেশন‘ কোর্স সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের রেওয়াজ অনুযায়ী নতুনভাবে একজন শিক্ষক নিয়োগ পাওয়া মাত্রই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের নির্দেশে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে চাঁদপুরের একমাত্র আলীগঞ্জ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সিটিটিউটে দেড় বছরের প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্যে ভর্তি হতে হয় ।

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত ও শিশুদের মৌলিক গুণাবলি ও প্রাথমিক পর্যায়ে দক্ষতা অর্জনের ধাপসমূহ,কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন, ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনের ধাপসমূহ , প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলাম, সকল শ্রেণির সকল অধ্যায়গুলো পাঠ দানের কৌশল, শৃংখলাবোধ ও নীতি-নেতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধকরণ, সুনাগরিকতার গুণাবলী, বর্তমান শিক্ষানীতির বিভিন্ন বিষয়গুলো,নতুন নতুন পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত কারিকুলাম, সেলেবাস ও প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মার্কিং পদ্ধতি, উত্তরপত্র মূল্যায়ন, কো-কারিকুলাম এ্যাক্টিবিটিস, ড্রয়িং,পাঠপরিক্রমা তৈরি ও ব্যবহারবিধি, জাতীয় দিবস সমূহ পালনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা,মাল্টিমিডিয়া ক্লাস পরিচালনা ও কনটেইন তৈরি,স্কাউটিং কার্যাবলি প্রভূতি বিষয়ে পরিপূর্ণ একটি ধারণা দেয়াই এ প্রশিক্ষণের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সব মিলিয়ে একজন পরিপক্ক শিক্ষক বানানোর পরই তাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করা হয়।

শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষা প্রদানে এ প্রশিক্ষণের কোনোই বিকল্প নেই। এ কাজ গুলোই চাঁদপুরের আলীগঞ্জ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সিটিটিউটটি করে থাকে। আলীগঞ্জ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সিটিটিউটের দেয়া সূত্র মতে, বছরের জানুয়ারি মাসে প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষকদের ভর্তি হতে হয়। আবাসিক ও অনাবাসিক এ প্রশিক্ষণ কোর্সটি প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬ টায় শুরু হয় শরীরচর্চা, জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন ও সকালের নাস্তা শেষ করে ৯ টায় দিনের কর্মসূচি শুরু হয়। নামাজ ও মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির পর ৫টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলে। এ ছাড়াও বিনোদনমূলক কর্মকান্ডও চলে।

আলীগঞ্জ শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইন্সিটিটিউটের সহকারী সুপারিন্টেডেন্ট সঞ্জয় সরকার ৯ এপ্রিল জানান, এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দেশের ৬৬ টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে র মতই যোগ্যতাভিক্তিক কাঠামো প্রণীত রয়েছে। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে এটিতে চালু আছে। শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য ২৩টি শিক্ষক মান অর্জন নিশ্চিত করা হয়। যাতে তাঁরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাক্রম বিস্তারে যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে পারে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের ৩ স্তরভিক্তিক করার ফলে ওই মোতাবেকই প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। সরকারের এসডিজি বাস্তবায়ন, ঝরে পড়া রোধ ও শিক্ষার মূল লক্ষমাত্রা অর্জনে হাজীগঞ্জ শিক্ষক প্রশিক্ষণ এ কেন্দ্রটি ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে ।

জানা যায়, পূর্বে পিটিআইতে অ্যাকসন রিচার্জ, বিফ্ল্রেটিভ জার্নাল ও লেশন স্ট্যাডি ইত্যাদির প্রত্যাশা ছিলো । বর্তমানে এ গুলো চালু করা হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি ‘লেশন স্ট্যাডি ’ প্রতিযোগিতায় দেশের মধ্যে চাঁদপুরের এ প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে ৩য় স্থান অধিকার করেছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাশ ও ৮০টি রিফ্লেকটিভ লেশন স্ট্যাডি করা হয়। বর্তমানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাশ পরিচালনার জন্যে ৪টি কক্ষে সচারাচর কনটেইন তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। প্রত্যেক শিক্ষকদের ব্যাক্তিগত ল্যাপটপ ক্রয় বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সুপাররেন্ট›ন্ড হন এর একজন। প্রতিটি উপজেলায় বছরে ৫টি করে দৃষ্ঠিনন্দন স্কুল তৈরির কাজ করা হচ্ছে। শিক্ষকদের ভেতর ইংরেজি ভীতি দূরকরতে ‘ইংলিজ ল্যাংগুয়েজ ক্লাব’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব জাতীয়ভাবে অধিদপ্তরে পেশ করা হয়েছে। ’ ২০২১ সালের মধ্যে ‘ শিক্ষানীতি ২০১০’ বাস্তবায়নে প্রাথমিকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা চালুর ক্ষেত্রে সাবেক সুপার বলেছেন, ‘ আমাদের শিক্ষকদের কোয়ালিটি আছে। শুরু করে দিলেই সম্ভব ; অসম্ভব বলে কিছু নেই।’ বর্তমানে ৮ উপজেলায় ৮ টি প্রাথমিক স্কুলে এটি বাস্তবায়ন হয়েছে ।

২০১৭ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান মতে , চাঁদপুর জেলার ৮ উপজেলায় ১ হাজাপর ১শ ৪৬ টি সরকারি প্রাথমিক স্কুল ও ৪শ’৫০ টি কিন্ডার গান্ডেন রয়েছে। এতে ৮ হাজার ১২ জন শিক্ষক কথা থাকলেও প্রথান শিক্ষক আছেন ৭শ’৩৮জন এবং ৬ হাজার ৮শ ৬৮ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। প্রায় ৭শ’ প্রধান শিক্ষক ও সহকারি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। এদিকে জেলার কিন্ডার গার্টেনগুলোতে ১ হাজার ৮ শ’শিক্ষক – শিক্ষিকা ও প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৯ শ’৪ জন। এর মধ্যে উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৫ হাজার ।

প্রসঙ্গত, সারা দেশে ৬৩ হাজার সরকারি প্রাথমিক স্কুলে প্রায় পৌনে ৪ লাখ শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। সরকারি ভাবে ৬০% মহিলা শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে ৭৩%। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ও শতভাগ ভর্তি নিশ্চিত করতে ভৌতিক অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন, ১ জানুয়ারি বই উৎসব পালনে শতভাগ শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই প্রদান, মিড ডে মিল চালু, প্রাথমিকে ভর্তিকৃত শতভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যে মোবাইল ব্যাকিং এর মাধ্যমে উপবৃত্তি চালু, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রতিটি কক্ষ সজ্জিতকরণ,উপকরণ বিতরণ, মেধা বৃত্তি, ওয়াসব্লক তৈরি, প্রতিটি স্কুলে ১টি করে ল্যাপটপ বিতরণ ও আইসিটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ক্লাস্টার ভিক্তিক স্কুল বা এলাকা বিভাজন করে মনিটরিং র্কার ব্যবস্থা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভৌতিক অবকাঠামোর উন্নয়ন ইত্যাদি নিশ্চিত করছে সরকারের প্রাথমিক ও গণ শিক্ষা বিভাগ।

লেখক পরিচিতি : আবদুল গনি, শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যমকর্মী ,চাঁদপুর ।
১৯ এপ্রিল ২০২৩

Share