হজবিষয়ক জরুরি পরিভাষা ও পরিচিতি
হজ শুধু ইসলামের একটি স্তম্ভ নয়, বরং এটি মহান রবের প্রতি বান্দার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও প্রেমের এক মহত্তম বহিঃপ্রকাশ। প্রতিবছর জিলহজ মাসে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসলিম লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে মক্কার পবিত্র ভূমিতে সমবেত হন। হজের এই আধ্যাত্মিক সফরটি যেমন মর্যাদাপূর্ণ, তেমনি এর প্রতিটি কাজ অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও নিয়মনিষ্ঠ। হজের মাসআলাগুলো সঠিকভাবে অনুধাবন করতে এবং প্রতিটি রুকন যথাযথভাবে পালন করতে হলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষ পরিভাষাগুলো সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা অপরিহার্য।
এ পরিভাষাগুলো মূলত হজের ব্যাকরণ, যা একজন হাজিকে মকবুল হজের পথে সঠিক নির্দেশনা দেয় । নিচে হজের জরুরি পরিভাষাগুলোর ওপর ভিত্তি করে একটি আলোচনা তুলে ধরা হল :
১. হজের সূচনালগ্ন : ইহরাম, তালবিয়া ও মিকাত
হজের যাত্রা শুরু হয় এক বিশেষ আধ্যাত্মিক পর্যায় ও মানসিক প্রস্তুতির মাধ্যমে, যাকে ‘ইহরাম’ বলা হয়। সাধারণ মানুষের ধারণা শুধু সেলাইবিহীন কাপড় পরাই ইহরাম, কিন্তু প্রকৃত অর্থে ইহরাম হলো হজের নিয়ত করে নির্দিষ্ট কিছু হালাল কাজকে নিজের ওপর হারাম করে নেওয়া। ইহরামের মাধ্যমে বান্দা তার লৌকিক পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা ও পার্থিব জাঁকজমক ত্যাগ করে শুধু এক আল্লাহর দাস হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে। এটি মূলত মৃত্যুর পর কাফন পরে রবের সামনে হাজির হওয়ার এক আগাম মহড়া।
ইহরাম বাঁধার পর মুমিনের মুখে যে ধ্বনিটি সবচেয়ে বেশি অনুরণিত হয় এবং যা হজের পুরো সফরে হাজির সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়ে থাকে, তা হলো ‘তালবিয়া’। ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’, এই শব্দের মাধ্যমে বান্দা ঘোষণা দেয় যে ‘হে আমার রব, আমি আপনার দরবারে হাজির।’ এটি মূলত মহান স্রষ্টার সেই প্রাচীন আহ্বানে সাড়া দেওয়ার একটি চিরন্তন ও প্রেমময় ঘোষণা, যা ইবরাহিম (আ.)-এর সময় থেকে চলে আসছে।
আর এই ইহরাম বাঁধার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ভৌগোলিক যে সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তাকে বলা হয় ‘মিকাত’। মিকাত হলো সেই সীমান্ত রেখা, যা অতিক্রম করার আগেই হজের যাত্রী হিসেবে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। মিকাত অতিক্রমের সময় ইহরাম অবস্থায় থাকা ওয়াজিব। এটি মূলত আল্লাহর ঘরের প্রতি সম্মানের একটি বহিঃপ্রকাশ, যাতে কোনো মানুষ সাধারণ পোশাকে বিনা অনুমতিতে সেই পবিত্র এলাকায় প্রবেশ না করে। বর্তমান আধুনিক বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রেও মিকাত অতিক্রমের আগেই ইহরামের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা আবশ্যক।
২. পবিত্র ভূমির পরিচয় : হারাম, মসজিদে হারাম ও হিল্ল
কাবা শরিফের চারদিকের একটি বিস্তীর্ণ এলাকাকে আল্লাহ তাআলা বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন, যার নাম ‘হারাম’। এই এলাকায় কোনো যুদ্ধবিগ্রহ, গাছ কাটা, ঘাস ওপড়ানো বা পশুপাখি শিকার করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হারামের এই পবিত্রতার মাঝখানেই অবস্থিত ‘মসজিদে হারাম’, যা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মসজিদ এবং যার কেন্দ্রে আছে পবিত্র কাবাঘর। মুমিনদের হৃদয়ে এই মসজিদের জন্য যে ব্যাকুলতা কাজ করে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো স্থাপনার জন্য করে না।
হারামের সীমানার বাইরে এবং মিকাতের ভেতরের অংশটিকে বলা হয় ‘হিল্ল’। যারা মক্কার বাইরে থেকে আসেন, তাঁদের জন্য মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধা জরুরি হলেও যাঁরা হিল্ল বা হারামের এলাকায় বসবাস করেন, তাঁদের জন্য নিয়মের কিছুটা ভিন্নতা আছে। এই পরিভাষাগুলো জানা থাকলে একজন হাজি বুঝতে পারেন তিনি কখন কোন এলাকায় অবস্থান করছেন এবং তাঁর জন্য তখন কোন বিধি-বিধান প্রযোজ্য।
৩. কাবা শরিফ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থান
কাবাঘরের চারপাশের যে চত্বরে হাজিরা সাতবার চক্কর দেন, তাকে বলা হয় ‘মাতাফ’। এই চক্কর দেওয়ার প্রক্রিয়াটির নাম হলো ‘তাওয়াফ’। তাওয়াফের সূচনা হয় ‘হাজরে আসওয়াদ’ বা জান্নাতি কালো পাথর থেকে। হাজরে আসওয়াদ শুধু একটি প্রাচীন পাথর নয়, বরং এটি তাওয়াফ শুরুর মিলন বিন্দু। হাজরে আসওয়াদকে চুমু দেওয়া, হাত দিয়ে ছোঁয়া বা ভিড়ের কারণে সম্ভব না হলে দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করাকে বলা হয় ‘ইসতিলাম’।
কাবার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণকে বলা হয় ‘রুকনে ইয়ামানি’। তাওয়াফের সময় এটি স্পর্শ করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কাবার উত্তর দিকে একটি অর্ধবৃত্তাকার দেয়াল ঘেরা অংশ আছে, যাকে ‘হাতিম’ বলা হয়। এটি মূলত কাবারই অংশ, তাই হাতিমের ভেতর নামাজ পড়া মানে কাবার ভেতর নামাজ পড়ার সমান মর্যাদা লাভ করা। কাবার দরজার সঙ্গে লেগে থাকা দেয়ালের অংশটিকে বলা হয় ‘মুলতাজাম’। এটি এমন এক বরকতময় স্থান, যেখানে বুক লাগিয়ে চোখের পানি ফেলে দোয়া করলে আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন। কাবার পাশেই আছে ‘মাকামে ইবরাহিম’, একটি পাথর, যাতে ইবরাহিম (আ.)-এর পদচিহ্ন অঙ্কিত। তাওয়াফ শেষে এই পাথরের পেছনে বা তার আশপাশে দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নত। এ ছাড়া কাবার ছাদের পানি পড়ার সোনার নালাটিকে বলা হয় ‘মিজাব’।
৪. তাওয়াফ ও সাঈর বিশেষ রীতি
তাওয়াফের সময় পুরুষ হাজিদের জন্য বিশেষ কিছু সুন্নত আছে, যা তাদের শৌর্য প্রকাশ করে। যেমন—তাওয়াফের প্রথম তিন চক্করে একটু দ্রুত ও বীরদর্পে হাঁটা, যাকে বলা হয় ‘রমল’। আবার তাওয়াফের সময় গায়ের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাঁ কাঁধে রাখাকে বলা হয় ‘ইজতিবা’। এই কাজগুলো শুধু সেই তাওয়াফেই করতে হয়, যার পর সাঈ রয়েছে।
তাওয়াফ শেষ করার পর হাজিদের যেতে হয় ‘সাফা’ ও ‘মারওয়া’ পাহাড়ের কাছে। এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাতবার আসা-যাওয়া করাকে বলা হয় ‘সাঈ’। এটি মূলত মা হাজেরা (রা.)-এর সেই ঐতিহাসিক মাতৃত্বের কষ্টের স্মৃতি, যা আল্লাহ তাআলা কিয়ামত পর্যন্ত হাজিদের জন্য ওয়াজিব ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
৫. হজের প্রকারভেদ ও বিভিন্ন তাওয়াফ
হজ শুধু এক প্রকার নয়, বরং এর আদায়ের সময় ও ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন তাওয়াফের নাম দেওয়া হয়েছে। মিকাতের বাইরে থেকে যাঁরা হজে আসেন, তাঁরা প্রথমে যে অভিবাদনমূলক তাওয়াফ করেন, তাকে বলা হয় ‘তাওয়াফে কুদুম’। হজের মূল ফরজ তাওয়াফটিকে বলা হয় ‘তাওয়াফে জিয়ারত’, যা ১০ থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়; এই তাওয়াফ ছাড়া হজ সম্পন্ন হয় না। আর হজের সব কাজ শেষ করে মক্কা ত্যাগ করার আগে মিকাতের বাইরের লোকদের জন্য যে বিদায়ি তাওয়াফ করা ওয়াজিব, তাকে বলা হয় ‘তাওয়াফে বিদা’।
৬. হজের মূল কেন্দ্রবিন্দু : উকুফ, জামরাহ ও রামি
হজের প্রাণ হলো ‘উকুফ’ বা অবস্থান করা। ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে অবস্থান করাকে বলা হয় ‘উকুফে আরাফাহ’, যা হজের প্রধান রুকন। ১০ জিলহজ ফজরের পর সূর্যোদয়ের আগে মুজদালিফায় অবস্থান করাকে বলা হয় ‘উকুফে মুজদালিফা’।
মিনায় শয়তানকে পাথর মারার জন্য নির্ধারিত তিনটি স্তম্ভকে বলা হয় ‘জামরাহ’ (বহুবচনে জামারাত)। আর এই জামরাহগুলোতে নির্দিষ্ট নিয়মে পাথর নিক্ষেপ করার আমলটিকে বলা হয় ‘রামি’। এই পাথর নিক্ষেপ মূলত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই স্মৃতি, যা শয়তানের প্ররোচনাকে প্রত্যাখ্যান করার প্রতীক। এটি বান্দাকে শেখায় কিভাবে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শয়তানকে প্রতিহত করতে হয়।
৭. ভুল সংশোধন ও দণ্ডবিধি : দম, বাদানা ও সদকা
মানুষ হিসেবে হজের দীর্ঘ সফরে অনিচ্ছাকৃত কিছু ভুল বা ত্রুটি হতে পারে। এই ভুলগুলো সংশোধনের জন্য শরিয়ত কিছু দণ্ড নির্ধারণ করেছে। যদি হজের কোনো ওয়াজিব ছুটে যায় বা ইহরাম অবস্থায় কোনো নিষিদ্ধ কাজ করা হয়, তবে তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি ছাগল বা দুম্বা হারামের এলাকায় জবাই করতে হয়, যাকে বলা হয় ‘দম’। বড় ধরনের কোনো ভুলের জন্য আস্ত একটি গরু বা উট জবাই করাকে বলা হয় ‘বাদানা’। আর তুলনামূলক ছোট কোনো ত্রুটির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্য বা তার সমমূল্য দান করাকে বলা হয় ‘সদকা’। এই বিধানগুলো মূলত আল্লাহর অসীম দয়া, যাতে বান্দার ইবাদতে কোনো খামতি থাকলে তা সংশোধন করে একটি নিখুঁত হজ উপহার দেওয়া যায়।
হজসংক্রান্ত এই পরিভাষাগুলো শুধু কিছু শব্দ সমষ্টি নয়, বরং এগুলো একেকটি আধ্যাত্মিক পর্যায়। একজন হাজি যখন এই শব্দগুলোর অর্থ ও হাকিকত জানেন, তখন তাঁর প্রতিটি আমলের মধ্যে প্রাণ ফিরে আসে। ইহরামের পবিত্রতা থেকে শুরু করে রামি ও তাওয়াফের একাগ্রতা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ হাজিকে এক নতুন মানুষে রূপান্তরিত করে। হজের এই ব্যাকরণগুলো সঠিকভাবে মেনে চলার মাধ্যমেই একজন মুমিন তাঁর আজীবনের স্বপ্ন ‘হজে মাবরুর’ বা কবুল হজের স্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। এই পরিভাষাগুলোর জ্ঞান হাজিদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং ইবাদতে একাগ্রতা সৃষ্টি করে।
৭ মে ২০২৬
এ জি