সাংবাদিকতা: রাষ্ট্রের বিবেক, নাকি ক্ষমতার প্রচারযন্ত্র?
সাংবাদিকতা আসলে কী? একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয়ই বা কী? সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব কি শুধু ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা ক্ষমতাসীনদের প্রচার-প্রচারণা চালানো, নাকি জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে সত্য অনুসন্ধান করা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা, অন্যায়-অনিয়ম উন্মোচন করা এবং রাষ্ট্র ও সমাজে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা?
সাংবাদিকতা শুধুমাত্র প্রচলিত কোনো পেশা নয়; এ পেশায় যুক্ত হওয়ার পূর্বে একজন ব্যক্তিকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, একটি সামাজিক অঙ্গীকার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি রাষ্ট্রে আইনসভা, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি গণমাধ্যমকে “চতুর্থ স্তম্ভ” বলা হয় একমাত্র এই কারণেই যে, জনগণের অর্পিত ক্ষমতার ব্যবহার কতটা সঠিক হচ্ছে, তার ওপর স্বাধীন নজরদারি চালানোর অন্যতম দায়িত্ব গণমাধ্যমের।
একজন প্রকৃত সাংবাদিক কখনো ক্ষমতার অন্ধ সমর্থক নন, আবার অকারণ বিরোধিতাকারীও নন। তাঁর একমাত্র আনুগত্য সত্য, ন্যায়, জনস্বার্থ এবং পেশাগত নৈতিকতার প্রতি। সাংবাদিকতার মূল দর্শনই হলো-তথ্য যাচাই করে সত্যকে জনগণের সামনে তুলে ধরা, দুর্বল ও বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়া এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই এই আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। যখন কোনো সাংবাদিক নৈতিকতা, পেশাগত মানদণ্ড ও সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তখন অনেক সময় দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি কিংবা অনিয়মের মুখোশ উন্মোচিত হয়। আর ঠিক তখনই শুরু হয় নানা ধরনের চাপ, ভয়ভীতি, অপপ্রচার, পেশাগত হয়রানি, মামলা কিংবা সামাজিকভাবে একঘরে করে দেওয়ার চেষ্টা। সত্যের পথে অবিচল থাকার মূল্য অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগতভাবে সেই সাংবাদিককেই দিতে হয়।
আরও বেদনাদায়ক হলো, যে সমাজ সাংবাদিকতাকে “মহান পেশা” বলে সম্মান জানায়, সেই সমাজের একটি অংশকেও অনেক সময় বিপদগ্রস্ত সাংবাদিকের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে দেখা যায় না। পেশাজীবী সংগঠন, সামাজিক নেতৃত্ব, প্রভাবশালী মহল কিংবা তথাকথিত সুশীল সমাজ-অনেকেই কখনো নীরব থাকেন, কখনো দূরত্ব বজায় রাখেন। ফলে একজন সৎ, দক্ষ ও নির্ভীক সাংবাদিক নিজেকে অসহায়, নিরাপত্তাহীন এবং বিচ্ছিন্ন মনে করেন।
এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি শুধু একজন ব্যক্তির নয়; পুরো রাষ্ট্রের। কারণ যেখানে সত্য বলার মানুষ কমে যায়, সেখানে মিথ্যা সহজে প্রতিষ্ঠা পায়। যেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে দুর্নীতি শক্তিশালী হয়। যেখানে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি হারিয়ে যায়, সেখানে জবাবদিহিও বিলীন হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থপাচার, স্বজনপ্রীতি ও বৈষম্য প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। জনগণ নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা কমে যায় এবং আইনের শাসন দুর্বল হতে থাকে।
ইতিহাসে বহু রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা দেখায়, যখন স্বাধীন গণমাধ্যমকে দুর্বল করা হয়, তখন দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা দ্রুত বিস্তার লাভ করে। প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সত্য, তারপর ন্যায়বিচার, এরপর জনগণের আস্থা এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। বাইরে থেকে উন্নয়নের চিত্র যতই আকর্ষণীয় মনে হোক, ভেতরে ভেতরে সমাজব্যবস্থায় ঘুণ ধরে যায়। সেই ক্ষয় একদিন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের মূল্য দিতে হয় বহু গুণ বেশি।
আরও একটি উদ্বেগের বিষয় হলো-যখন তরুণ প্রজন্ম দেখে যে সততা, দক্ষতা ও সাহসিকতার চেয়ে আপস, তোষামোদ কিংবা নীরবতা বেশি নিরাপদ, তখন তারা আদর্শবাদী সাংবাদিকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। এতে গণমাধ্যমে মেধা ও নৈতিক নেতৃত্বের সংকট তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত অশনি-সংকেত।
তবে এর অর্থ এই নয় যে সাংবাদিকতা তার মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছে। বরং এই সংকটই আমাদের মনে করিয়ে দেয়-সাংবাদিকতার আদর্শকে রক্ষা করা আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি। রাষ্ট্রের উচিত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের উচিত পেশাগত স্বাধীনতা ও নৈতিক সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করা। সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত দল-মত-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যেকোনো নিপীড়িত সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানো।
একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও তথ্য যাচাই, ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপন, ন্যায্যতা এবং পেশাগত নৈতিকতা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, একজন সৎ সাংবাদিককে রক্ষা করা মানে কোনো ব্যক্তি বা পেশাজীবী গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়; বরং জনগণের সত্য জানার অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি, গণতন্ত্রের ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ সমাজকে রক্ষা করা।
সাংবাদিকতার মহত্ত্ব বক্তৃতা, সেমিনার কিংবা আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছাবার্তায় প্রমাণিত হয় না। এর প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় তখনই, যখন সত্য প্রকাশের কারণে বিপদে পড়া একজন সাংবাদিকের পাশে রাষ্ট্র, সমাজ, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং সহকর্মীরা নির্ভয়ে দাঁড়ায়। কারণ যে সমাজ সত্যের কণ্ঠস্বরকে রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ একদিন নিজের সত্য বলার অধিকারও হারিয়ে ফেলে।
মুসাদ্দেক আল আকিব
(লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী)