‘ওই যে মাঝ নদীতে বাঁশটা দেখছেন, সেই পর্যন্ত আমার জমি ছিল। গত ১০ বছরে ভাঙতে ভাঙতে সবই গেছে নদীতে। এখন যে জায়গাটুকু মাথা গোঁজার ঠাঁই আছে, সেটাও নিজ উদ্যোগে জিও ব্যাগ ফেলে রক্ষা করার চেষ্টা করছি। নদীর পানি বাড়লে বুকটা কেঁপে ওঠে, এবার বুঝি শেষ আশ্রয়টুকুও নদীতে চলে যাবে।’
এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোসেন্দী ইউনিয়নের গোয়ালগাঁও গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বুদ্দু দেওয়ান। তার মতো তার প্রতিবেশীদের বক্তব্যেও উঠে এসেছে একই আক্ষেপ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেঘনা নদী তীরবর্তী গজারিয়া উপজেলার গোয়ালগাঁও, নয়ানগর, গজারিয়া ও ইসমানিরচর গ্রামে গত এক যুগে দুই শতাধিক পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। চলতি বর্ষায় নদীর পানি ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় আরও দুই শতাধিক পরিবার এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষিজমি হারিয়ে অনেকেই পেশা বদল করতে বাধ্য হয়েছেন। কেউ দিনমজুর, কেউ অন্যের জমিতে কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। নদীর তীব্র স্রোত ও বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। কোথাও বাঁশের খুঁটি পুঁতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন বাসিন্দারা। কোথাও নদীর কিনারায় ঝুলে আছে বসতঘরের শেষ অংশ, কোথাও গাছের মুল অংশ। অনেকেই নদীর দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন কখন যে তাদের শেষ সম্বলটুকুও নদী গর্ভে হারিয়ে যায়, সেই আতঙ্কে।
ইসমানিরচর গ্রামের নদী ভাঙনের শিকার আবদুল গাফ্ফার ও ধলেশ্বর রাজবংশী বলেন, বছরের পর বছর ধরে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনে আসছি। কিন্তু নদীভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রতি বর্ষা এলেই ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়।
গোয়ালগাঁও গ্রামের বাসিন্দা নবী দেওয়ান, মতি দেওয়ান, সেকান্দর আলী ও আমির হোসেন এবং নয়ানগর ও গজারিয়া গ্রামের সুজন, মির্জা জাহিদ, শংকর মিস্ত্রি ও কামাল মিয়া বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে নদী তীরবর্তী এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা না হলে পুরো জনপদই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। তারা জানান, প্রতি বছর নদীভাঙনের কারণে মানুষের বসতভিটা, ফসলি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে পড়ছে। তাই জনপদের অস্তিত্ব রক্ষা এবং মানুষের জীবন-জীবিকা সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
হোসেন্দী ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নজরুল ইসলাম বাদশা বলেন, প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর ধরে গোয়ালগাঁও গ্রামের মানুষ নদী ভাঙনের চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছে। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার উপজেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো উদ্যোগ গ্রহন করা হয়নি। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের অর্থ ব্যয় করে জিও ব্যাগ ও বালুভর্তি বস্তা ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন।
সম্প্রতি নদী ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর-গজারিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুজ্জামান রতন। তিনি স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান। পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ৫১টি পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার ও নগদ দুই হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মুন্সীগঞ্জ কার্যালয়ের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ এনামুল হক বলেন, ইসমানিরচর এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ৫ থেকে ৬ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার কার্যাদেশ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন জানান, মেঘনা নদী ভাঙন কবলিত মানুষের স্থায়ী সুরক্ষায় টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেলেই স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে, আর কোনো আশ্বাস নয় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণই এখন নদীতীরের মানুষের একমাত্র দাবি। তাদের ভাষায়, প্রতিদিন নদীর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা নয়, নিরাপদে মাথা গোঁজার নিশ্চয়তা চান তারা। (সূত্র: ইত্তেফাক)
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
১৩ জুলাই ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur