Home / চাঁদপুর / বর্ষার জলে ভাসছে আশা, ব্যস্ত নৌকা তৈরির কারিগররা
বর্ষার

বর্ষার জলে ভাসছে আশা, ব্যস্ত নৌকা তৈরির কারিগররা

চাঁদপুরে বর্ষার পানি বাড়তে শুরু করলেই বদলে যায় অনেক পরিচিত দৃশ্য। নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে ভরে ওঠার পাশাপাশি কর্মব্যস্ত হয়ে ওঠেন নৌকা তৈরির কারিগররা। জেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী কারখানাগুলোতে এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছে কাঠ কাটার শব্দ, হাতুড়ির আঘাত আর কারিগরদের ব্যস্ত পদচারণা।

বর্ষার মৌসুমকে ঘিরে আবারও প্রাণ ফিরে পেয়েছে জেলার পুরনো ঐতিহ্যবাহী পেশা নৌকা তৈরি।

পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর পানির উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে নৌকার চাহিদাও। জেলার আটটি উপজেলায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন নৌকা তৈরির কারিগর, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা।

সড়কের পাশে গড়ে ওঠা অস্থায়ী কারখানাগুলো যেন একেকটি ছোট শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

চাঁদপুরের বাবুরহাট-মতলব সড়ক, নারায়ণপুর সড়ক, মতলব উত্তর সড়ক, কচুয়া সড়ক এবং হাইমচরের চরভৈরবী সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায় নৌকা তৈরির ব্যস্ততা। কোথাও কাঠ চিরানো হচ্ছে, কোথাও মাপ অনুযায়ী তক্তা বসানো হচ্ছে, আবার কোথাও হাতুড়ির আঘাতে কাঠের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানোর কাজ চলছে। রাস্তার পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে আধা-তৈরি ও সম্পূর্ণ প্রস্তুত নৌকা।

কিছু নৌকা আগেই তৈরি করে রাখা হয়েছে, আবার কিছু তৈরি হচ্ছে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী। কেউ মাছ ধরার জন্য ছোট নৌকা কিনছেন, আবার কেউ পরিবার নিয়ে চলাচলের জন্য বড় আকারের নৌকা তৈরি করাচ্ছেন।

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই কয়েকগুণ বেড়ে যায় নৌকা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা। কাঠ চিরানো, তক্তা তৈরি, কাঠ মসৃণ করা, লোহার পাত ও পেরেক দিয়ে কাঠ জোড়া লাগানো সব কাজই চলে সমানতালে। দিন-রাত পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় একেকটি নৌকা। আর সেই নৌকাই পরে হয়ে ওঠে কারও চলাচলের মাধ্যম, কারও জীবিকার উপকরণ, আবার কারও পরিবারের প্রয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নৌকা ব্যবসায়ী হান্নান প্রধানিয়া জানান, একসময় বর্ষা মৌসুম এলেই নৌকার বাজারে অন্যরকম ব্যস্ততা দেখা যেত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় থাকত। অনেক সময় একদিনেই ১০ থেকে ১৫টি নৌকা বিক্রি হয়ে যেত। শুধু চাঁদপুর নয়, আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ নৌকা কিনতে আসতেন। তখন পুরো মৌসুমে ৩০০ থেকে ৪০০ নৌকা বিক্রি হতো। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে।

তিনি আরও জানান, আগে বর্ষার পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী থাকত। খাল-বিল ও নদী-নালা পানিতে পরিপূর্ণ থাকায় মানুষ চলাচল, মাছ ধরা এবং কৃষিকাজে নৌকার ওপর নির্ভরশীল ছিল। বর্তমানে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন স্থানে সেতু নির্মাণ হওয়ায় মানুষের নৌকার ব্যবহার কিছুটা কমে এসেছে।

ক্রেতা সেলিম মিয়াজী বলেন, যারা নৌকা তৈরি করেন তাদের কাছে বিভিন্ন আকার ও মানের নৌকা পাওয়া যায়। ছোট নৌকার দাম একরকম, মাঝারি ও বড় নৌকার দাম ভিন্ন। সাধারণ মানের একটি নৌকা ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। তবে কম দামে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায়ও নৌকা পাওয়া যায়, কিন্তু সেগুলো বেশি দিন টেকে না।

নৌকা তৈরির কারিগর মো. রাসেল জনান, বর্ষা মৌসুম এলেই আমাদের কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। একটি নৌকা তৈরি করতে অনেক ধাপ রয়েছে। প্রথমে কাঠ নির্বাচন, তারপর কাঠ চিরানো, তক্তা তৈরি, মাপ অনুযায়ী কাঠ বসানো, পরে লোহার পাত ও পেরেক দিয়ে জোড়া লাগানোর কাজ করতে হয়।

তিনি আরও জানান, একটি নৌকা তৈরি করতে একজন মিস্ত্রির প্রায় দুই দিনের শ্রম লাগে। বর্তমানে একজন শ্রমিককে দৈনিক প্রায় এক হাজার টাকা মজুরি দিতে হয়। পাশাপাশি কাঠসহ অন্যান্য সরঞ্জামের দামও অনেক বেড়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করি ক্রেতাদের সাধ্যের মধ্যে ভালো মানের নৌকা তৈরি করে দিতে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, আগের তুলনায় নৌকা তৈরির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে বর্তমানে জেলায় বছরে ঠিক কতটি নৌকা তৈরি হয় বা কতটা কমেছে এ ধরনের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান আমাদের কাছে নেই।

মৎস্য কর্মকর্তা আরও জানান, আগে নৌকা তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বর্ষা মৌসুমে মাছ শিকার, নদীপথে যাতায়াত এবং মানুষ পারাপার করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদী, খাল ও বিলের পরিমাণ কমেছে, মাছের উৎপাদনও হ্রাস পেয়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় অসংখ্য সড়ক ও সেতু নির্মাণ হওয়ায় নৌকার ব্যবহারও অনেক কমে গেছে। ফলে নৌকা তৈরির চাহিদা কমেছে এবং যারা একসময় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই জীবিকার প্রয়োজনে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. এরশাদ উদ্দিন বলেন, যারা নৌকা তৈরি করেন, তারা মূলত কুটির শিল্পের আওতাভুক্ত। তবে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত কারিগররা কখনো জেলা প্রশাসনের কাছে কোনো ধরনের সহযোগিতা বা সমস্যার কথা নিয়ে আসেননি। যদি তারা মনে করেন এই ঐতিহ্যবাহী পেশা টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা, প্রশিক্ষণ বা আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন, তাহলে জেলা প্রশাসন তাদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত।

এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন ও বিসিক শিল্প নগরীর মাধ্যমেও বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। আমরা চাই এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকে থাকুক। তবে এজন্য কারিগরদেরও এগিয়ে এসে তাদের সমস্যা ও চাহিদার বিষয়গুলো আমাদের জানাতে হবে। তাহলেই তাদের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা সহজ হবে।

প্রতিবেদক: শরীফুল ইসলাম/
৮ জুলাই ২০২৬