শিক্ষাঙ্গন

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় শ্রেণি শিক্ষকের দায়িত্ব ও কর্তব্য

একজন শ্রেণি শিক্ষকের সঠিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনেই সুশৃংখল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠে শ্রেণি কার্যক্রম। শ্রেণি শিক্ষক শ্রেণির প্রধান ও প্রাণ। তাই শ্রেণি শিক্ষকের কার্যক্রমের ওপরই অধিকাংশ সময় নির্ভর করে ওই শ্রেণির সাফল্য ও ব্যর্থতা। অবশ্য এ সাফল্যের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো অধিকাংশ মানসম্মত শিক্ষার্থীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা। একজন শ্রেণি শিক্ষক তার নিজস্ব চিন্তা-চেতনা,ব্যক্তিত্ব,মেধা-যোগ্যতা,মননশীলতা আর আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে ওই শ্রেণির কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীর নিকট কখনও হবেন একজন আদর্শ শিক্ষক, অভিভাবক, পিতা, কখনও হবেন রসিক, গম্ভীর,রাহবার,পথিক; কখনও হবেন সুশৃংখল জাতি বিনির্মাণে যোগ্য নেতা তৈরির আধুনিক কারিগর ।

একজন শ্রেণি শিক্ষককে হতে হবে দৃঢ়চেতা, উত্তম নৈতিক চরিত্রের অধিকারী,নিরপেক্ষ,অকুতোভয়,সত্যবাদী তিনি তার অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে শিক্ষার্থীর মন জয় করবেন।

এক কথায় তিনি হবেন তার নিজস্ব স্বকীয়তায় অভিনেতা-শিক্ষক, শিক্ষার্থীর নিকট এক অনুসরণীয় আদর্শ । একজন শ্রেণি শিক্ষকের মধ্যে থাকতে হবে উদ্ভাবনী ক্ষমতা, নতুন কিছু সৃষ্টি করার নিরন্তর প্রচেষ্টা । তিনি হবেন শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ ও উন্নয়নের এক অনিবার্য মাধ্যম ।

একজন শ্রেণি শিক্ষককে বেশ কিছু মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয় । তার মধ্যে অন্যতম কিছু মৌলিক কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হল-

১) তথ্য সংরক্ষণ করা :
(ক) হাজিরা খাতায় নাম উঠানো:
বছরের প্রথমেই সুস্পষ্ট করে সুন্দর হস্তাক্ষরে শ্রেণি শিক্ষক হাজিরা খাতায় শিক্ষার্থীর নাম উঠাবেন। শিক্ষককে অবশ্যই শিক্ষার্থীর জন্ম সনদ বা একাডেমিক সনদ অনুযায়ী নাম উঠাতে হবে ।
(খ) শিক্ষার্থীর তথ্য সংরক্ষণ:

শ্রেণি শিক্ষক হাজিরা খাতায় এবং সম্ভব হলে নিজের ডায়েরি বা “শিক্ষার্থীর তথ্য” নামক ফর্মে শিক্ষার্থীর অভিভাবকের মোবাইল নম্বর ও গ্রুপ ভিত্তিক শিক্ষার্থীর তথ্য সংরক্ষণ করবেন । শিক্ষার্থীর পূর্বের বছরের শ্রেণি,শাখা এবং রোল নং সংরক্ষণ করবেন । তিনি শ্রেণিতে নতুন ভর্তি, পুনঃভর্তি, সরাসরি উত্তীর্ণ এবং বিবেচনায় বা অঙ্গীকারে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর পরিসংখ্যান রাখবেন ।
(গ) অভিভাবকের তথ্য সংরক্ষণ:
শ্রেণি শিক্ষক তাঁর নিজস্ব ডায়েরি বা ডিজিটাল ডায়েরিতে শিক্ষার্থীর পিতা- মাতার নাম বা স্থানীয় অভিভাবকের নাম এবং তাদের মোবাইল নম্বর, বাসার ঠিকানা, অভিভাবকের পেশা সংরক্ষণ করবেন ।
(ঘ) ফলাফল রেজিস্ট্রার ও প্রোগ্রেস রিপোর্ট তৈরি:
শ্রেণি শিক্ষক ফলাফল রেজিস্ট্রার খাতায় শিক্ষার্থীর বিভিন্ন পরীক্ষা যেমন- টার্ম-সাময়িক বা নির্বাচনি পরীক্ষার প্রাপ্ত নম্বর লিখিতভাবে সংরক্ষণ করবেন এবং সে অনুযায়ী প্রোগ্রেস রিপোর্ট তৈরি করবেন । প্রোগ্রেস রিপোর্ট তৈরি করার সময় যেন কাটাকাটি বা ঘষামাজা না হয় সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে । মনে রাখবেন আপনার নিজস্ব হস্তাক্ষরে লিখিত এ প্রোগ্রেস রিপোর্টটি শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকের নিকট আপনার পরিচয় বহন করবে । তবে বর্তমানে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সফটওয়ার এর মাধ্যমে ফলাফল তৈরি করে থাকে । সে ক্ষেত্রেও শ্রেণি শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সফটওয়ার ব্যবহার করে তার শ্রেণির ফলাফল তৈরি করবেন ।

(ঙ) বিশেষ যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষার্থীর তথ্য:

একটি শ্রেণিতে বিভিন্ন বিষয়ে সৃজনশীল কাজে পারদর্শী প্রতিভাবান শিক্ষার্থী থাকতে পারে । কোন শিক্ষার্থী পারদর্শী হতে পারে সংগীতে, কেউ পারদর্শী হতে পারে বিতর্ক কিংবা আবৃতিতে, আবার কেউ দক্ষ হতে পারে রচনা লিখন বা খেলাধুলায়। শ্রেণি শিক্ষক এ ধরনের সৃজনশীল কাজে দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরি করে তা’ সংরক্ষণ করবেন । শ্রেণিতে প্রাথমিক ও জুনিয়র কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী থাকতে পারে । এ ধরনের শিক্ষার্থীর তালিকাও শ্রেণি শিক্ষক সংরক্ষণ করবেন ।

(চ) অনগ্রসর শিক্ষার্থীর তথ্য সংরক্ষণ:

একটি শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার মান সমান নয় । শ্রেণিতে যেমন সবল বা লেখাপড়ায় ভালো শিক্ষার্থী থাকে তেমনি থাকে লেখাপড়ায় অনেক দূর্বল শিক্ষার্থী । কোনো কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে না । কেউ বা আবার শ্রেণি কার্যক্রমে বিরতির পর শ্রেণিতে অনুপস্থিত থাকে। যাকে স্কুল পালানো শিক্ষার্থী বলা হয়ে থাকে । শ্রেণি শিক্ষক এ ধরণের সবল, দূর্বল, অধিক দূর্বল, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর তথ্য সংরক্ষণ করবেন।
(ছ) অটিস্টিক বা শারীরিকভাবে অসুস্থ শিক্ষার্থীর তথ্য:
একটি শ্রেণিতে অটিস্টিক বা রোগাক্রান্ত বা শারীরিকভাবে বড় ধরনের অসুস্থ শিক্ষার্থী থাকতে পারে । শ্রেণি শিক্ষক এ ধরনের শিক্ষার্থী চিহ্নিত করে তাদের তালিকা সংরক্ষণ করবেন এবং বিষয় শিক্ষকদেরকে এ বিষয়ে যথাসম্ভব অবহিত করবেন ।

(জ) শিক্ষার্থীর অভিভাবকের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হওয়া:

একটি শ্রেণিতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি বা পেশার লোকদের ছেলে-মেয়ে শিক্ষার্থী হিসেবে থাকতে পারে । অনেক সময় কোনো কোনো শিক্ষার্থী তার পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে নিজেকে গুটিয়ে বা সংকোচবোধের কারণে লেখাপড়ায় পিছিয়ে যেতে পারে । এ কারণে শ্রেণি শিক্ষক অত্যন্ত কৌশলে শিক্ষার্থীদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হবেন । এতে করে অর্থনৈতিক কারণে সংকোচবোধ থেকে কোনো শিক্ষার্থী লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়লে তিনি প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিতে পারবেন।

০২) শৃংখলা বিধান :
(ক) শিক্ষক বিধি মোতাবেক সময়মত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হবেন এবং শ্রেণি কার্যক্রম শেষে সবকিছু সুন্দরভাবে গুছিয়ে রেখে প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করবেন। শিক্ষক যদি সময়কে সঠিকভাবে অনুসরণ করেন, তাহলে শিক্ষার্থী শিক্ষককে আদর্শ মেনে সময়ানুবর্তী হতে আগ্রহী হবে ।

(খ) শিক্ষার্থীর প্রতি একজন শ্রেণি শিক্ষকের আচরণ বা দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় হবে ইতিবাচক । তিনি নেতিবাচকতা সম্পূর্ণভাবে পরিহার করবেন । শিক্ষক নিজে শৃংখলা মেনে চলবেন । এতে করে শিক্ষার্থীরা সুশৃংখল হতে শিখবে এবং প্রতিষ্ঠানের শৃংখলা মেনে চলবে ।

(গ) প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যতীত প্রতিটি বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পূর্বে শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিদ্যালয় মাঠে প্রাত্যহিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শ্রেণি শিক্ষক নিয়মিত প্রাত্যহিক সমাবেশে সময়মত উপস্থিত থাকবেন । সমাবেশে শিক্ষকের উপস্থিতি শিক্ষার্থীর মধ্যে শৃংখলাবোধ জাগ্রত করবে ।

(ঘ) শ্রেণি কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে বেশ কয়েকটি সমান গ্রুপে ভাগ করে দিবেন । প্রত্যেক গ্রুপে ৫/৬ জন শিক্ষার্থী থাকবে এবং প্রত্যেক গ্রুপের-ই নিজস্ব মার্জিত নাম থাকবে। শ্রেণি শিক্ষকের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রুপের সদস্যবৃন্দ নিয়মমত একেক দিন একেক জায়গায় বসবে । প্রত্যেক গ্রুপের জন্য একজন গ্রুপ লিডার থাকবে । প্রতিটি গ্রুপ-ই সবল এবং দূর্বল শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে গঠিত হবে।

(ঙ) শ্রেণির পরিবেশ সুষ্ঠু ও শ্রেণি কক্ষ পরিচ্ছন্ন রাখা, বাড়ির কাজ ও অন্যান্য কাজে শ্রেণি শিক্ষক বা বিষয় শিক্ষকদের সাথে সমন্বয় সাধন এবং বিষয় শিক্ষকের সাময়িক অনুপস্থিতিতে শ্রেণিতে নিয়ম-শৃংখলা বজায় রাখার জন্য শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর মধ্য হতে ক্যাপ্টেন নির্বাচন করা হয় । শিক্ষার্থীর মধ্যে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চেতনা সৃষ্টি করার মানসে শ্রেণি শিক্ষক গোপন ভোটের মাধ্যমে ক্যাপ্টেন নির্বাচন করবেন । মেধাবী শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হওয়া উচিত । একটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যার উপর নির্ভর করে ২/৩ জন শ্রেণি ক্যাপ্টেন থাকতে পারে।

(চ) শিক্ষকতা একটি মহান পেশা । এ পেশায় তিনি শিক্ষক সুলভ আচরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে নিজকে মহান শিক্ষক হিসেবে মেনে নেয়ার আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হবেন । একটি বিশাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন শ্রেণি শিক্ষক যে অন্তত একটি শ্রেণির প্রধান, তিনি যে তার সুযোগ্য পরিচালনায় ঐ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ভবিষৎ জীবনের স্বপ্নচারী নান্দনিক নাগরিক হিসেবে আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে পারেন – এ বিষয়টি মনে রাখবেন।

(ছ) একজন শ্রেণি শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর সাথে বিশ্বস্থ বন্ধুর মত আচরণ করবেন । শিক্ষার্থী তার সমস্যাগুলো বন্ধুর মতই শ্রেণি শিক্ষকের নিকট উপস্থাপনের সুযোগ পাবে । শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক বজায় রেখে একজন শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীর সুখে-দুখে, সাফল্য-ব্যর্থতায় সব সময় পাশে থাকবেন । এতে করে শিক্ষার্থীর মানসপটে রোপিত বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের প্রথম বাস্তব প্রকাশ ঘটবে শ্রেণিতে শৃংখলা পালনে। দ্বিতীয়ত: শিক্ষার্থীর পারিবারিক কিংবা সামাজিক জীবনে ।

(জ) একজন কচি মনের শিক্ষার্থী অনেক কিছু প্রকাশ করতে চায় । একজন শ্রেণি শিক্ষককে শিক্ষার্থীর আচরণ দেখে তার মনের ভাষা বুঝতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে তার মার্জিত স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে ।

(ঝ) একজন শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রেষণা সৃষ্টি করবেন । তার শ্রেণির শিক্ষার্থীরা যাতে স্বত:স্ফুর্তভাবে নিয়ম-শৃংখলা মেনে চলে এ ব্যাপারে সর্বদা উৎসাহ প্রদান করবেন ।

(ঞ) শ্রেণি শিক্ষককে হতে হবে উদার নৈতিক চরিত্রের অধিকারী । শিক্ষার্থীরা শ্রেণিতে ভুল থেকেই শিখতে আসে । তাই শিক্ষার্থীরা ভুল করবে বা কখনও অন্যায় আচরণ করবে – এটাই স্বাভাবিক । সে ক্ষেত্রে শিক্ষক কখনও শিক্ষার্থীর সাথে অভিমান বা রাগ করবেন না । শিক্ষার্থী যে ভুল বা অন্যায় আচরণ করেছে শ্রেণি শিক্ষক তাকে মার্জিত ভাষায়, স্নেহের সাথে অভয় দিয়ে অত্যন্ত কোমলতার সাথে বুঝিয়ে দিবেন ।

(ট) ধৈর্যশীলতা হবে একজন শ্রেণি শিক্ষকের অন্যতম প্রধান গুণ । শ্রেণিতে তিনি শিক্ষার্থীর প্রতি কোনভাবেই তাচ্ছিল্যভাব দেখাবেন না ।

০৩) সমন্বয় সাধন :
(ক) শ্রেণি শিক্ষক তার শ্রেণির সমস্যা-সমাধান, সাফল্য-ব্যর্থতা, ফলাফল, শৃংখলা, ভবিষ্যত সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে প্রতিষ্ঠান প্রধান বা শাখার দায়িত্বশীল বা বিভাগীয় প্রধানের সাথে সমন্বয় করবেন । প্রতিষ্ঠান প্রধান বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের পরামর্শ বা দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রেণির কার্যক্রম পরিচালনা করবেন । শ্রেণি শিক্ষকের নিজস্ব গঠনমূলক বা সৃজনশীল কোনো পরামর্শ থাকলে প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাথে আলোচনা করে সে অনুযায়ী কাজ করবেন ।

(খ) একটি শ্রেণিতে বেশ কয়েকটি শাখা থাকতে পারে । সে ক্ষেত্রে একটি শাখার শ্রেণি শিক্ষক অন্য শাখার শ্রেণি শিক্ষকদের সাথে তাঁর শ্রেণির শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন বা অগ্রগতি, নিয়ম-শৃংখলা বজায় রাখা, শ্রেণির শিক্ষার্থীর সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় বিষয় সম্পর্কে নিজদের মধ্যে আলোচনা বা মত বিনিময় করবেন । শ্রেণি শিক্ষক শ্রেণির বিষয় শিক্ষকদের সাথে পরামর্শ করবেন এবং তাঁদের নিকট থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিবেন ।

(গ) শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এ ৩ পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই একজন শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ উন্নয়ন হয়। সে শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয় । এ ক্ষেত্রে একজন শ্রেণি শিক্ষকের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ । তিনি পিছিয়ে পড়া বা অনগ্রসর শিক্ষার্থীর মান উন্নয়নে শিক্ষার্থীর অভিভাবকের সাথে সময়ে সময়ে যোগাযোগ রক্ষা করবেন । তিনি শিক্ষার্থী সম্পর্কে অভিভাবকের করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করবেন এবং অভিভাবকের কোনো গঠনমূলক পরামর্শ থাকলে তা নিজে গ্রহণ করবেন । কোন শিক্ষার্থী শ্রেণিতে অনিয়ম বা শৃংখলা ভঙ্গ করলে শ্রেণি শিক্ষক তা অভিভাবক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করবেন ।

০৪) মান উন্নয়ন :

মান উন্নয়ন বলতে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী উভয়ের মান উন্নয়নকে বুঝানো হয় । শিক্ষার্থী তার শারীরিক, মানসিক এবং মেধার বিকাশ সাধনের মাধ্যমে মান উন্নয়ন করবে । আর শিক্ষক মান উন্নয়ন করবেন তাঁর পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে । আমরা প্রথমে শিক্ষার্থীর মান উন্নয়নে শ্রেণি শিক্ষকের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করব ।

(ক) “আমি পারব” শিক্ষার্থী যাতে নিজেরা এ ধারণায় অগ্রসর হয় শ্রেণি শিক্ষক সে ব্যাপারে শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করবেন । শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার সার্বিক মান উন্নয়নে শ্রেণি শিক্ষক তাকে সর্বদা উৎসাহি করবেন ।

(খ) শিক্ষার্থী বর্তমানে যে শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে সে শ্রেণিতে অন্য শিক্ষার্থীর তুলনায় তার লেখাপড়ার মানদন্ড কতটুকু শ্রেণি শিক্ষক তা নির্ণয় করার চেষ্টা করবেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ নিবেন ।

(গ) যেহেতু শিক্ষক শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার মানদন্ড নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছেন, তাই শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীর বিভিন্ন সাময়িক বা পাবলিক পরীক্ষার ন্যূনতম ভবিষ্যত ফলাফল নির্ধারণ করবেন।

(ঘ) একজন শিক্ষক সব সময় এবং সর্বাবস্থায় শিক্ষার্থীর জন্য হিতাকাঙ্গী এক ব্যক্তিত্ব । তাই বাড়ীতে পড়ার জন্য “পড়ার রুটিন” তৈরিতে শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীকে সহায়তা করবেন ।

(ঙ) বর্তমানে সর্বাবস্থায় চরম নৈতিক অবক্ষয়ের এ সময়ে একজন শ্রেণি শিক্ষকের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শিক্ষার্থীর নৈতিক মান উন্নয়নে সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালাবেন ।

চরিত্র মানব জীবনে এক অমূল্য সম্পদ। একজন চরিত্রবান, ন্যায়নিষ্ঠ, পরোপকারী, সত্যবাদী, অকুতোভয়, আদর্শবান ব্যক্তি পরিবার, সমাজ ও জাতীয় জীবনে সভ্যতার আলো জ্বালাতে পারে। যেহেতু আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে পরিবার, সমাজ ও জাতীয় জীবনে নেতৃত্ব দিবে, তাই শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে সমাজের সর্বজন শ্রদ্বেয় ব্যক্তি হিসেবে একজন শ্রেণি শিক্ষক মৌলিক ভূমিকা পালন করতে পারেন ।

(চ) শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীর পেশাগত জীবনের লক্ষ্য জেনে নিবেন । এতে করে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়ে সহায়তা করতে পারবেন ।

এখন আমরা শ্রেণি শিক্ষকের পেশাগত মান উন্নয়ন সম্পর্কে আলোচনা করব ।

(ক) বর্তমান যুগ তথ্য প্রযুক্তির যুগ । শিক্ষাক্ষেত্রে এখন তথ্য প্রযুক্তি বহুল ব্যবহৃত হচ্ছে । শ্রেণি কক্ষে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার জন শ্রেণি শিক্ষককে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে হবে । শিক্ষার্থী শিখন- শিখানো প্রক্রিয়ায় শ্রেণি শিক্ষককে সর্বদা তথ্য প্রযুক্তি সম্পর্কে আপ-টু-ডেট থাকতে হবে । মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে উরমরঃধষ ঈড়হঃবহঃ এর মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার যোগ্যতা অবশ্যই অর্জন করতে হবে ।

(খ) শ্রেণি শিক্ষক তাঁর বিষয়ে পেশাগত মান উন্নয়নের লক্ষ্যে সময়ে সময়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে আয়োজিত শিক্ষক প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ করবেন । নিজ প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত এ অংশ গ্রহণ এর মাধ্যমে শিক্ষক তাঁর পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারেন ।

(গ) শিক্ষক তাঁর সহকর্মীর সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে আলোচনা করে কোন বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণা থাকলে সে বিষয়টি স্পষ্ট করতে পারেন । নিজদের মধ্যে পারস্পরিক মত বিনিময়ের মাধ্যমে কোনো অজানা বিষয় জানতে পারেন এবং নিজদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারেন ।

(ঘ) একজন শ্রেণি শিক্ষক বা বিষয় শিক্ষক যে বিষয়টিতে শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করবেন সে বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট জ্ঞান থাকতে হবে । একটি বিমূর্ত বিষয়কে শিক্ষার্থীর সামনে মূর্তমান করে তুলবেন একজন শিক্ষক । সুতরাং একজন শিক্ষককে শ্রেণিতে পাঠদানের পূর্বে তাঁর পাঠদানের বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিজে অধ্যয়ন করে সুস্পষ্ট জ্ঞান অর্জন করবেন এবং এটি হবে যে কোন শিক্ষকের জন্য একটি চলমান প্রক্রিয়া ।

(ঙ) বর্তমান পৃথিবীকে বলা হয় একটি বিশ্বগ্রাম । পৃথিবীটা এখন মানুষের হাতের মুঠোয় । যেমন করে কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র” তেমন করেই একজন শিক্ষককেও এই বিশ্বগ্রামের ছাত্র হতে হবে । তিনি নিজ দেশের শিক্ষানীতি সম্পর্কে যেমন জানবেন তেমনি জানবেন বিশ্বের অন্য দেশের শিক্ষানীতি এবং তাদের শিক্ষণ-শিখানো প্রক্রিয়া সম্পর্কে। তাহলেই তিনি একজন সফল শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিতে কার্যকরি পাঠদান করতে পারবেন ।

(চ) একজন শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষা বিষয়ক দেশীয় বা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার, সিম্পজিয়াম, কনফারেন্স ও ওয়ার্কশপে অংশ গ্রহণ করে তাঁর পেশাগত মান উন্নয়ন করতে পারেন । তিনি শিক্ষা সম্পর্কিত জার্নাল, ম্যাগাজিন, পত্রিকা, রিপোর্ট ইত্যাদি সংগ্রহ করে পড়ার মাধ্যমে তাঁর পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারেন।

(ছ) একটি লাইব্রেরি বা পাঠাগার হল জ্ঞানের ভান্ডার । শিক্ষক তাঁর সুবিধা মত সময়ে এই পাঠাগারে প্রবেশ করবেন নিজের জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর জন্য ।

০৫) মূল্যায়ন :
শিখন-শিখানো কার্যক্রমে মূল্যায়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া । মূল্যায়ন শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো ‘পরিমাপ’। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থায় মূল্যায়ন শব্দটি শুধু পরিমাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় । যেহেতু মূল্যায়ন একটি গঠনমূলক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া সেহেতু শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা শিখন-শিখানো কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করে শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে কতটা সফল হয়েছে শ্রেণি শিক্ষক তা নিরুপণ করেন । অন্যদিকে মূল্যায়ন এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ এবং আচরণের পরিমাণগত ও গুণগত পরিবর্তন নির্ণয় করেন ।

উইলিয়াম এডওয়া ডিমিং মূল্যায়নের জন্য চারটি ধাপ নির্ণয় করেছেন ১. পরিকল্পনা গ্রহণ ২. সম্পাদন ৩. বিশ্লেষণ বা গবেষণা ৪. ফলাফল

এখন আমরা শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে একজন শ্রেণি শিক্ষক বা বিষয় শিক্ষকের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করব ।

(ক) একজন শিক্ষককে মনে রাখতে হবে যে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের উদ্দেশ্য হলো তাদের মেধার বিকাশ এবং আত্মিক ও আচরণিক উন্নতি সাধন করা । মূল্যায়ন বা পরীক্ষণ বিষয়টি শিক্ষার্থীর নিকট ভীতিকর হিসেবে উপস্থাপিত হয়ে তাদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় শ্রেণি শিক্ষক সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন ।

(খ) একটি শ্রেণির শিক্ষার্থীর পরস্পরের মধ্যে অর্জন দক্ষতার ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়া মূল্যায়নের আর একটি অন্যতম উদ্দেশ্য ।

(গ) শ্রেণিতে শিক্ষণ-শিখানো কার্যক্রমের দূর্বলতা বা প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ।

(ঘ) বিদ্যালয়ের সাময়িক বা বার্ষিক কিংবা বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করবে মূল্যায়নের এটা আসল উদ্দেশ্য নয় । বরং মূল্যায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা শিখনফলের মাধ্যমে সুশিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করবে এবং ভালো মানুষ হিসেবে সমাজে বেড়ে উঠবে ।

(ঙ) পেশাদারী এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে একজন শ্রেণি শিক্ষক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সব সময় সকল শিক্ষার্থীর জন্য একই রকম ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন । মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পরিচয় যাতে প্রাধান্য না পায় বরং শিক্ষার্থীর মেধার মাধ্যমে সকলকে সমান দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করলে প্রতিভাবান শিক্ষার্থীরা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হবে ।

(চ) শ্রেণি শিক্ষক ঝইঅ (School Based Assessment) এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন । এ জন্য তিনি শিক্ষার্থীর cT বা class Test নিবেন। শিক্ষার্থীদের বাড়ীর কাজ (ঐড়সব ডড়ৎশ) ও নির্ধারিত কাজ (Home wrk) দেয়া এবং শ্রেণিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ঝইঅ এর অন্তর্ভুক্ত হবে ।

(ছ) একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করবেন মিড টার্ম বা সাময়িক পরীক্ষার মাধ্যমে ।

(জ) SBA, মিড টার্ম ও সাময়িক পরীক্ষার মূল্যায়নের পর শ্রেণি শিক্ষক নিজে বা বিষয় শিক্ষকদের সমন্বয়ে তাঁর শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত মানের অগ্রগতি সম্পর্কে পর্যালোচনা, গবেষণা বা বিশ্লেষণ করবেন ।

(ঝ) শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নের ফলাফল পর্যালোচনা, গবেষণা বা বিশ্লেষণে যদি শিক্ষার্থীদের কাঙ্খিত মানের উন্নতি হয় বা শিক্ষার্থীরা শিখনফল অর্জনে সফল হয় তাহলে শ্রেণি শিক্ষক শিক্ষার্থীর এই শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনের সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মনোনিবেশ করবেন ।

(ঞ) অন্যদিকে মূল্যায়নের প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনায় যদি দেখা যায় শিক্ষার্থীরা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে সফল হয়নি বা তাদের আচরণিক উন্নতি হয়নি কিংবা শিখনফল অর্জনে শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হয়েছে তাহলে শ্রেণি শিক্ষক বা বিষয় শিক্ষক শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ক্ষেত্রে নতুন কৌশল অবলম্বন করবেন ।

পরিশেষে বলতে চাই শ্রেণিতে একজন শ্রেণি শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম । আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনে জাতির নেতৃত্ব দিবে । তাই এই কঁচিকাঁচা শিক্ষার্থীর হৃদয়ে শিক্ষার উদ্দীপনা সৃষ্টিতে শ্রেণি শিক্ষক হবেন এক সুনিপুন আধুনিক কারিগর । তিনি শ্রেণিতে নতুন নতুন কলাকৌশল প্রয়োগে হবেন এমন এক ব্যক্তিত্ব যাতে শিক্ষার্থীরা সুশিক্ষা অর্জন করে পরিবার, সমাজ এবং জাতির খেদমত করতে পারে ।

তথ্যসূত্র :
০১. শিক্ষাক্রম বিস্তরণ ও মূল্যায়ন: বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
০২. Evaluation for Improving Students Outcomes, Luxembourg: Publications Office of the European Union, 2011.
০৩. শিক্ষায় মূল্যায়ন প্রসঙ্গে, দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭ মে ২০১৫ ।
০৪. শিক্ষক বাতায়ন

লেখক পরিচিতি-
বিল্লাল হোসেন কলতান,
সিনিয়র শিক্ষক, আল-আমিন একাডেমী স্কুল এন্ড কলেজ,
চাঁদপুর ।

নিউজ ডেস্ক : আপডেট, বাংলাদেশ সময় ০৬:০০ এএম, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার
ডিএইচ

Share