সূরা আর-রহমান: ফজিলত ও সার্বিক শিক্ষা
পবিত্র কুরআনের ৫৫ নম্বর সূরা হলো ‘সূরা আর-রহমান’। অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে,এটি মক্কায় নাজিল হয়েছে এবং এর আয়াত সংখ্যা ৭৮। সূরাটির প্রথম আয়াত ‘আর-রহমান’ অর্থাৎ ‘পরম দয়ালু’ আল্লাহর এই মহান নাম থেকেই সূরাটির নামকরণ করা হয়েছে।
সূরা আর-রহমানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এতে আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামত, তাঁর সৃষ্টির নিখুঁত ভারসাম্য, মানুষের জবাবদিহি এবং জান্নাত-জাহান্নামের পরিণতি ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সূরাটিতে ‘ফাবি আইয়ি আলা-ই রব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’- অর্থাৎ ‘অতএব, তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে?’ বাক্যটি ৩১ বার এসেছে। এখানে ‘তোমরা উভয়ে’ বলতে সাধারণভাবে মানুষ ও জিন জাতিকে বোঝানো হয়েছে।
সূরা আর-রহমানের শানে নুযূল ও পটভূমি
মক্কার মুশরিকরা আল্লাহর বিভিন্ন নাম ও গুণ নিয়ে আপত্তি করত। বিশেষ করে ‘আর-রহমান’ নামটি নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছিল। কুরআনে তাদের বক্তব্য এসেছে, ‘আর-রহমান আবার কে?’ এ ধরনের অস্বীকার ও অহংকারের জবাব দেওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর অসীম দয়া ও নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে এই সূরায়।
তবে সূরা আর-রহমানের নির্দিষ্ট শানে নুযূল হিসেবে কোনো একটি ঘটনার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য ও সর্বসম্মত বর্ণনা পাওয়া যায় না। সূরাটির মূল বক্তব্য হলো আল্লাহর পরিচয়, তাঁর নেয়ামতের স্বীকৃতি, সৃষ্টিজগতের ভারসাম্য এবং মানুষ ও জিনের পরকালীন জবাবদিহি।
কুরআন শিক্ষা ও মানব সৃষ্টির নেয়ামত
সূরার শুরুতেই আল্লাহ ‘আর-রহমান’ নাম উল্লেখ করে বলেন, তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর মানুষের সৃষ্টি এবং তাকে ভাব প্রকাশের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এখানে কুরআন শিক্ষার বিষয়টি মানুষের জন্য অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে সামনে এসেছে। কারণ মানুষকে শুধু শারীরিক অস্তিত্বই দেওয়া হয়নি, বরং সত্য-মিথ্যা বোঝার এবং সঠিক পথ অনুসরণের জন্য ওহির দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সৃষ্টিজগতের ভারসাম্য ও ন্যায়বিচার
সূরা আর-রহমানে সূর্য ও চন্দ্রের নির্ধারিত নিয়মে চলার কথা বলা হয়েছে। আকাশকে আল্লাহ উঁচু করেছেন এবং মিযান বা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এরপর মানুষকে সেই ভারসাম্য নষ্ট না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিচারব্যবস্থা- সব ক্ষেত্রেই ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। অন্যের অধিকার নষ্ট করা কিংবা মাপে-ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকার শিক্ষা রয়েছে এতে।
পৃথিবীর নেয়ামত
পৃথিবীতে মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, খেজুরগাছ, শস্য ও সুগন্ধি উদ্ভিদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ মানুষকে কৃতজ্ঞ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সূরাটিতে বারবার একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি মানুষের বিবেককে নাড়া দেয়- আল্লাহর এত নেয়ামতের পরও মানুষ কীভাবে তাঁর অনুগ্রহ অস্বীকার করতে পারে?
দু সমুদ্র ও আল্লাহর কুদরত
সূরা আর-রহমানে দুই সমুদ্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একটি অন্তরাল বা প্রতিবন্ধক রয়েছে। সেখান থেকে মুক্তা ও প্রবাল পাওয়া যায়। সমুদ্রে চলাচলকারী বিশাল জাহাজগুলোকেও আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব বর্ণনার মাধ্যমে মানুষকে প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও সৃষ্টিজগতের ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিন্তা করতে বলা হয়েছে।
মানুষ ও জিনের সীমাবদ্ধতা
সূরাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে মানুষ ও জিনকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, তারা যদি আসমান ও জমিনের সীমানা অতিক্রম করতে পারে, তবে অতিক্রম করুক; কিন্তু আল্লাহর দেওয়া ক্ষমতা ছাড়া তারা তা করতে পারবে না।
এ বক্তব্যের মাধ্যমে সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা এবং আল্লাহর সর্বময় কর্তৃত্ব স্পষ্ট করা হয়েছে। কিয়ামতের দিন মানুষের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ পাবে এবং কেউ নিজের কর্মের পরিণতি থেকে পালাতে পারবে না।
জাহান্নামের ভয়াবহ পরিণতি
যারা আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচারে লিপ্ত হবে, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। সূরাটিতে কিয়ামতের ভয়াবহতা এবং অপরাধীদের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বর্ণনার উদ্দেশ্য মানুষকে আতঙ্কিত করা নয় শুধু; বরং দুনিয়ার জীবনে সতর্ক হয়ে সৎকর্ম করার এবং আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেওয়া।
জান্নাতের নেয়ামত
সূরা আর-রহমানের শেষাংশে মুত্তাকিদের জন্য জান্নাতের বিভিন্ন নেয়ামতের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। সেখানে রয়েছে প্রবাহিত ঝরনা, ফলমূল, ছায়াঘেরা পরিবেশ এবং নানা ধরনের সৌন্দর্য ও প্রশান্তি। জান্নাতের এসব নেয়ামতের বর্ণনার মধ্যেও একই প্রশ্ন বারবার এসেছে- ‘অতএব, তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে?’ এর মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং তাঁর আনুগত্যের দিকে মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছে।
সূরা আর-রহমানের ফজিলত
সূরা আর-রহমানের তিলাওয়াত নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ, কারণ কুরআনের প্রতিটি অক্ষর তিলাওয়াতের জন্য সওয়াব রয়েছে। তবে সূরা আর-রহমান সম্পর্কে প্রচলিত কিছু বিশেষ ফজিলতের বর্ণনা রয়েছে, যেগুলোর সনদ ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাই দুর্বল বা বিতর্কিত বর্ণনাকে নিশ্চিত সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
তবে সূরাটির বিষয়বস্তু মানুষকে আল্লাহর নেয়ামত স্মরণ,কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, পাপ থেকে বিরত থাকা এবং পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়। নিয়মিত তিলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবন ঈমানি চেতনা জাগ্রত করতে সহায়ক হতে পারে।
সূরা আর-রহমান থেকে জীবন-শিক্ষা
আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা এই সূরার অন্যতম প্রধান শিক্ষা। মানুষের জীবন, পরিবার, খাদ্য, পানি, আলো-বাতাস, প্রকৃতি ও সুস্থতার মতো অসংখ্য নেয়ামত প্রতিনিয়ত আল্লাহর পক্ষ থেকে আসছে। তাই সামান্য বিপদে হতাশ না হয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায় ও ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, বিচার কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক- কোনো ক্ষেত্রেই অন্যের অধিকার নষ্ট করা যাবে না । তৃতীয়ত, আল্লাহর ক্ষমতা ও জবাবদিহির কথা মনে রেখে পাপ থেকে বিরত থাকতে হবে। মানুষ যত শক্তিশালীই হোক, আল্লাহর কর্তৃত্বের বাইরে যেতে পারে না। চতুর্থত,দুনিয়ার জীবন সাময়িক এবং পরকালই চূড়ান্ত গন্তব্য- এ উপলব্ধি অন্তরে ধারণ করতে হবে। জান্নাতের পুরস্কার ও জাহান্নামের শাস্তির কথা স্মরণ করে নিজের আমল সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত।
সূরা আর-রহমানের শেষ আয়াত
সূরাটির শেষ আয়াতে বলা হয়েছে,‘তাবারকাসমু রব্বিকা জিল জালালি ওয়াল ইকরাম’-অর্থাৎ,‘মহিমান্বিত তোমার রবের নাম,যিনি মহিমা ও সম্মানের অধিকারী।’ সূরা আর-রহমান মূলত আল্লাহর অসীম দয়া,সৃষ্টিজগতের নিখুঁত ব্যবস্থা,তাঁর অগণিত নেয়ামত এবং মানুষের প্রতি জবাবদিহির স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই শুধু তিলাওয়াত নয়, সূরাটির অর্থ ও শিক্ষা উপলব্ধি করে জীবনে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করাই হতে পারে একজন মুমিনের জন্য এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এ জি