Home / চাঁদপুর / নদীভাঙনের স্মৃতি ও বিশ্বাসের প্রতীক চাঁদপুরের ঐতিহ্য পুরান বাজার বড় মসজিদ
নদীভাঙনের

নদীভাঙনের স্মৃতি ও বিশ্বাসের প্রতীক চাঁদপুরের ঐতিহ্য পুরান বাজার বড় মসজিদ

এককালের প্রমত্তা মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মোহনায় গড়ে ওঠা চাঁদপুর জেলা শহরের প্রাচীনতম বাণিজ্য কেন্দ্র ‘পুরান বাজার’। আর এই ব্যস্ত জনপদের ঠিক মধ্যমণি হয়ে যুগের পর যুগ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘পুরান বাজার জামে মসজিদ’—যা স্থানীয়দের কাছে এক নামে ‘পুরান বাজার বড় মসজিদ’ হিসেবে পরিচিত। মেঘনার তান্ডবে একসময় পুরান বাজারের ভৌগোলিক সীমানা ছোট হয়ে এলেও, ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে অলৌকিকভাবে টিকিয়ে রাখা এই মসজিদটি আজ পুরো চাঁদপুরবাসীর এক সুগভীর আবেগের স্থান।

এক সময় এই মসজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের ধনী মাইলকে মাইল দুর থেকেও শোনা যেতো এবং রমজান মাসে মসজিদ থেকে সেহরি ও ইফাতারের সময় সাইরেন ভেসে আসতো। সেই সাইরেনের শব্দ শুনে মানুষ ইফতার ও সাহসির খেতো।

মেঘনার গ্রাসে পুরান বাজারের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হলেও এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি থেকে গেছে অক্ষত। স্থানীয়দের বিশ্বাস ও মুখে মুখে ফেরা গল্পে মসজিদটির টিকিয়ে থাকার পেছনে রয়েছে এক অলৌকিক পরশ। আশার কথা হলো, দীর্ঘদিন ধরে মেঘনার সেই প্রলয়ঙ্করি ভাঙন আর নেই; নদী শান্ত হয়েছে, তবে মসজিদকে ঘিরে মানুষের শ্রদ্ধা ও আবেগের পারদ কমেনি বিন্দুমাত্র।

মসজিদটির অন্যতম সৌন্দর্য হলো এর ধ্রুপদী স্থাপত্যশৈলী। দোতলা এই সুদৃশ্য ভবনের শরীরে রঙিন কাচ ও চিনামাটির টুকরো দিয়ে করা ‘চিনিটিকরি’ নকশার অনন্য কাজ চোখে পড়ে। দূর থেকেই নজর কাড়ে এর কারুকাজখচিত উঁচুমিনার। মসজিদের ছাদে রয়েছে চোখ জুড়ানো গম্বুজ ও ছোট ছোট মিনারের সমাহার। মসজিদের ভেতরের মার্বেল পাথর ও দৃষ্টিনন্দন লাইটিং মুসল্লিদের ইবাদতে দেয় প্রশান্তির ছোঁয়া।

তবে বর্তমানে পুরনো ঐতিহ্য অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

এটি শুধু একটি সাধারণ জুম্মা মসজিদ নয়, পুরো চাঁদপুর জেলায় তাবলিগ জামায়াতের প্রধান ‘মারকাজ’ বা প্রশাসনিক ও দাওয়াতি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই পুরান বাজার বড় মসজিদ। প্রতি সপ্তাহে ও বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় উপলক্ষে এখানে দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে আলোচনা হয়। জেলা ও জেলার বাহির থেকে আসা অগণিত তাবলিগি ভাই ও সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ ইবাদত-বন্দেগির উদ্দেশ্যে এই মসজিদে নিয়মিত সমবেত হন।

ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল হওয়ায় ভোরের আলো ফোটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যবসায়ী ও কেনাকাটা করতে আসা সাধারণ মানুষের প্রধান আশ্রয়স্থল এই মসজিদ। দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কেবল এই ঐতিহাসিক মসজিদে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ার তাগিদেও ছুটে আসেন। শত বছরের স্মৃতি, নদীভাঙনের ইতিহাস এবং দ্বীনি দাওয়াতের এক সুদৃঢ় কেন্দ্র হিসেবে পুরান বাজার জামে মসজিদ আজও আভিজাত্য নিয়ে কালের গর্ভে দাঁড়িয়ে আছে।

ধারণা করা হয় ১৭ শতকের শেষের দিকে নির্মিত এই মসজিদটি চাঁদপুর শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে গণ্য করা হয়। পুরান বাজারের ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মুসলিম জনগণের ঐকান্তিক দান ও সহায়তায় মসজিদটি নির্মিত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।এটি ঐ অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ, যা বাণিজ্যিক এলাকার মুসল্লিদের জন্য একটি অন্যতম প্রধান ইবাদতের স্থান। পুরান বাজারের এই ঐতিহাসিক মসজিদটি ব্যবসায়ীদের সততা ও ধর্মীয় অনুভূতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা শতাব্দী ধরে ঐতিহ্য বহন করে আসছে। মসজিদটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে এর স্থাপত্যবৈশিষ্ট্যের জন্য। চাঁদপুর জেলা শহরের সবচাইতে বড় এই পুরোনো মসজিদের ভেতরে এবং দ্বিতীয় তলায় প্রতি কাতারে ৮০ জন করে ২৫ কাতারে প্রায় ২০০০ জন মুসল্লির একসাথে নামাজ আদায় করতে পারে। তবে সম্প্রসারিত অংশ মিলিয়ে এখন এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজারের বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মুসল্লিদের মসজিদে প্রবেশ এবং বাহির হওয়ার জন্য বাজারের তিনটি রাস্তায় তিনি গেইট রয়েছে। চাঁদপুর চেম্বার অবকমার্স ভবনের সামনে মুসলিম মৃত নর নারীদের জানাজার নামাজেরও ব্যবস্থা রয়েছে।

দোতালা ছাদের এক পাশে মাঝারি আকারের একটি গম্বুজ রয়েছে। গম্বুজের চারকোনায় ৪টি ও সামনের এক অংশে আরো ৪টি সহ মোট ৮টি ছোট ছোট মিনার রয়েছে। গম্বুজ ও মিনার গুলিতেও চিনিটিকরির কারুকাজ করা রয়েছে। মসজিদের সামনেই বেশ উঁচু একটি চিনিটিকরির কারুকাজ করা মিনার রয়েছে। বেশ দূর থেকেই শতবর্ষের এ মসজিদের উঁচু মিনারটি দেখতে পাওয়া যায়।

চাঁদপুরের পুরান বাজার জামে মসজিদের (পুরান বাজার বড় মসজিদ) প্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট বা নিখুঁত কোনো সাল বা তারিখের লিখিত ঐতিহাসিক দলিল পাওয়া যায় না।
তবে স্থানীয় ইতিহাস, বয়োজ্যেষ্ঠদের জনশ্রুতি এবং সময়ানুক্রমিক তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মসজিদটি উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বা প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ বছর আগে (ব্রিটিশ আমলে) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। (এছাড়া সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য থাকলে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হলো) dchandpursomoy@gmail.com
মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় পুরান বাজার যখন একটি ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছিল, তখনই স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ী ও সাধকদের উদ্যোগে এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মসজিদটি দেখার জন্য এখনো প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মুসল্লিরা ছুটে আসেন।

প্রতিবেদক: এম. ফরিদুল ইসলাম/
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬