ধূসর স্মৃতির আয়নায় ট্রেডল মুদ্রণ শিল্পের সফল কারিগর সিরাজ পাটওয়ারী
আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির আবিষ্কার ও দেশের সর্বত্র দ্রুত কম্পিউটারের অনুপ্রবেশের ফলে মুদ্রণ শিল্প এখন হারিয়ে গেছে। আগের হ্যান্ড মেটার টাইপ পদ্ধতি সেকেলে হয়ে যাওয়ায় এর সকল শ্রমিক কর্মচারী বা কারিগর বা শিল্পীরা বেকার হয়ে গেছে এবং বৃটিশ আমল থেকে প্রচলিত হওয়া ট্রেডেল মুদ্রণ যন্ত্রটির ব্যবহার আর দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউবা আবার বয়সের ভারে নুয়্যে পড়েছেন। ভবিষ্যৎ অন্ধকারাছন্ন দেখে কেউ বা আবার পেশাও ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ধূসর স্মৃতির আয়নায় ভেসে আসা ট্রেডল মুদ্রণ শিল্পের সফল কারিগর সিরাজ পাটওয়ারী একজন।
ট্রেডেল মুদ্রণ শিল্পের সফল কারিগর মরহুম সিরাজ পাটওয়ারী ছিলেন তাদেরই মধ্যে একজন। মরহুম সিরাজ পাটওয়ারী দীর্ঘ ৪০ বছর এ মুদ্রণ শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। পেশা হিসেবে জীবন কাটিয়েছে। আমি সফরমালী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকুরি করা সুবাদে দিন দিন খুবই কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম। মৃত্যুর ক’মাস আগে একদিন হঠাৎ করে আমাকে তিনি নৌকা যোগে চাঁদপুর কোড়ালিয়া হেঁটে আসার সময় সহাস্য বদনে বললেন,‘আপনি খুব সুন্দর সুন্দর সংবাদ লিখেন। আমার সম্পর্কে কিছু একটা লিখুন।’সাথে সাথেই নৌকায় বসে গেলাম তথ্য নিতে মরহুম সিরাজ পাটওয়ারীর দীর্ঘ ৪০ বছর মুদ্রণ শিল্পের সাথে সম্পৃক্তের অভিজ্ঞতার কথা। তিনি কম্পোজিটর ছিলেন। তাই আমার ধূসর স্মৃতির আয়নায় মুদ্রণ শিল্পের সফল কারিগর সিরাজ পাটওয়ারীর কর্মময় জীবনের সার সংক্ষেপ তথ্য-উপাত্ত থেকে উল্লেখ করলাম। এ ছাড়াও আমি তার দু’ছেলে ও দু’মেয়ের শিক্ষক বিধায় আমাকে খুব সম্মান ও ভালো জানতেন ।
চাঁদপুর শহরের ৬ কি.মি.উত্তরে সফরমালী এলাকার পশ্চিম কল্যান্দি গ্রামের সিরাজ পাটওয়ারী দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এ মুদ্রণ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে চাঁদপুরের বেশ ক’টি সংবাদপত্র প্রকাশের কাজে জড়িত ছিলেন। তাঁর পুরো নাম ছিলো সিরাজুল ইসলাম পাটওয়ারী। পিতার নাম মরহুম সায়েদ আলী পাটওয়ারী এবং মাতার নাম আছিয়া খাতুন। চাঁদপুর সদরের কল্যাণপুর ইউনিয়নের পশ্চিম কল্যান্দি গ্রামে ১৯৩৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি সিরাজ পাটওয়ারী জন্মগ্রহণ করেন। ৩ ছেলে ও ২ কন্যা সন্তানের জনক তিনি ছিলেন। ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত সাদামাটা, সৎ, নিষ্ঠা,কর্তব্যপরায়ণ, নিরঅহংকারী,পরিশ্রমী ও ধর্মভীরু ছিলেন। সিরাজ পাটওয়ারী ৮১ বছর বয়সে ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন।
ছোটবেলায় নিজ গ্রামের পাঠশালায় তৎকালীন সফরমালী হাই মাদ্রাসা থেকে ১৯৫৭ সালে এসএসসি সমমানের পরীক্ষায় পাশ করেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সুন্দর বাংলা, ইংরেজি ও আরবী জানতেন,কথা বলতে ও লিখতেও পারতেন। এসএসসি পাশ করার পর পরই চাকুরির খোঁজে তিনি বিভিন্ন স্থানে ও আত্মীয়-স্বজনের নিকট যান। অবশেষে তার খালু কামিজ উদ্দিন পাটওয়ারীর সান্নিধ্যে এসে হাতে মুদ্রণ শিল্পের বা মেটার টাইপ কাজ শিখেন। শেষ পর্যন্ত এক রকম বাধ্য হয়েই তিনি এ কাজটি জীবনের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে বেঁচে নেন। তৎকালীন চাঁদপুর শহর ও পুরাণ বাজারের জিলানী প্রেস,মাস্টার প্রেস,যমুনা প্রেস ইত্যাদি বিভিন্ন প্রেস‘হ্যান্ড মেটার টাইপ’কাজে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। ফলে যে কোনো প্রেসে তার কদর ও সম্মান ছিলো আকাশছোঁয়া। কিন্ত কখনো ডেইলি হাজিরায় কখনো বা মাসিক বেতনে চাকুরি হিসেবে কাজ করতেন। তখনকার প্রেসের এমন অবস্থাতেই কাজ করতে হত। কত নৈপূণ্য ও ধৈর্য্যরে সাথে হ্যান্ড মেটার টাইপের কাজ করতে হত তা’বলার অপেক্ষা রাখেনা বলে তিনি জানিয়েছেন।
চাঁদপুরের সাবেক প্রেসক্লাব সভাপতি গোলাম কিবরিয়া জীবন (যিনি বর্তমানে যুক্ত রাষ্ট্রে অবস্থানরত) ট্রেডের্লে সাহায্যে এর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক চাঁদপুর বার্তা, জিলানী প্রেসে বর্তমান চাঁদপুর কণ্ঠ ও রূপসী চাঁদপুর, চাঁদপুর সংবাদ প্রভৃতি তৎকালীন সংবাদগুলোতে পর্যায়ক্রমে তিনি হাতে মেটার বসানোর কাজে করতেন। তখন এসব পত্রিকাগুলো নিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক হিসেবে বের হতো। সকাল ভোরে পায়ে ঁেহটে কিংবা সফরমালীর ফজল শেখের ‘খেয়া নৌকায়’পরবর্তীতে ‘ইঞ্জিন চালিত নৌকায় ’চাঁদপুর যাওয়া-আসতেন। আবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতেন। কোনো কোনো প্রেস মালিক মাসিক বেতন আবার কোনো দিন দৈনিক হাজিরা নিয়েই চলে আসতেন। রমজানে মাসে ইফতারের আগেই পরিবারের সবার সাথে বসে ইফতার খেতেন বলে জানান। তখন দৈনিক হাজিরা ছিল ৬০-৭০ টাকা। পরবর্তীতে তা’বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১শ’৭০ টাকা। তবে জাতীয় সংসদ ও ইউপি নির্বাচন কিংবা অন্য কোনো নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ওনাদের কদর বাড়ত। চাঁদপুরের প্রেস ব্যতীত সিরাজ পাটওয়ারী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন মুদ্রণ প্রেসে যৌবনের প্রথম ভাগে কাজ করেছেন বলেও জানা।
তিনি আরবী ভাষায় কোরআন বা বিভিন্ন ইসলামী বই আমপাড়া,কায়দাসহ বিভিন্ন ধরনের বই মূদ্রণের কাজ করতেন। বাংলা ও ইংরেজির চেয়ে আররি টাইপ করতে তিনি বেশি পছন্দ করতেন। যার ফলে কোরআন শরীফ ও ছাপার দায়িত্ব পালন করেছেন। সহকর্মীদের মধ্যে আবদুল কাদের,মোবারক হোসেন,বাশার খান,নুরু মিয়া,ফজলুল হক,আলমগীর হোসেন,কৃষ্ণ,নাজির পাটওয়ারী, মধু,সুলতান খান,আ.কুদ্দুস,মজিদ মিঞা,আহমদ মিয়া,খোরশেদ আলম,বাবুল ইত্যাদি ক’জনের নাম মনে করতে পারছেন বলে পলিতকেশবৃদ্ধ সিরাজ পাটওয়ারী তখন জানিয়েছেন। প্রায় ১ ঘন্টর পথে কিছ’ তিক্ত ব্যথা-বেদনার কথাও তিনি বলেছেন্।
প্রেসে পত্রিকার পারিশ্রমিকভাবে পেতেন ১শ’টাকা করে ৪ পৃষ্ঠায় ৪ শ’টাকা। নিখূঁত ও ধীরস্থীর ভাবে এসব কাজ করতে হতো। প্রতিটি পৃষ্ঠার কাজ হাতে মেটার বসিয়ে করতে হতো। ছাপানো বাবদ পেতেন ৫০ টাকা পৃষ্ঠা। এক সময় তিনি মুদ্রণ শিল্প কর্মচারী বা কারিগরদের জেলা সমিতির সভাপতিও ছিলেন। পরবর্তীতে আজকের চাঁদপুর কণ্ঠের প্রধান সম্পাদক কাজী শাহাদাত সভাপতির দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বলেন। তারা সবাই তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করেন এবং যথাযথ সম্মান দিতেন।
শিক্ষার প্রতি তাঁর অঘাত অনুরাগ ছিল তাঁর। তাই ছেলে-মেয়েদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করিয়েছেন। তাঁর বড় ছেলে মো.রফিকুল ইসলাম ঢাকাস্থ ভূমি অফিসের একজন কর্মকর্তা,মেঝো ছেলে মো.সফিকুর প্রবাসী,ছোট ছেলে আমিনুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্রে কম্পিউটার গ্রাফিক্সে কাজ করছেন। তিনি ডিবি লটারীর মাধ্যমে এ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পান। ছোট মেয়ে মাষ্টার্স পাস করার পর দাম্পত্য জীবনে রয়েছেন। সবাই আজ স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের স্বাবলম্বী।
মরহুম সিরাজ পাটওয়ারী এক পর্যায়ে কাজী শাহাদাত সাহেবের সাথে পত্রিকা বের করার কাজ দীর্ঘদিন জিলানী প্রেসে ও সাপ্তহিক চাঁদপুর প্রেসে কাজ করেন। বেশ ২-৩ বছর যাবৎ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন। চোখেও দেখতে পারতেন না ভাল ভাবে। দাঁতের ও সমস্যা ছিলো বলে তিনি তখন জানান। মুদ্রণ শিল্পের এ কিংবদন্তী কালের আবর্তে,চাহিদা দিন দিন কমে যাওয়ায় এবং কম্পিউটারের হাওয়া চাঁদপুর এসে পৌঁছানোর পর ছেলে-মেয়েদের তাগিদে তিনি ২-৩ বছর আগেই পেশা ছেড়ে বাড়িতে চলে এসেছেন। কালের আবর্তে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে এখন এ শিল্পটির অস্তিত্ব নেই চাঁদপুরে। হ্যান্ড মেটারের বর্ণমালার পরিবর্তে এখন কম্পিউটাররের মাধ্যমে ও সম্পূর্ণস্বংস্ক্রিয় মেশিনে এ সব কাজ চলছে। কিছুদিন আগে নজির পাটওয়ারী বলেন,‘আমাদের অনেকেই তাঁদের সেই পুরনো পেশার পরিবর্তে নতুন পেশাও বেছে নিয়েছেন।’
জীবন সায়াহ্নের সেই টগবগে যুবক ৮১ বছরের পলিতকেশ বৃদ্ধ ২০১৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে তার দু’ছেলে,২ মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছেন। তিনি আজ বেঁচে নেই কিন্ত তাঁর কিছু ধূসর স্মৃতি সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হবে বলে আশা করি।
আমরা সংবাদকর্মীগণ এককালের ট্রেডল মুদ্রণ শিল্পের সফল কারিগর মরহুম সিরাজ পাটওয়ারীর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
আবদুল গনি
১৩ অক্টোবর ২০২৬
এ জি