Home / চাঁদপুর / চাঁদপুরে মোহনায় এমভি নাসরিন লঞ্চ ট্র্যাজেডির ২৩ বছর
মোহনায়

চাঁদপুরে মোহনায় এমভি নাসরিন লঞ্চ ট্র্যাজেডির ২৩ বছর

বাংলাদেশের নৌ-দুর্ঘটনার ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায় এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ ট্র্যাজেডির ২৩ বছর পূর্ণ হলো। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই চাঁদপুরের মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় লঞ্চটি ডুবে গেলে প্রাণ হারান ও নিখোঁজ হন প্রায় ৮০০ যাত্রী। দুই দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে ভোলার মানুষকে।

১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর ভোলাবাসীর জীবনে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত হয় নাসরিন-১ লঞ্চডুবির ঘটনা। বিশেষ করে লালমোহন, চরফ্যাশন, মনপুরা ও তজুমদ্দিনের অসংখ্য পরিবার একদিনেই হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে। অনেক নারী হয়েছেন বিধবা, অসংখ্য শিশু হয়েছে এতিম, আর বহু বাবা-মা আজও ফিরে পাননি তাদের সন্তানের মরদেহ।

দুর্ঘটনার দুই দিন পর মেঘনার বিস্তীর্ণ এলাকা যেন পরিণত হয়েছিল লাশের নদীতে। নদীর তীর, চরাঞ্চল ও ঝোপঝাড়ে ভেসে ওঠা মরদেহের বিভীষিকাময় দৃশ্য এখনও শিউরে তোলে প্রত্যক্ষদর্শীদের। সেই স্মৃতি আজও ভোলার মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।

ঢাকা-লালমোহন রুটে চলাচলকারী নাসরিন-১ লঞ্চটিতে সেদিন ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যাত্রী ও মালামাল বোঝাই করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত চাপ ও প্রবল স্রোতের কারণে লঞ্চটির তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে এটি ডুবে যায় বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে আসে। ধারণা করা হয়, দুর্ঘটনায় অন্তত ৮০০ যাত্রীর সলিল সমাধি ঘটে। এর মধ্যে শুধু লালমোহনেরই দুই শতাধিক যাত্রী ছিলেন।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোস্ট ট্রাস্টের তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় আট শতাধিক যাত্রী নিহত বা নিখোঁজ হন। শনাক্তদের মধ্যে চরফ্যাশনের ১৯৮ জন, লালমোহনের ২৬৪ জন এবং তজুমদ্দিনের ১৩ জন ছিলেন। নিহতদের মধ্যে ১১০ জন নারী, ৯৬ জন শিশু ও বৃদ্ধ, ৬৬ জন গৃহিণী, ৫৪ জন দিনমজুর, ৩৬ জন কৃষক, ৩৬ জন ব্যবসায়ী, ৩৩ জন ছাত্র, ৩৩ জন রিকশা ও ভ্যানচালকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিলেন। দুর্ঘটনায় ৪০২টি পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য মারা যান এবং ১২৮টি পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারায়।

এদিকে, দুর্ঘটনার দুই দশক পরও ক্ষতিগ্রস্ত অনেক পরিবার এখনও ন্যায়বিচার ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের অপেক্ষায় রয়েছে। গত বছর ভোলা আইনজীবী সমিতি ভবনে “লঞ্চ ডুবিতে আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইনগত বাধ্যবাধকতা” শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যরা তাদের বেদনাদায়ক স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) আয়োজিত ওই সভায় উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

নাসরিন-১ লঞ্চ ট্র্যাজেডির ২৩তম বার্ষিকীতে নিহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্বজনরা বলেন, এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত যাত্রী ও মালামাল পরিবহন বন্ধ করা এবং দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর যথাযথ পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
৯ জুলাই ২০২৬