চাঁদপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ
‘ইতিহাস জানি নীরব সাক্ষী তুমি, আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশভূমি’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে চাঁদপুরে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে গণমানুষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) চাঁদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ উপলক্ষে এক স্মরণসভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জেলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষাঙ্গনের বিশিষ্টজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহম্মেদ জিয়াউর রহমান। এ সময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, সাহিত্যপ্রেমী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় গুণীজন উপস্থিত ছিলেন।
স্মরণসভায় বক্তারা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন, সাহিত্যকর্ম এবং তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও গণমুখী চিন্তাচেতনা নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে সমাজের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের অধিকার, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবির আপসহীন অবস্থান আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
‘সুকান্ত ভট্টাচার্য কেন আজও প্রাসঙ্গিক?’ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুরের পরিচালক মাইনুল ইসলাম মানিক বলেন, সমাজে আজও ক্ষুধা রয়েছে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম চলছে এবং অনেক শিশুর জন্য এখনও একটি সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আর এসব বাস্তবতার কারণেই সুকান্ত ভট্টাচার্য আজও আমাদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
কবির সমাজচেতনা ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন চাঁদপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শরীফ মাহমুদ চিশতী। তিনি সুকান্তের কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, অধিকারবঞ্চনা এবং সমাজের বৈষম্যমূলক বাস্তবতার যে শক্তিশালী প্রতিফলন ঘটেছে, তা তুলে ধরেন।
চাঁদপুর সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুজ্জামান তাঁর আলোচনায় বাংলা সাহিত্যের দুই বিদ্রোহী ও বিপ্লবী চেতনার কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং সুকান্ত ভট্টাচার্যের সাহিত্যকর্মের তুলনামূলক মূল্যায়ন করেন। তিনি তুলে ধরেন, ভিন্ন সময় ও প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে উভয় কবিই তাঁদের ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে শোষণ, বঞ্চনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
আলোচনা পর্বে সুকান্তের কালজয়ী কবিতার পঙ্ক্তি, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’ স্মরণ করে বক্তারা বলেন, কবির এই উচ্চারণ আজও সমাজবাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর কবিতা শুধু একটি সময়ের কথা বলে না, বরং মানুষের মুক্তি ও একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ধারণ করে।
আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন আনন্দ ধ্বনি সঙ্গীত নিকেতন সুকান্তের গণমুখী গান পরিবেশন এবং তাঁর কবিতা আবৃত্তি করে। শিল্পীদের পরিবেশনায় মিলনায়তনে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আবহ।
বিপুল সংখ্যক সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিজন ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে গণমানুষের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদযাপনের এই আয়োজন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। কবির সাম্য, মানবতা ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
প্রতিবেদক: কবির হোসেন মিজি/
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬