ফিচার

ও তো এখন আর আমাকে আগের মতো আর সময় দেয় না

‘ও এখন আমাকে আগের মতো আর ভালোবাসে না। আমি এখনো ওকে অনেক ভালোবাসি, কিন্তু ইদানীং আমাদের সম্পর্কটা ভীষণ নিষ্প্রাণ মনে হয়, কোথায় যেন সুর কেটে গেছে। আমার খুব রাগ লাগে, যখন দেখি ও আমাকে আগের মতো আর সময় দেয় না আর এটা বললেই ও ভীষণ খেপে যায়। ও আমাকে আগে অনেক ভালো বুঝত, কিন্তু এখন বুঝতেই চায় না। যা-ই বলি, তা-ই শুনে বিরক্ত হয়। আমি কী করব কিছুই বুঝতে পারি না!’ কাউন্সেলিং নিতে আসা অনেকেই তাঁদের সঙ্গীর ব্যাপারে এমন কথা বলে থাকেন। পুরোনো দিনগুলো কত ভালো ছিল আর সামনের দীর্ঘ পথটুকু সঙ্গীকে নিয়ে কী করে পার করবেন, তাই নিয়ে হতাশা আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন। অনেকের এমন ধারণাও কাজ করে যে ভালোবাসার সম্পর্কগুলোর নিয়তি বুঝি এমনই, শুরুটা সুন্দর, তারপর ধীরে ধীরে বিষাদ নেমে আসে এবং শেষমেশ শুধু টিকে থাকা।

প্রতিটা সম্পর্কেই ব্যক্তি কিছু না কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। আপনি ও আপনার সঙ্গী ছাড়াও চারপাশের প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। এই পরিবর্তন ইতিবাচক, নেতিবাচক দুভাবেই জীবনে আসতে পারে। নেতিবাচক পরিবর্তনে যে দুর্দশা তৈরি হয়, তা দুজন সঙ্গীর মধ্যকার যোগাযোগে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাঁরা একে অন্যের প্রতি সমালোচনামূলক, নিজের প্রতি রক্ষণাত্মক এবং অন্যের প্রতি অবজ্ঞাসূচক আচরণ করতে থাকেন। নিরপেক্ষ এমনকি ইতিবাচক ঘটনাও তাঁদের কাছে তখন নেতিবাচক হিসেবে পরিলক্ষিত হয়।

এভাবে দুর্দশাগ্রস্ত সঙ্গীদের মধ্যে অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি হতে থাকে। একপর্যায়ে সম্পর্কটাকে তাঁদের কাছে বোঝা মনে হতে শুরু করে। যা সম্পর্কের খুব স্বাভাবিক একটা পর্যায়। বেশির ভাগ সম্পর্কই কোনো না কোনো সময়ে এ রকম পরিস্থিতিতে পড়ে। কেউ কেউ এটি থেকে বের হতে পারেন, কেউ কেউ আরও দুর্দশার দিকে এগোতে থাকেন।

মানুষ হিসেবে আমরা সাধারণত কারও না কারও সঙ্গে যুক্ত থাকতে চাই। আশপাশের মানুষ যেন আমাকে পছন্দ করে, জীবনের নিয়ন্ত্রণ যেন আমার হাতে থাকে। এই চাওয়াগুলো যখন পূর্ণ হয়, তখন একজন মানুষ কল্যাণ, মঙ্গল এবং জীবনের একটা উদ্দেশ্য খুঁজে পায়।

সাধারণত তিনভাবে মানুষ সাড়া দেয়—আগ্রহ, অবজ্ঞা ও উপেক্ষা।

যখন অবজ্ঞা করা হয়, তখন তাতে থাকা তাচ্ছিল্য, সমালোচনা ও উপহাসের আক্রমণাত্মক ইঙ্গিতে সঙ্গী অসম্মানিত বোধ করে, যা তার মধ্যে রাগ, ঘৃণা, সন্দেহ ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। আর যখন উপেক্ষা করা হয়, তখন গুরুত্ব না পাওয়া সঙ্গীর মধ্যে কষ্ট ও বিষাদ তৈরি করে। একটা সম্পর্কের সাফল্য মূলত নির্ভর করছে আপনার সঙ্গীর সঙ্গে আপনি ‘আগ্রহ’, ‘অবজ্ঞা’ না ‘উপেক্ষা’ কোনটা করছেন, তার ওপর।

‘তুমি আমাকে ইদানীং একদমই সময় দিচ্ছ না’—এভাবে অভিযোগ না করে আপনি বলতে পারেন যে ‘আমার তোমার কাছে কিছু সময় দরকার’, যা আপনার প্রয়োজনকে প্রকাশ করবে। যদি অভিযোগের আকারেই বলতে চান, সেটাকে আপনার ভাবনালব্ধ পরম সত্য হিসেবে প্রকাশ না করে আপনার উপলব্ধি কিংবা পর্যবেক্ষণ হিসেবে প্রকাশ করতে পারেন।

‘তুমি আমাকে ইদানীং একদমই সময় দিচ্ছ না’—এভাবে অভিযোগ না করে আপনি বলতে পারেন যে ‘আমার মনে হচ্ছে, তুমি ইদানীং খুব ব্যস্ত’ (উপলব্ধি) কিংবা ‘আমি দেখতে পাচ্ছি, গত দুদিন ধরে তোমার বাড়ি ফিরতে দশটা বেজে যাচ্ছে এবং তুমি আমার সঙ্গে কথা বলার সময় বের করতে পারছ না’ (পর্যবেক্ষণ)। যখন অভিযোগ করা হচ্ছে, তখন একসঙ্গে সব অভিযোগ না করে একটা বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকা ভালো। আপনার সঙ্গী আপনাকে সময় দিচ্ছে না, এটা বলতে গিয়ে যদি আপনি সঙ্গে আরও দশটি অভিযোগ করেন, তখন কোনোটাই ঠিকমতো কথা বলা হবে না। কোনো সমাধানই আসবে না বরং একটা বিষয় নিয়ে একদিনে কথা বললে তা নিয়ে একটা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব।

যদি এ রকম হয় যে আপনার সঙ্গীর সঙ্গে আপনার পুরোনো কিছু বিষয়ের দ্বন্দ্ব এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। যা নিয়ে আপনি এখনো প্রচুর কষ্ট, রাগ কিংবা হতাশা পুষে রেখেছেন এবং এর মধ্যেই নতুন কোনো দ্বন্দ্বের আবির্ভাব হলে সেটা নিয়ে যখন কথা বলতে যাবেন, তখন স্বভাবতই পুরোনো প্রসঙ্গগুলোও চলে আসবে। অতীত, বর্তমান—এই দুইয়ের অভিজ্ঞতা তখন আপনার ভবিষ্যৎকেও ভীষণ শঙ্কায় ফেলবে এবং অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ এই তিনের সম্মিলিত চিন্তারাশি আপনার মধ্যে তখন চূড়ান্ত রকম অপ্রীতিকর অনুভূতি তৈরি করবে। এই রকম সময়ে আমরা খুব কমই যুক্তি দিয়ে ভাবতে পারি ফলে বেশির ভাগ সময়েই অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। এ রকম পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ছোট-বড় যেকোনো রকম দ্বন্দ্ব নিয়েই সঙ্গীর সঙ্গে খোলামেলা ঠান্ডা মাথায় কথা বলা এবং নিজের মধ্যে পুষে না রাখা। আপনাদের সম্পর্কের মধ্যে যেসব দ্বন্দ্ব নিয়ে কথা হচ্ছে না, তা যত দ্রুত খুঁজে বের করুন এবং প্রয়োজন আকারে সঙ্গীর কাছে প্রকাশ করুন। মনে রাখবেন, আপনি যা বলছেন, যা বলছেন না (মনে পুষে রাখছেন) তা আপনাদের সম্পর্ককে বেশি তিক্ত করছে।

আত্মরক্ষা মানুষের সহজাত একটা প্রক্রিয়া। সঙ্গীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজের অজান্তেই আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত হই। বুঝে কিংবা না বুঝে করা নিজের ভুলকে সামনে আসতে দিতে চাই না। এই স্বতঃস্ফূর্ত আত্মরক্ষার অভ্যাস থেকে বের হতে পারা হবে আমাদের জন্য অনেক বড় একটা অর্জন। যখন সঙ্গী অভিযোগ করছেন, সেই অভিযোগটাকে সম্মান দেওয়া এবং গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হতে পারে আমাদের প্রথম কাজ। এতে অভিযোগকারী অনুভব করবেন যে সঙ্গী তাঁকে বুঝতে পারছেন। এর পরের ধাপে, অভিযুক্ত ব্যক্তি সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করতে পারেন যে এই সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তিনি কীভাবে তাঁকে সহায়তা করতে পারেন কিংবা ব্যক্তি নিজেই সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁর করণীয় বিষয়টি সঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।

গবেষণা বলে, বেশির ভাগ সম্পর্কের ক্ষেত্রেই দ্বন্দ্ব এই কারণে হয় যে সঙ্গীরা একই পরিস্থিতিকে ভিন্ন ভিন্নভাবে অনুধাবন করেন। একই পোশাক কিংবা সিনেমা কিংবা খাবার একজনের কাছে খুব ভালো তো অন্যজনের কাছে বিশ্রী। এই ভিন্নতা সঙ্গীদের মধ্যে আবেগীয় দূরত্ব তৈরি করে। এমনকি এই ভিন্নতা থেকে আমরা প্রায়ই দ্বন্দ্বে জড়াই, ‘কীভাবে এমন সুন্দর জিনিসকে একজন বাজে বলতে পারে’, কিংবা ‘কীভাবে এমন বিশ্রী একটা জিনিসকে মানুষ সুন্দর বলতে পারে’, এভাবে আমরা একে অন্যের সমালোচনা করে ফেলি। এই ক্ষেত্রে ‘সম্মিলিত অর্থবহতা’ আমাদের আবেগীয় যোগাযোগকে নিশ্চিত করতে পারে। সম্মিলিত অর্থবহতা হলো, সঙ্গীদের মধ্যে বিদ্যমান মিলগুলোকে খুঁজে বের করা। এই ভালো লাগা কিংবা খারাপ লাগার বাইরেও এমন একটা বিষয় খুঁজে বের করা যাতে একমত পোষণ করা যেতে পারে। এমনকি আমরা যে একই প্রসঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি, অন্তত এই দ্বিমত পোষণ করায় আমরা একমত হতে পারি। ছোট ছোট বিষয়, যেমন একসঙ্গে রাতের খাবার খাওয়া, সঙ্গীকে হাসিমুখে বিদায় দেওয়া, বিশেষ দিনগুলা উদ্‌যাপন করা, একসঙ্গে বাগান করা, রান্না করা এমনকি দাঁত মাজাও সঙ্গীদের মধ্যে সম্মিলিত অর্থবহতা তৈরি করতে পারে। এভাবে, আমরা যখন একে অন্যের পছন্দ-অপছন্দকে সম্মান করব, পাশে থাকব, একে অন্যের স্বপ্নকে অনুপ্রাণিত করব এবং তা অর্জনে সাহায্য করব এমনকি তখনো যখন সঙ্গীর সেই অর্জনে আমার কোনো লাভ নেই, তখনই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থার সম্পর্ক স্থাপিত হবে।

জানা আর প্রয়োগ করা এক বিষয় নয়। ওপরের বিষয়গুলো এক-দুই দিনেই অর্জন সম্ভব নয়। ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকুন। শুরুতে সঙ্গীকে সরাসরি মুখ ফুটে বলতে না পারলে অন্তত মনে মনেই বলুন, নিজের সঙ্গে নিজেই মহড়া চালিয়ে যান, একসময় মনের ভাষা ঠিক মুখে চলে আসবে।

আর তাতেও যদি কাজ না হয়, বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে পারেন।

লেখক: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক

Share