Home / জাতীয় / গুলশান হামলার পূর্বের চিত্রপট সোস্যাল মিডিয়ায়
গুলশান হামলার পূর্বের চিত্রপট সোস্যাল মিডিয়ায়

গুলশান হামলার পূর্বের চিত্রপট সোস্যাল মিডিয়ায়

গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা এবং বীভৎস হত্যাযজ্ঞের চিত্রপট অনেকটাই ঘুরে যাচ্ছে। এক মাসের তদন্তে পুলিশ ও গোয়েন্দারা পাচ্ছে নানা তথ্য-প্রমাণ।

জিম্মি দাবিদার প্রকৌশলী হাসনাত রেজা করিম এবং কানাডার টরন্টো ইউনিভার্সিটির ছাত্র তাহমিদ হাসিব খান এখন অন্যতম সন্দেহভাজন।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি স্থিরচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ এ সন্দেহকে করছে অনেক বেশি জোরালো; যদিও তদন্তসংশ্লিষ্টরা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট করে বলেননি জঙ্গি হামলায় হাসনাত ও তাহমিদের ভূমিকা কী ছিল।

তবে পর্যবেক্ষকদের অভিমত, অভিযানে নিহত জঙ্গিদের সঙ্গে এ দুজনের পুরনো সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা বেশি। যৌথ অভিযানের আগে সকালে আর্টিজানের ছাদে এক জঙ্গির সঙ্গে হাসনাত ও তাহমিদ আলাপ-আলোচনা করেছেন বলে একাধিক স্থিরচিত্রে ধরা পড়েছে।

ছবিতে তাহমিদের অস্ত্র ধরার চৌকস কৌশল সন্দেহ বাড়াচ্ছে কয়েক গুণ। বর্তমানে এ দুজন আট দিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের সঙ্গে জড়িত—এমন তথ্য কয়েক বছর আগে থেকেই গণমাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ‘আইএস’-এর নাম করে হলি আর্টিজানে হত্যাযজ্ঞ চালানোর সময় সপরিবারে তাঁর উপস্থিতি ‘কাকতালীয়’ বলে মানতে পারছেন না তদন্তসংশ্লিষ্টরাও।

বিদেশে অধ্যয়নরত তাহমিদ দেশে ফিরেই হলি আর্টিজানে যান বলে জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন। কিন্তু ঘটনার সময় তাঁর গতিবিধি দেখে বিস্তর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিমান ভ্রমণের ক্লান্তি, ভয়াবহ নৃশংসতার মধ্যে সারা রাত কাটানোর পরও সকালে একটি বাসায় তাঁর অবস্থান অনেকটাই প্রাণবন্ত ছিল, যা ভাবিয়ে তুলেছে গোয়েন্দাদের।

এ দুজনের বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ভিডিও ক্লিপ এবং ছবিতে দেখা হাসনাত করিম ও তাহমিদ হাসিব খানের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। কী পরিস্থিতিতে অস্ত্র হাতে নিয়েছে, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষ না হলে এ বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য আমরা দিতে পারছি না।’ সূত্র জানায়, ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার পর পাশের ভবনের বাসিন্দা এক কোরিয়ান নাগরিক ভিডিও ধারণ করেন। তাতে ধরা পড়ে জঙ্গিদের পাশাপাশি হাসনাত ও তাহমিদের গতিবিধি। ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও তাঁদের স্বাভাবিক আচরণ নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। এরপর বিভিন্ন সূত্রে গণমাধ্যমে আসে তাঁদের বেশ কিছু স্থিরচিত্র। ছবি ও ভিডিও ক্লিপ নিয়ে নানা রকম বিশ্লেষণ চলতে থাকে।

এ পরিস্থিতিতে পুলিশ তাঁদের হেফাজতে নিয়ে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করে। কিন্তু সন্দেহভাজন এ দুজনের অবস্থান ও ভূমিকা সম্পর্কে পুলিশ গত এক মাসে পরিষ্কার কিছু জানায়নি। একপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে নজরদারিতে আছেন। সর্বশেষ বুধবার তাঁদের গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ।

এরপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে আট দিনের রিমান্ডে। ছবি নিয়ে সন্দেহ : নানা মাধ্যমে হাসনাত ও তাহমিদের গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও ক্লিপ এবং ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। চলছে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা।

রবিবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক অনির্ধারিত ব্রিফিংয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম এ বিষয়ে কথা বলেছেন গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও ছবি প্রসঙ্গে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রযুক্তির যুগে অনেক কিছুই করা সম্ভব। আমরা বলব, এ ধরনের ছবি যদি কারো কাছে থাকে, তাহলে আমাদের সরবরাহ করুন। তবে আমরা অনেক ছবি পেয়েছি।’

‘যেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ইনভেস্টিগেটিং সংস্থার কারো সঙ্গে কথা বলা ছাড়া এ ধরনের রিপোর্ট প্রকাশ হলে ভুল বোঝাবুঝি দেখা দিতে পারে। এ রকম খবর প্রকাশিত হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা স্বাধীনভাবে যে তদন্ত করছেন, সেই তদন্তকাজে মানসিক চাপ অনুভব করতে পারেন।’

‘এর ফলে তদন্ত বিঘ্নিত হতে পারে। আমি অনুরোধ করব, তদন্ত কর্মকর্তা বা তদন্ত সংস্থার সঙ্গে আলোচনা ছাড়া এ ধরনের কথিত অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ থেকে সবাই বিরত থাকুন।’

আমি আশা করব, যাঁরা এসব কাজ করছেন, তাঁদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।’ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সন্দেহভাজন দুজনকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।

সে ক্ষেত্রে গুলশানের হামলা রিলেটেড কোনো তথ্য যদি তাদের কাছ পাওয়া যায়, যদি প্রতীয়মান হয় যে এ মামলার সঙ্গে তারা জড়িত, তাহলে সে মামলায় গ্রেপ্তার করা হতে পারে।’ ছবিতে যা আছে : হাসনাত করিম ও তাহমিদ হাসিব খানের যেসব ছবি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে তাতে এ দুজনের ব্যাপারে সন্দেহ জোরালো হয়েছে। ভিডিও চিত্রেও রয়েছে তাঁদের সন্দেহজনক গতিবিধি।

‘হলি আর্টিজানের ভেতর, দোতলার বারান্দা, ছাদ, মুক্তি পাওয়া এবং মুক্তির ঠিক পরে একটি বাসায় অবস্থানের স্থিরচিত্র প্রকাশিত হয়েছে গণমাধ্যমে। ছবি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হলি আর্টিজানের দোতলার বারান্দায় হাসনাত ও তাহমিদ কথা বলছেন অস্ত্রধারী জঙ্গি সদস্যের সঙ্গে।

একাধিক ছবিতে তাহমিদের হাতে অস্ত্র দেখা যায়। তাঁর অস্ত্র ধরার ভঙ্গি যথেষ্ট চৌকস। আর হাসনাত করিম রেস্টুরেন্টের ভেতর ও বাইরে জঙ্গিদের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছেন—এমন চিত্র মিলেছে। সেই ছবিগুলোতে হাসনাতকে অনেকটা স্বাভাবিক দেখা গেছে মনে করছেন অনেকে।

সেনা অভিযান শুরুর আগে হাসনাত করিম তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে যান হলি আর্টিজান থেকে। তাহমিদও যান এ সময়। এ ছাড়া কথিত মুক্তি পাওয়ার পর একটি বাড়িতে হাসনাত পরিবারের সদস্যসহ তাহমিদের অবস্থান বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

তাঁরা মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। আগের ভিডিওতে যে তরুণীকে হিজাব পরা অবস্থায় দেখা গেছে, তিনি ওই বাড়ির সোফায় হিজাব খুলে তাহমিদের পাশে বসে আছেন। হিজাবধারী আরেক তরুণীর অবস্থানও তাঁর পাশে।

তামিম-জিয়াকে ধরতে অভিযান : গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার ঘটনায় অস্ত্রের জোগানদাতাসহ অনেককে শনাক্তের দাবি করেছে পুলিশ। হামলায় জড়িতদের পাশাপাশি অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতা, প্রশিক্ষণদাতাসহ অনেকের তথ্য তদন্তকালে জানা গেছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংস্থা ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

রোববার তিনি বলেন, এ মামলার তদন্ত শেষ হয়নি, এমনকি গ্রেপ্তার অভিযানও শেষ হয়নি। কিছু ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা গেলে তদন্তে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। অর্থাৎ তদন্তে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে।

আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পেয়েছি। পুরস্কার ঘোষণার পর জঙ্গিদের মাস্টারমাইন্ড তামিম ও জিয়া সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সে সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে অভিযান চালানো হচ্ছে। ঢাকার বেশ কয়েকটি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে তাদের সন্ধান মেলেনি।

গত ১ জুলাই রাতে গুলশানের ২ নম্বর সেকশনের ৭৯ নম্বর রোডে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালিয়ে ১৭ বিদেশিসহ ২০ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। অভিযান চালাতে গিয়ে প্রাণ হারান পুলিশের দুই কর্মকর্তা।

পরদিন সকালে সেনা কমান্ডো অভিযান চালানো হলে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন। আহত একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যায়। এ ঘটনায় হাসনাত এবং তাঁর পরিবারসহ ৩২ জন ‘জিম্মি’ জীবিত উদ্ধার হয়।

অন্যরা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশ হেফাজত থেকে ছাড়া পেলেও হাসনাত ও তাহমিদকে নিয়ে রহস্য কাটেনি। (সূত্র-কালেরকণ্ঠ)

নিউজ ডেস্ক : আপডেট, বাংলাদেশ সময় ০৫:০০ পিএম, ৮ আগস্ট ২০১৬, সোমবার
ডিএইচ

Leave a Reply