কোটা সংস্কার থেকে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন, যার ঢেউ উঠেছিল চাঁদপুরেও
‘ঢাকাসহ সারাদেশে ছাত্রদের উপর পুলিশ গুলি ছুড়ছে, নিরস্ত্র দূর্বল ছাত্রীদের পেটাচ্ছে হ্যামলেট বাহিনী। টেলিভিশন, স্যোশাল মাধ্যম আর খবরের পাতায় এমন দৃশ্য দেখে আমাদের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। এরই মধ্যে সহপাঠীদের মাধ্যমে জানতে পারি চাঁদপুরে কোটা সংস্কারের সাধরণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করবে। যা পরবর্তীতে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের রূপ নেয়। পরিবারকে মিথ্যে বলে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই একটি বিক্ষোভ মিছিলে আমিও অংশ নিয়েছি। দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এটি আমার দ্বায় হয়ে গিয়েছিল।’
এভাবেই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নেওয়ার স্মৃতিকথা জানান চাঁদপুরের মেধাবী শিক্ষার্থী মো. আরিয়ান। অপর দিকে সহপাঠী এবং শিক্ষকদের কাছে শান্ত-ভদ্র শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সারা দেশের মতো চাঁদপুরেও ছাত্রদের আন্দোলন শুরু থেকেই ছিল অহিংস ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু তৎকালীন সরকারি দলের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নগ্ন হাতে বাধা দেয়। যার ফলশ্রুতিতে ঢাকাসহ অন্যান্য জেলার সাথে চাঁদপুরেও আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে।’
মারজানা (ছদ্মনাম, পারিবারিক কারণে নামটি প্রকাশ্যে অনাগ্রহী) নামে এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের যৌক্তিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে থাকা সরকারি দলের নেতাকর্মীরা সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে- অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে। ২ আগস্ট চাঁদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে ‘রিমেম্বার দ্য হিরোস’ কর্মসূচি ছিল। বিকেল ৩টা থেকে শত শত শিক্ষার্থী শহরের পুরোনো বাসস্ট্যান্ডের ফয়সাল শপিং কমপ্লেক্সের সামনে জড়ো হয়। আমরা সেখানে অবস্থান নিয়ে আমাদের দাবির পক্ষে স্লোগান দিতে থাকি। বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে হঠাৎ করেই ছাত্রলীগ-যুবলীগের একটি গ্রুপ আমাদের উপর হামলা চালায়। তারা আমাদের ১০ থেকে ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রীকে পিটিয়ে আহত করে।’ মারজান অশ্রুসিক্ত হয়ে বলেন- ‘হামলাকারী কিছু ছেলে এত অসভ্য ছিল যে, তারা মেয়েদের গায়েও হাত তুলেছে।’
কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবি নিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল গত ৫ জুলাই। ১৮ জুলাই থেকে সেটি রূপ নেয় বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে। এরপর নানা ঘটনা-অঘটন , হত্যাযজ্ঞ আর রক্ত মাড়িয়ে সরকারের পদত্যাগের চূড়ান্ত এক দফার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়া আন্দোলনটি হয়ে ওঠে গণঅভ্যুত্থান।
এদিকে সরকারি ওয়েবসাইটে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার আন্দোলনে নিহতদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে চাঁদপুর জেলার ২৭ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আহত সংখ্যা কয়েক শতাধিক। তবে বেসরকারি হিসেবে ৩১ জন নিহতের কথাও এসেছে গণমাধ্যমে। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল কর্মজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ। আছে শিক্ষার্থী ও আইনজীবীও। তবে তারা সবাই চাঁদপুরের বাইরে ঢাকা সহ অন্যান্য স্থানে নিহত হন। সরকারি ওয়েবসাইটে তালিকা অনুযায়ী চাঁদপুর সদরে ৮ জন, ফরিদগঞ্জে ৩ জন, হাজীগঞ্জে ৪ জন, মতলব উত্তরে ৬ জন, কচুয়ায় ২জন এবং মতলব দক্ষিণে ৪ জন। তাদের প্রত্যেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় ছাত্র জনতার আন্দোলন চলাকালীন সময় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায়।
তাদেরই একজন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে উপজেলার শহীদ আব্দুল হান্নান। বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় স্বামীকে হারিয়ে হান্নানের বিধবা স্ত্রী মুক্তা এখনো পাগল প্রায়। মুক্তা বলে, ‘আমার স্বামী উত্তর বাড্ডায় একটি বেকারীর লাইনম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৮ জুলাই রাজধানীর মধ্য বাড্ডা এলাকায় তিনি গুলিতে নিহত হন।’ অন্তঃসত্ত্বা মুক্তি বেগম আরও বলেন, ‘আমার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার আগেই গুলিতে বাবাকে হারালো। আমার অনাগত সন্তান কখনোই তার বাবার মুখটা দেখতে পারবে না।’
ঢাকা মিরপুর ১০ নম্বরে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় চাঁদপুর সদর উপজেলার রঘুনাথপুর গ্ৰামের কোরআনের হাফেজ সাজ্জাদ হোসেন সাব্বির। তার বৃদ্ধ দাদা মোঃ দুদু রাজা এখনো আদরের নাতির কথা মনে পড়লে কান্নায় ভেঙে পড়েন । সরকারের প্রতি তার একটাই দাবি, ‘হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। সেই সাথে ‘আদরের নাতিকে শহীদি মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি’ প্রদানের দাবি জানান তিনি।
শহীদ সাব্বিরের বাবা জসিম রাজা বলেন, ‘আমার সন্তান দেশের জন্য এবং মানুষের অধিকারের জন্য শহীদ হয়েছে। এইটা একদিকে যেমন বেদনার, আবার অনেক গর্বেরও। আমার কুরআনের হাফেজ পোলাডারে নির্মমভাবে হত্যা করছে। তার বিচার চাই। আর কোনো মায়ের বুক এভাবে যেন খালি না হয়। আমার সন্তানদের জীবনের বিনিময়ে হইলেও দেশের সব অন্যায়, গুম, খুন, দুর্নীতিমুক্ত হোক।’
চাঁদপুরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখ যোদ্ধা মো. জোবায়ের ইসলাম আসিব বলেন– একটি ন্যায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা রাজপথে নেমে ছিলাম। একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ করার স্বপ্ন নিয়ে আমাদের ভাইরা ও বোনেরা তাদের জীবন উৎসর্গ করেছে নতুন বাংলাদেশ গরায়। তবে ছাত্রদের আন্দোলন কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। যতদিন বাংলাদেশে প্রতিটা নাগরিক তার জীবন এবং জীবিকা নিরাপত্তা না পাবে, ততদিন ছাত্ররা অতন্দ্র প্রহরীর মত সজাগ থাকবে। ‘আমাদের দৃঢ় সংকল্প হলো, আমরা শহীদের রক্তের প্রতিটি অক্ষরকে মনে রাখব এবং আন্দোলনের মূল লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে।’’
সারা দেশের ন্যায় চাঁদপুরেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কেবলমাত্র শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ছাত্র আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে রাজপথে নেমেছিল শিক্ষক, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃৃতিককর্মী, দিনমজুর এবং শ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষ। এর ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছিল অভিভাবক, গৃহিণীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের মধ্যে।
চাঁদপুরের রাজপথে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে তাদের অভিভাবকদেরও দেখা গেছে। তাদেরই একজন চল্লিশঊর্ধ্ব গৃহিণী সালমা খাতুন। তিনি বলেন ‘সন্তানের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই আন্দোলনে গিয়েছিলাম। এক পর্যায়ে নিজের সন্তানসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্লোগানে গলা মিলিয়েছি আমিও। তবে মা হিসেবে আমি মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম। আবার মনে হলো, এ আন্দোলনে যে শিক্ষার্থীদের মৃত্যু হয়েছে তারা তো আমারই মেয়ের বয়সী, আমার সন্তানের মতো। তাই নৈতিকভাবে আমিও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছিলাম। অথচ এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে আমরা অন্যায়-অবিচার আর বৈষম্যহীন সেই প্রত্যাশা বাংলাদেশ আজো পেলাম না।
সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী চাঁদপুর জেলার নিহতরা হলেন, চাঁদপুর সদরে; আব্দুর রহমান দেওয়ান, আবু হোসেন মিজি, মো: ইমরান হোসেন, মনিরুল ইসলাম উব্বু, সাব্বির রাজা, মোঃ রোহান খান ও মোঃ সিয়াম সরদার। ফরিদগঞ্জ উপজেলায়; আব্দুল কাদির মান, আমির হোসেন ও মোঃ সাদ্দাম হোসেন শাহাদাত। হাজীগঞ্জ উপজেলায়; অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ, রাসেল বকাউল, আজাদ সরকার ও আব্দুল হান্নান। মতলব উত্তর উপজেলায়; আলাউদ্দিন, দ্বীন ইসলাম বেপারী, মোহাম্মদ সুজন খান, মোহাম্মদ পারভেজ বেপারী, মোঃ সোহেল ও নাইমা সুলতানা। কচুয়া উপজেলায়; কোবায়েদ ও মোঃ শামসুল আমান।মতলব দক্ষিণ উপজেলায়; মোঃ মিজানুর রহমান, আব্দুর রহমান গাজী, রাব্বি আলম ও সৈকত চন্দ্র দে।
প্রতিবেদক: আশিক বিন রহিম/
৪ আগস্ট ২০২৬