চাঁদপুর হাসান আলী স্কুল মাঠে বিজয় মেলা বিতর্ক তুংঘে

চাঁদপুর জেলাবাসীর প্রাণের উৎসব মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলা । মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা নতুন প্রজন্মের কাছে প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়।

চাঁদপুরে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার স্থান পরিবর্তন এখন শহরবাসীর গণদাবিতে রূপ নিয়েছে।

মেলার কার্যক্রম ও কর্মকান্ড উত্তরোত্তর বৃদ্ধি এবং এতে স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষের ¯্রােত দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় আরো বৃহৎ কোনো মাঠ/প্রাঙ্গণে বিজয় মেলা আয়োজনের দাবি উঠেছে সর্বমহল থেকে।

বিজয় মেলার প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা-কর্মীসহ স্টিয়ারিং কমিটি, উদযাপন পরিষদ ও বিভিন্ন কমিটির গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতৃবৃন্দও এই জনচাহিদার প্রতি ঐক্যমত পোষণ করে আসছেন। পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের এই জোরালো দাবির সাথে ঐক্যমত পোষণ করে মেলা অন্যত্র স্থানান্তরের দাবি তুলেছেন খোদ পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নাছির উদ্দিন আহমেদ। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে মেলা আয়োজন না করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এতকিছুর পরও শুধুমাত্র স্টলের মূল্য বেশি পাওয়া এবং এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত বাড়তি লাভের আশায় চাঁদপুর শহরের হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এবারো বিজয় মেলা আয়োজনের চেষ্টা করা করা হচ্ছে।

জেলা ও পুলিশ প্রশাসন এই স্কুল মাঠে বিজয় মেলা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়ে আসলেও মেলা কমিটির পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রসাশনকে অনুমতি দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় প্রশাসন, সচেতন মহল, সুধীজন, এমনকি অনেক মুক্তিযোদ্ধাও এখানে মেলা না করার ব্যাপারে একমত পোষণ করলে গতবছর এই বিদ্যালয় মাঠে শেষ বারেরমত মেলার অনুমতি নেন বিজয় মেলা কমিটি।

স্থানীয়দের দাবি, এভাবে স্কুল মাঠে মাসজুড়ে বিজয় মেলা করার কারণে আশপাশের ৫টি স্কুল-কলেজের হাজার হাজার শিক্ষার্থীসহ বসবাসকারী লোকজন নানাভাবে মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

আশপাশের বেশ কয়েকটি হাসপাতালে রোগী আনা-নেয়ায়ও সমস্যা হয়। মেলা চলাকালে প্রতিদিন ৭-৮ ঘন্টা শহরে অস্বাভাবিক যানজট লেগে থাকে। রাস্তায় আটকেপড়া ভুক্তভোগী মানুষ তখন সরকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে। আশপাশের বাসা-বাড়ির শত শত ছাত্র-ছাত্রীর পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাছাড়া অতিমাত্রায় দোকান করায় মেলার মাঠে মানুষের চলাফেরায় মারাত্মক সমস্যা হয়। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা মাঠে চলাচল করতে যেয়ে চরম বিব্রত হন। মানুষের এই ঠেলাঠেলিতে সুযোগ সন্ধানী পকেটমাররা দর্শনার্থীদের টাকা ও মালামাল চুরি করে নেয়।

শুধু তাই নয়, দোকানের আধিক্যের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ স্টলও উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় শহরবাসী মেলাটি এই মাঠ থেকে আউটার স্টেডিয়াম, বড়স্টেশন মোলহেড অথবা ডাকাতিয়া নদীর তীরে বৈশাখী মেলার মাঠে স্থানান্তরের দাবি জানান।

চাঁদপুর হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক বলেন, মাঠ আমাদের কিন্তু এটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে প্রতিবছর মেলার করে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা আয় করছে মেলা কমিটি। কিন্তু আমাদের স্কুল একটি টাকাও কখনো পায়না। তাছাড়া আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীরা একমাস খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত থাকে। তাছাড়া শহরের আরো বেশ কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই মাঠটিতে খেলাধুলা করে থাকে। বলতে গেলে শহরের প্রধান উন্মুক্ত খেলার মাঠ এটি।

হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহবুব আলী খান বলেন, আমাদের কাছে এবারও মেলা কমিটির পক্ষ থেকে মাঠে মেলা করার জন্য অনুমতি নিতে লোকজন এসেছিলেন কিন্তু আমি তাদের ফিরিয়ে দেই। কারণ স্কুল মাঠে কোনো মেলা/সার্কাস/বাণিজ্যিক বা বিনোদনমূলক কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে না- এ মর্মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে আমাদের স্কুলে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

জানা যায়, ১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই স্কুল মাঠে মাসব্যাপী মেলার কারণে শহরে প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত টানা সাত-আট ঘন্টা যানজট লেগে থাকে। কারণ মাঠটির তিন পাশে শহরের প্রধান তিনটি সড়ক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সড়ক, লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী সড়ক এবং মরহুম আ. করিম পাটওয়ারী সড়ক অবস্থিত।

মেলায় ব্যাপক লোকজনের সমাগম, মাইকের শব্দ ও লোকজনের শোরগোলের কারণে হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়াও চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ, হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পাঠদান এবং বার্ষিক পরীক্ষা নিতে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয় ও হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা পুরো মাসজুড়ে বন্ধ থাকে।

মাঠটি চারিদিক থেকে টিন দিয়ে ঘিরে রাখায় হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পুরো অন্ধকারে পড়ে থাকে। সমাপনী পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের নিয়ে পড়তে চরম বেকায়দায়। হাজার হাজার অভিভাবককে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক অভিযোগ করেন, মেলার কারণে স্কুলটি জেলখানার মতো বন্দি হয়ে যায়। এতে শিক্ষার্থীরা খেলাধুলা করতে পারে না। শরীরচর্চা করতে পারে না। নানা সমস্যায় পড়ে।

হাসান আলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার আবুল বাশার বলেন, স্কুল মাঠটি হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের। তবে আমার স্কুলে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১ হাজার ৯৬৬জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তারা এটি ব্যবহার করে। তাদের এসেম্বলি হয়। কিন্তু ডিসেম্বর মাসে বিজয় মেলার কারণে এগুলো করা যায় না।

চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজের হোস্টেলে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, মাঠের পাশেই আমাদের হোস্টেল। এখানে প্রায় ২০০ মেয়ে থাকে। মেলা চলাকালে রাতে পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে।

মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ এম এ মতিন মিয়া বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা শিক্ষকরা এবারও বসবো। তারপর প্রশাসনকেও জানাবো। যাতে করে মেলাটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া যায় কিনা।

চাঁদপুর মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রদান শিক্ষক উত্তম কুমার সাহা বলেন, বিজয় মেলা হোক তা আমরা চাই। কিন্তু এই মাঠে না। সেটা অন্যত্র যে কোনো জায়গা হতে পারে। এখানে মাসব্যাপী মেলা করলে লেখাপড়াসহ স্বাভাবিক চলাফেরার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

শহরের অনেক মানুষ বলেন, একটি জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে মাসব্যাপী এমন মেলা আয়োজনের নজির দেশের আর কোথাও আছে কিনা আমাদের জানা নেই। সাধারণত, মূল শহরের কিছুটা দূরে এবং জনচলাচল কম এমন স্থানেই এ ধরনের মেলা হয়ে থাকে।

বিজয় মেলার প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম উদ্যোক্তা, উদযাপন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাড. সেলিম আকবর বলেন, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার নামে এখন মূলত বাণিজ্য মেলাই চলে। এমন মেলা আমরা চাইনি। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। এভাবে মেলার নামে মুক্তিযুদ্ধের সেন্টিম্যান্ট ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধাদের বিতর্কিত করা হচ্ছে। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।

একই ধরনের অভিমত দিয়েছেন বিজয় মেলা উদযাপন পরিষদের সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. জহিরুল ইসলাম, সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা জাতীয় পার্টির শীর্ষনেতা অ্যাড. শেখ আবদুল লতিফ, সাবেক মহাসচিব ও জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সলিম উল্যা সেলিম, সদ্যবিদায়ী মহাসচিব শহীদ পাটওয়ারী। তারা সবাই স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যও। এছাড়া বর্তমান উদযাপন পরিষদ ও বিভিন্ন উপ-পরিষদের অনেক শীর্ষ নেতাই বিজয় শহরের অন্যত্র স্থানান্তরের পক্ষে।

চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পৌর মেয়র নাছির উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি এই মাঠে মেলা করার ব্যাপারে বারবার নিষেধ করে আসছি। ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে অনুমতি না দেওয়ার জন্য বলেছি। এবারও আমি প্রশাসনকে অনুরোধ জানাবো জনদুভোর্গ কমাতে এখানে (হাসান আলী স্কুল মাঠে) মেলার অনুমতি না দেওয়ার জন্য। মেলা অন্যত্র হোক ।

বিজয় মেলার স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি এম এ ওয়াদুদ বলেন, এই স্কুল মাঠটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত। তাই এই মাঠটি আমরা দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ব্যবহার করছি। এবার ব্যবহারের অনুমতি না দিলে আমরা বলবো এ সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলায় এক সময় মুক্তিযুদ্ধর স্মৃতি প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিলো, মেলার মাঠে থাকতো বিশাল আকৃতির স্মৃতি সংরক্ষণ স্টল, কিন্তু বাণিজ্য বাড়াতে মেলার দোকান বেড়েছে স্মুতি সংরক্ষণের স্টল উধাও হয়ে গেছে । মেলার মাঠে চলাচলের পথ শরু করে দোকান করার কারণে মাস ব্যাপী বিজয় মেলায় প্রতিদিনি হাজার হাজার মানুষের ঝট সৃষ্টি হয়, হাটা চলার কোন উপায় থাকে না ।

পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে আমরা এবার এই মাঠে মেলা করার ব্যাপারে এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। তবে মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে স্কুলমাঠ থেকে মেলাটি অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার বিষয়টিও আমরা দেখবো।

জেলা প্রশাসক মো.আব্দুস সবুর মন্ডল বলেন, গতবছর মেলা কমিটি আমার কাছে শেষবারের মতো অনুমতি চেয়ে সেখানে মেলা করেছে। এ বছর এখনো তাদের অনুমতি দেইনি। তবে মেলা কমিটির পক্ষে কয়েকজন এসেছিলেন। পুলিশ সুপার ও স্থানীয় গণ্যমান্যদের সাথে সাথে কথা বলে সিন্ধান্ত নেব।

করেসপন্ডেন্ট
: আপডেট, বাংলাদেশ ১১ : ৫৯ পিএম, ৮ নভেম্বর, ২০১৭ বুধবার
ডিএইচ

Share