Home / বিশেষ সংবাদ / বারোমাসি কাঁঠাল রপ্তানির নতুন দিগন্ত খুলবে
কাঁঠাল

বারোমাসি কাঁঠাল রপ্তানির নতুন দিগন্ত খুলবে

কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয় হলেও আমাদের কাঁঠালের মান ও প্রকৃতির কারণে বিশ্ববাজারে এ কাঁঠালের গুরুত্ব কম। এখন সেই বাধা দূর করে বিশ্বমানের কাঁঠাল উৎপাদনে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

দেশে কৃষি গবেষক ও উদ্ভিদপ্রেমীদের আগ্রহ ও চেষ্টায় দেশে বারোমাসি কাঁঠাল উৎপাদন শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে চাহিদা আছে এমন কাঁঠাল উৎপাদনে উদ্যোগ নিয়েছে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট।

বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। বাংলাদেশে এটি মৌসুমি ফল। তবে সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠা ও দেশি কাঁঠালের আঠা ও গন্ধের কারণে বিশ্ববাজারে দেশি কাঁঠালের চাহিদা একেবারেই নেই। তাই ফলটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব কমে গেছে।

তবে দেশীয় কৃষিবিজ্ঞানীরা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা রোধ করে কাঁঠালের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়াতে কাজ করেছেন। এর ধারাবাহিকতায় বারোমাসি কাঁঠালের তিনটি জাত উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীরা।

ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এ ধরনের কাঁঠাল চাষ সম্প্রসারণের কার্যক্রম। এতে নতুন সম্ভাবনা জেগেছে কাঁঠাল চাষ ঘিরে। বারির বিজ্ঞানীরা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে উচ্চফলনশীল বারোমাসি জাতের কাঁঠাল চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্পের অধীন ও কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় খাগড়াছড়ির রামগড়,নরসিংদী,গাজীপুর ও ময়মনসিংহ জেলায় মাঠপর্যায়ে চলছে এ ধরনের কাঁঠাল চাষ সম্প্রসারণের কাজ। প্রতিটি জেলায় ২৫ জন চাষি ও পাঁচটি নার্সারির মধ্যে বারি উদ্ভাবিত চারা বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া এ ধরনের কাঁঠাল চাষে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

রামগড় চা-বাগানে ভিয়েতনামি সুপার আর্লি কাঁঠালগাছ পর্যবেক্ষণ করছেন বারির হাটহাজারি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলী ফিরোজ (বামে)।

২০১৬ সালে বিশ্বের ফল উৎপাদনের মধ্যমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এফএও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়েছে, অন্যতম পুষ্টিকর ফল কাঁঠালকে বলা হয় মাংসের বিকল্প। সারা বিশ্বে বছরে ৩৭ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। ১৮ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদন করে বিশ্বে প্রথম ভারত।

দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ ১০ লাখ টন। তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড। পুষ্টিমানের দিক থেকে অন্যতম সেরা এই ফলের আমদানির পরিমাণ প্রতি বছরই বৃদ্ধি করছে চীন। তারা মূলত ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে কাঁঠাল আমদানি করে থাকে। জাপান, মালয়েশিয়ার মতো পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো কাঁঠাল আমদানি করছে। কিন্তু এ দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানি করে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে দেশগুলো জান‌িয়েছে, বাংলাদেশের কাঁঠালে আঠা থাকে। আর এখানকার কাঁঠালে বুনো গন্ধ থাকে,যা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ক্রেতারা পছন্দ করে না।

তবে শীতকালীন কাঁঠালে এ ধরনের গন্ধ ও আঠা কম থাকে। সুখের বিষয় হচ্ছে, দেশের পার্বত্য অঞ্চলে ব্যক্তি উদ্যোগে শীতকালীন কাঁঠালের চাষ শুরু হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিজ্ঞানীরা বলছেন,এ জাত থেকে চারা উৎপাদনের জন্য গবেষণাও শুরু করেছেন তারা। একই সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফল চাষ প্রকল্প থাইল্যান্ড থেকে আঠাবিহীন কাঁঠালের চারা আমদানি করেছে। বর্তমানে তা দেশের উপযোগী করার গবেষণা চলছে। আগামী দু-এক বছরের মধ্যে তা কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

কক্সবাজার উপকূলে বাড়ছে সামুদ্রিক শৈবাল চাষকক্সবাজার উপকূলে বাড়ছে সামুদ্রিক শৈবাল চাষ
নাদের খানের হাত ধরে যাত্রা শুরু: বাংলাদেশের আবহাওয়া ও মাটিতে বছরে দুবার ফল দেওয়া বিশেষ জাতের কাঁঠাল চাষের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন উদ্ভিদপ্রেমী ফটিকছড়ির হালদাভ্যালি ও রামগড় চা-বাগানের মালিক নাদের খান। ২০১৯ সালে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা চারা রোপণের পরের বছর থেকেই এসব গাছে কাঁঠাল ধরা শুরু হয়।

রামগড় চা-বাগানের এমডি বাংলো এলাকায় অনাবাদি জায়গায় ২০০টি চারা রোপণ করা হয়েছিল। রোপণের পরের বছরেই মাঝারি আকারের গাছগুলোর কাণ্ড, শাখা, প্রশাখায় কাঁঠাল ধরতে শুরু করে। কাঁঠাল পাকতে না পাকতেই গাছে আবার মুচি আসা শুরু হতে দেখা যায় এসব গাছে। ফলে ১২ মাসই ফল থাকে গাছগুলোতে। ১০-১৫ ফুট উচ্চতার সুপার আর্লি কাঁঠাল গাছগুলোর কাণ্ডের গোড়া থেকে প্রায় শাখা-প্রশাখায় ফল ধরছে। সর্বোচ্চ তিন থেকে সাড়ে তিন কেজি ওজন হয় একেকটা কাঁঠালের।

খুব মিষ্টি, খাজা অর্থাৎ কোয়া অপেক্ষাকৃত শক্ত বা কচকচে স্বাদের এসব কাঁঠাল। গাছে মুচি আসার পর কাঁঠাল পাকতে ১২০-১৫০ দিন সময় লাগছে।

নাদের খান জানান, ২০০ চারা লাগানোর পরবর্তী সময়ে মোট ১ হাজার ৬০০টি সুপার আর্লি কাঁঠালের চারা গাছ আমদানি করেন। রামগড় চা-বাগানে ২০০টি এবং হালদাভ্যালি চা-বাগান ও অন্যান্য স্থানে আরো ১ হাজার ৪০০ গাছ রোপণ করা হয়। কিছু গাছ নষ্ট হয়ে যায়।

তবে, বেশির ভাগই বেঁচে গেছে এবং ফল ধরছে। দেশের মাটিতে ভিনদেশি বারোমাসি কাঁঠালের প্রত্যাশিত ফলন দেখে বেশ উত্সাহবোধ করছেন। তাই নতুন বাগান করার জন্য গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে চারা উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান।

বাগান ঘুরে দেখা গেছে, সারিবদ্ধভাবে লাগানো ১০-১২ ফুট দীর্ঘ গাছগুলোর গোড়ায় মাটিতে থোকায় থোকায় কাঁঠাল ধরে আছে। কাঁঠালের ওজনে গাছ যেন ভেঙে না যায়, সেজন্য বাঁশের খুঁটি গেড়ে গাছগুলো বেঁধে দেওয়া হয়েছে। পানি ও সার দেওয়া হয় নিয়মিত।

স্বপ্ন দেখাচ্ছে নতুন দিনের: বাংলাদেশ কষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) চট্টগ্রামের হাটহাজারি আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (সিএসও) ডক্টর জুলফিকার আলী ফিরোজের নেতৃত্বে কৃষিবিজ্ঞানীর একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি রামগড় চা-বাগানের সুপার আর্লি কাঁঠাল বাগান সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ করেন।

ড. জুলফিকার আলী ফিরোজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘অবিশ্বাস্য! চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতো না যে, ছোট ছোট গাছের কাণ্ড, শাখা, প্রশাখায় এত বেশি কাঁঠাল ধরেছে।

বাংলাদেশে বারি কাঁঠাল-২ ও বারি কাঁঠাল-৩-এর উদ্ভাবক জ্যেষ্ঠ কৃষিবিজ্ঞানী ড. ফিরোজ আরো বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত খাজা, আদারসা ও গালা জাতের কাঁঠাল হয়। তবে উন্নত ফলনশীল জাত হিসেবে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি কাঁঠাল-১, ২ ও বারি কাঁঠাল-৩ জাত উদ্ভাবন করেছে। বারোমাসি কাঁঠালের জাত উদ্ভাবনের জন্য অনেক গবেষণা হলেও পুরোপুরি সফলতা আসেনি।’

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) ফল বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.বাবুল চন্দ্র সরকার বলেন, আমাদের দেশের মাটিতে সুপার আর্লি কাঁঠাল চাষে সফলতা অত্যন্ত খুশির খবর।

বার্তা কক্ষ , ২২ জানুযারি ২০২২
এজি