কচুয়ায় উপ-মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জগন্নাথ দেবের রথ ঐতিহাসিক তীর্থস্থান
চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার সাচার জগন্নাথ ধাম হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি উপ-মহাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় প্রসিদ্ধ তীর্থস্থান। প্রতি বছরের আষাঢ মাসে সাচারের ঐতিহাসিক জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা অনুষ্ঠান শুরু হলেও তিথির কারনে অনেক সময় পিছিয়ে যায়। ১৬ জুলাই (বৃহস্পতিবার) শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের ১৫৯ তম সাচার রথযাত্রা অনুষ্ঠান উপলক্ষে ১ম রথ অনুষ্ঠিত হবে এবং আগামী ২৩ জুলাই-২০২৬ রোজ বৃহস্পতিবার শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের উল্টো রথযাত্রা অনুষ্ঠান ধর্মীয় ভাবগম্ভীর্যের সাথে সম্পন্ন হবে। এ উপলক্ষে সাচার বাজারে বসবে মাস ব্যাপী মেলা।
এ ব্যাপারে সাচার উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক এবং সাচার জগন্নাথ ধাম ও সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি বটু কৃষ্ণ বসু এবং সাধারন সম্পাদক বাসুদেব সাহা, কোষাধ্যক্ষ গনেশ চন্দ্র ধর জানান- শ্রী শ্রী জগন্নাথদেবের ১৫৯ তম সাচার রথযাত্রা অনুষ্ঠান উপলক্ষে সকল প্রস্তুতী সম্পন হয়েছে।
জানাগেছে, কচুয়া উপজেলার ১নং সাচার ইউনিয়নে প্রাচীন কালে বলা হতো বাবুর বাড়ি যা বর্তমানে সাচার বাজারে অবস্থিত শ্রী শ্রী জগন্নাথ ধাম। সাচারের বাবুর বাড়িটি ছিল তৎকালীন জমিদার বাড়ি। পাশে ছিল জমিদারদের রঙমহল ভবন। যা বর্তমানে স্মৃতি স্বরূপ দাড়িয়ে আছে। এ বাড়িতে বাস করতো জমিদার স্বর্গীয় গঙ্গা গোবিন্দ সেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাচার জগন্নাথ ধাম।
তিনি ছিলেন মহা ভাগ্যবান ও ভগবদ ভক্ত মহান ব্যক্তিত্ব। লোভ-লালসা তাঁর জীবনকে পারেনি কখনো গ্রাস করতে। তিনি জগন্নাথ দর্শনের জন্য তৎকালীন সময়ে পায়ে হেটে ভারতের শ্রীক্ষেত্রে যেতেন। বাড়ি থেকে তাঁর প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় ও শুকনো খাবার নিয়ে পদযাত্রা শুরু করতেন জগন্নাথ দর্শনে। পথিমধ্যে যেখানেই রাত হতো সেখানেই মা-মাসি ডেকে রাত্রি যাপন করতো।
রাত্রিকালে শ্রী শ্রী জগন্নাথ- জমিদার গঙ্গা গোবিন্দ সেনকে স্বপ্নাদেশে বলেন ওহে গঙ্গা গোবিন্দ সেন তোমার আর পায়ে হেটে শ্রীক্ষেত্রে যেতে হবে না। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। আমিই তোমার বাড়িতে যাবো। তিনি বুঝে উঠতে না পারলে তাকে স্বপ্নাদেশে আবারো বললেন- “তোর বাড়িতে একটি মন্দির স্থাপন করবি, তোর দিঘীতে ৩ টুকরো নিম গাছ ভেসে আসবে, এ নিমকাঠ জয়ধ্বনি দিয়ে বাড়িতে নিবি, এ কাঠ দিয়ে জগন্নাথ, শুভদ্রা, বলরাম, শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ তৈরী করার জন্য তোর কাছে অভিজ্ঞ সূত্রধর(মেস্ত্রী) আসবে”। স্বপ্নাদেশ মোতাবেক নিমকাঠ অনেক বাঁধা অতিক্রম করে অবশেষে আসলো, বিগ্রহ তৈরী করার জন্য সূত্রধর(মেস্ত্রী) আসলো।
সূত্রধরের আদেশ করেন আগামী ১ সপ্তাহ মন্দিরের দরজা খোলা যাবে না। তারপর গঙ্গা গোবিন্দ সেন মন্দির স্থাপন করলো পরে সূত্রধর বিগ্রহ তৈরীর কাজ শুরু করে দিল। সপ্তাহ শেষ না হতেই মন্দিরের ভিতরে কোন সাড়া-শব্দ না পাওয়ায় জমিদার স্বর্গীয় গঙ্গা গোবিন্দ সেনের ছোট ভাই এসে মন্দিরের দরজা খোলে ফেলায় বিগ্রহগুলোর আর হাতের অঙ্গুলি লাগাতে পারেনি। যা আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। তখন পাড়ার লোকে একটি লোক সঙ্গীত বেঁধেছিল “ জগন্নাথের নষ্ট করলো রে সেনের ভাইয়ে” প্রাচীনকালে এ লোকসঙ্গীতটি লোকের মুখে গাইতে শোভা পেতো। সাচারে জগন্নাথ দেবের রথটি স্বপ্নাদেশ মোতাবেক প্রাপ্ত নিম কাঠ দিয়ে তৈরী দীর্ঘ প্রায় ৪০ ফুট উঁচু রথটির চারপাশে চার যুগের ভবিষ্যৎ বাণী চিত্র সহ খচ্ছিত ছিল। যা ক্রমাগতভাবে বর্তমানে ঘটে আসছে। সেই ঐতিহাসিক রথটি পাক বাহিনীর হাতে ধংস হলেও (মূর্তি) বিগ্রহ গুলো নষ্ট হয়নি। দীর্ঘকাল বাাঁশ দিয়ে রথ নির্মান করে রথ উদযাপন হতো। চাঁদপুর-১ কচুয়া আসনের সংসদ সদস্য ও গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রী আ.ন.ম এহসানুল হক মিলন এমপি উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সাচারের ঐতিহাসিক জগন্নাথ দেবের রথটি মালয়েশিয়া থেকে নিম কাঠ সংগ্রহ করে পূনঃনির্মান করে দেন। এবারের রথ উদযাপন উৎসবেও তিনি সকল ভক্তদের সাথে কুশল বিনিময় করবেন বলে জানা গেছে।
কথিত আছে দ্বাপর যুগে কুরুক্ষেত্রে পান্ডপের যুদ্ধের সময় মহা ভাগ্যবান ও ভগবদ ভক্ত স্বর্গীয় গঙ্গা গোবিন্দ সেন কাশি নামক বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েছিলেন। সেই পূণ্যের ফলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর বাড়িতে টুন্ডা রূপে অবতীর্ন হন। যার রূপ দর্শন করলে পুনজন্ম বারন হয়-সেই জগন্নাথ টুন্ডা রুপে সাচারে স্থাপন হয়। যার কারনে বহু ভাগ্যবান হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভক্তবৃন্দ সাচারে প্রতিবছর আষাঢ় মাসের ২য়া তিথীতে হাজার হাজার ভক্তবৃন্দ জগন্নাথ দর্শনে দেশ-বিদেশ হতে সাচারে আসে। তাঁর ভাগ্য গুনে আজ ভারতের শ্রীক্ষেত্রে জগন্নাথ দর্শনে না গিয়ে ভক্তবৃন্দদের জগন্নাথ দর্শন সাচারেই সম্ভব হচ্ছে। আগেকারদিনে ভক্তবৃন্দরা সেই সুদূর নোয়াখালী, বরিশাল, চাঁদপুর, হাজীগন্জ, দাউদকান্দি থেকে জলপথে হাজার হাজার নৌকাযোগে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে গান-কীর্তন করতে করতে সাচারে আসার জন্য ২/৩দিন পূর্বেই নৌকাযোগে রওয়ানা দিত। বর্তমানে নৌকার চলাচল না থাকায় সকল ভক্তগন সড়ক পথে যানবাহনের মাধ্যমে যোগদান করে থাকে। সাচারের জগন্নাথ দর্শনে দেশের পাশ্ববর্তী দেশগুলো থেকেও ভক্তরা আসতো। আর জনসমুদ্রে ভারি হয়ে উঠতো সাচার বাজার এলাকা। সাচার উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক এবং সাচার জগন্নাথ ধাম ও সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি বটু কৃষ্ণ বসু এবং সাধারন সম্পাদক বাসুদেব সাহা, কোষাধ্যক্ষ গনেশ চন্দ্র ধর এবং রথ উদযাপন উপ-কমিটির আহবায়ক সুকদেব গোস্বামী সহ নেতৃবৃন্দ আমাদের প্রতিনিধিকে জানান- ইতিমধ্যে জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠান কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত শান্তি ও ধর্মীয় ভাবগম্বীর্যের সাথে সম্পন্ন হয়েছে। এবারের রথ উদযাপন উৎসবে সকল প্রকার নিরাপত্তা বিধানে প্রশাসন সহ আইন-সৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট ভূমিকা পালনে সক্রিয়।
সাচারের ঐতিহাসিক রথটি সংরক্ষনের জন্য রথের ঘরটির চারপাশের বেষ্টুনি সহ পুনঃসংস্কার করা একান্ত প্রয়োজন এবং হিন্দুধর্মাবলম্বী ভক্তবৃন্দদের এটা প্রাণের দাবী যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট।
প্রতিবেদক: জিসান আহমেদ নান্নু,
১৫ জুলাই ২০২৬