এখনও যেখানে আমাদের পরিচয় – ‘রূপ ও ফিগারসর্বস্ব’

মারজিয়া প্রভা || আপডেট: ০৮:৩৪ অপরাহ্ন, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫,  সোমবার

ঢাকা শহরের নামকরা মনিপুর স্কুলের ড্রয়িং শিক্ষিকার আত্মহত্যার খবর জেনে খুব বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলাম। একজন শিক্ষক, যে কিনা, ছাত্রছাত্রীদের আশার আলো দেখাবেন, তিনিই কিনা আত্মহত্যার মত পালানোর রাস্তা বেছে নিবেন ? এতটাই জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে এসেছিল কি ? ঠিক কোন কারণে মানুষের জীবনের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণা আসে আমার জানা নেই। কারণ নোংরা জীবন আমারও কম দেখা হয় নি, কিন্তু কখনও আমি থাকব না পৃথিবীতে এই ভাবনা আসে নি। হয়ত আমি অন্যদের চাইতে কিছুটা বেশী স্বার্থপর!

যাই হোক, জুলাই মাসে সুমির মৃত্যুর পর খবর পেয়েছিলাম, স্বামী পরকীয়ায় জড়িত, তাই নিয়ে স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব, অতঃপর হতাশগ্রস্ত হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া। কিন্তু সম্প্রতি জানলাম আরও বিস্তৃত, আত্মহননের মূল কারণ যতটা না স্বামীর পরকীয়া, তারও বেশী সুমির “ গায়ের কালো রঙ” !

৮ বছরের প্রেমের সম্পর্ক, সহপাঠীর সঙ্গে প্রেম, একসাথে দুজনই চারুকলাতে পড়ত, আপাতদৃষ্টিতে এই সম্পর্কটা হতে পারত বন্ধুভাবাপন্ন। স্বামীর চাইতে বন্ধু হতে পারত বেশী! কিন্তু তা তো হয়নি বরং যত বন্ধুত্ব বিয়ের আগে ছিল সবটাই খোলস ছিল, বিয়ের পরে তা বোঝা গেল। ২০১১ সালে বিয়ে হবার পরে সুমির স্বামী সুমন হাবিব এবং তার পরিবার রীতিমত মানসিক অত্যাচার শুরু করেছিল সুমির উপর। দোষ একটাই “ সুমি কেন এত কাল?” কেন সুমি আটা ময়দা মাখা সুন্দরী না ? কেন সুমি রূপের আলো নয়, নিজের প্রতিভার আলোতে উদ্ভাসিত! আর তাই চার চারবার গর্ভপাত করা হল সুমির, যাতে কালো সন্তান না আসে ঘরে, দরকার পড়লে ফর্সা বাচ্চা দত্তক নেওয়া হবে। অত্যধিক এবরশনের ফলাফল, সুমির পুনর্বার কন্সিভ করা ঝুঁকিতে পড়ল ! সুমি আপসেট হয়ে পড়ল। অন্যদিকে সুমি জানতে পারল, টিনটিন নামে কোন ফর্সা সুন্দরীর প্রেমে পড়েছে তার এতদিনের চেনা মানুষটা। বন্ধুর সাথে ফেসবুক চ্যাটের স্ক্রিনশট থেকে আমরা জানতে পারি যে, স্বামী পরকীয়ায় মত্ত, বাসায় ফিরে নি কত রাত!

তদন্ত চলছে চলুক। সুমন হাবিবের যথাযথ বিচার হবে কি না, তা যথাসময়ে আদালত বলে দিবে। কিন্তু আমার চিন্তা অন্যদিকে। সুমন হাবিব চারুকলায় পড়া একজন শিক্ষিত, রুচিসম্পন্ন ব্যক্তি! সে কি আমাদের একাংশ শিক্ষিত জাতির প্রতিনিধি না, যারা আজও একটা মেয়ের প্রতিভার চাইতে মূল্য দিয়ে যায়, মেয়েটা প্রথাগত সুন্দরী কি না? তাকে নিয়ে চললে রাস্তার সবাই বলবে কি না “ আরে বস কি বাগাইলি”? যার জন্য ছেলের পরিবার ধন্য ধন্য হবে এত সুন্দর বউ পেয়েছে বলে ? এখনও কি আমাদের দিন বদলের সমাজ ভাবে না, শিক্ষিত মেয়ের চাইতে যথাযথ রূপ-ফিগারওয়ালা মেয়ে এসেট ?

প্রেম আমার জীবনে এসেছিল, সবার জীবনেই আসে। কিন্তু আমার মত নোংরা কথার মুখোমুখি হয়ত অনেক মেয়েকে হতে হয় না, অনেককে হতে হয়। আমাকে আমার প্রেমিক বলেছিল “ তোমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া আমার কাছে, আমাদের ফ্যামিলির কাছে, বন্ধুদের কাছে কোন মূল্য নেই ! তুমি কতটা সুন্দর, তোমার গায়ের রঙ কি, তোমার ফিগার কেমন, তুমি রান্না পার কিনা, ঘর গোছাতে পার কিনা, সেটাই সবাই দেখবে বিয়ের সময়”। আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না, সত্যি, আজও এই যুগে নারীর পরিচয় আর স্বীকৃতি এতটাই সীমাবদ্ধ !

কিন্তু সুমির ঘটনা আমাকে ধাক্কা দিয়ে অবিশ্বাসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমি ভাবতে বাধ্য হই যতটা নারী উন্নতির প্রোপাগান্ডা ছড়ান হোক, যতই বলা হোক “ আজ আর সেই দিন নেই”, যতই নারী স্বাধীনতার জয়গান গাওয়া হোক , মূল চিত্র সেই পুরাণ কাহিনীই রয়ে গেছে। আজও পুরুষ ভাবে নারীকে ফর্সা, জিরো ফিগারের বারবি ডল ! আজও নারীর স্থান বেডরুম থেকে রান্নাঘর।

অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমু কৃষ্ণবর্ণের একজন প্রতিভাবান ব্যক্তিকে বিয়ে করেছিল বলে অনেকে তাঁকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। সত্য এটাই, সুমাইয়া শিমু যে কাজ করেছেন সেটা প্রশংসার দাবিদার কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু যারা তার সাফাই গাচ্ছিল , ফেনা তুলছিল, তাদের কিন্তু ব্যক্তিজীবনে একজন কৃষ্ণকলিকে বিয়ে করার সাহস নেই। আর করলেও, ফলাফল দাঁড়াত হয়ত সুমির মতই।

রেসিজম আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নারীর প্রতি সেটা আরও কট্টর। আমরা নারীরা শিক্ষিতা হই, কর্পোরেট চাকুরীজীবী হই, বিশ্বখ্যাত হই, বাড়ি ফিরলে আমরা ত্যানা হিসেবেই বিবেচিত হই। তখন প্রতিভা ধুলায় যাক। আমাদের গালে কটা ব্রণ উঠেছে আর কোমরে চর্বি জমেছে কিনা তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে, অথচ হয়ত সেদিনই আমরা কোন বিশ্বজয়ের কাজ করে এসেছি।

এই রেসিজম কিন্তু শুধু পুরুষেরা নয়, নারীরাও করে! সুমির শাশুড়ি এর বাইরে নয়। তিনি সারাদিনই আফসোস করতেন তার ছেলে কেন ফর্সা বউ আনল না! যেখানে ঘরের শত্রু ( পড়ুন স্বজাতি) বিভীষণ, সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া যথেষ্ট কঠিন কাজ।

তবুও মেয়েদের এগিয়ে আসতে হবে, এই কালো- ধলা- জিরো ফিগার-কার্ভি ফিগার তর্ক থেকে। আমরা মেয়েরাই যদি অন্য মেয়ের সমালোচনা থেকে নিজেদের বিরত রাখি, তাহলে এই চক্র ভাঙতে বাধ্য।

আর সবশেষে একটা কথা, নোংরামি থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যার মত পলায়ন বৃত্তি কোন সমাধান নয়। সুমি বেঁচে থাকলে অনেক কিছুই পারত। অন্তত তার বেঁচে থাকাই বড় জবাব হত এই ঘুনেধরা সমাজের কাছে।

লেখক পরিচিতি : মারজিয়া প্রভা, লেখক, প্রকৌশল শিক্ষার্থী।

 

চাঁদপুর টাইমস : এমআরআর/২০১৫

Share