পরিবেশ অধিদপ্তর শব্দদূষণের নতুন চারটি উৎস শনাক্ত করেছে। এসব উৎস থেকে অতিরিক্ত বা অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ সৃষ্টি হলে, তা মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ জরিপে শব্দদূষণের নতুন এই উৎসগুলোকে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো— বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড,বাণিজ্যিক কার্যক্রম,ভিক্ষুক ও হকারদের হ্যান্ড মাইক এবং চিকিৎসকদের চেম্বারের ঘোষণা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ঢাকা মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক ফরিদ আহমেদ বাসস’কে এসব তথ্য জানান।
২০২২-২০২৩ অর্থবছরে দেশের ৬৪ জেলা শহরে ‘শব্দের মাত্রা পরিমাপ’— শীর্ষক জরিপটি পরিচালনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। সম্প্রতি জরিপটির ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
এতে দেশে শব্দদূষণের প্রধান ২৫টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে— যানবাহনের চলাচল, হাইড্রোলিক হর্ন ও সাধারণ হর্ন, যানজট, মাইকিং, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বিভিন্ন দিবস উদযাপন ও ডিজে সাউন্ডবক্সের ব্যবহার, ভিআইপি গাড়ির হর্ন, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের গাড়ির সাইরেন, সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সরকারি ও বেসরকারি অনুষ্ঠান, হুটার, নির্মাণকাজ, বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতি ও শিল্পকারখানার কার্যক্রম।
এ ছাড়া গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, মোটরসাইকেল, যানবাহনের ওভারটেকিং, অতিরিক্ত অটোরিকশা, নসিমন ও করিমন, রেলগাড়ির হর্ন, পর্যটকবাহী যানবাহন ও বাইক, সরু সড়ক, জাহাজ, উড়োজাহাজ, বাস টার্মিনালে অতিরিক্ত যানবাহন, মুঠোফোন, টেলিভিশন ও রেডিওর মতো যোগাযোগের মাধ্যম এবং অবকাঠামো উন্নয়নকাজও শব্দদূষণের উল্লেখযোগ্য উৎস হিসেবে উঠে এসেছে।
জরিপে দেখা গেছে, আবাসিক ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম মিশ্রিত এলাকায় যান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা বেড়েছে।
ঢাকায় যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক গোলচত্বর, শংকর, ধানমন্ডি ও শ্যামলী মোড় এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এ ছাড়া ঢাকার ইংলিশ রোড, নবাবপুর, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান ও শান্তিনগরের মতো বাণিজ্যিক ও যান চলাচলপ্রবণ এলাকায় সার্বক্ষণিক শব্দদূষণ বেড়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, ৬৪ জেলা শহরের মধ্যে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ঢাকার যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক গোলচত্বর এলাকায়। সেখানে শব্দের মাত্রা ছিল ১২৯ দশমিক ৪ ডেসিবেল (ডিবি)।
পরিবেশ অধিদপ্তর বাংলাদেশ সচিবালয় ও এর আশপাশের এলাকা, আগারগাঁও এবং জাতীয় সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশপাশের এলাকাকে নীরব এলাকা (সাইলেন্ট জোন) হিসেবে ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনকে নীরব এলাকা ঘোষণা করে।
যদিও এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর অন্তত চারটি নীরব এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমার অনেক বেশি।
২০২২ সালের মার্চে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সেন্টার ফর অ্যাটমোস্ফেরিক পলিউশন স্টাডিজের (ক্যাপস) একটি দল সচিবালয়, আগারগাঁও, জাতীয় সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশপাশের চারটি নীরব এলাকায় শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে।
সেখানে দেখা গেছে, এলাকাগুলোতে শব্দের গড় মাত্রা ছিল ৯৭ দশমিক ৬৩ ডেসিবেল, যা অনুমোদিত ৫০ ডেসিবেল সীমার প্রায় দ্বিগুণ।
গবেষণায় সচিবালয় এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা পাওয়া যায় ১০০ দশমিক ১৭ ডেসিবেল, সেখানে সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা ছিল ১২৭ ডেসিবেল। জাতীয় সংসদ এলাকায় গড় শব্দের মাত্রা ছিল ৯৯ দশমিক ৩৫ ডেসিবেল। চারটি এলাকার মধ্যে তুলনামূলক কম শব্দের মাত্রা ছিল আগারগাঁওয়ে, যেখানে গড় মাত্রা ছিল ৭৮ দশমিক ১১ ডেসিবেল।
পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত শব্দের অনুমোদিত মাত্রা হলো— নীরব এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫৫ ও রাতে ৪৫ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় (আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প) দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবেল ও শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবেল।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপ চলাকালে সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু সুপারিশ করেন।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে হটলাইন চালু, যাতে এ সেবার মাধ্যমে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে সহজে মামলা করা যায়।
এ ছাড়া সরকারি আইন অনুযায়ী সামাজিক,সাংস্কৃতিক,রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের শব্দের মাত্রা ও শব্দ ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ এবং শব্দদূষণ কমাতে ধীরগতির যানবাহনের চলাচল কমানো ও মহাসড়কের পাশে সার্ভিস রোড নির্মাণের সুপারিশ করা হয়।
অবৈধভাবে হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি ও বাজারজাত বন্ধ, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন চলাচল সীমিত করা,শহরের শিল্পাঞ্চল অন্যত্র সরিয়ে নেয়া,সব ধরনের যানবাহনের জন্য শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা নির্ধারণ,মাইকের ব্যবহার সীমিত করা এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়নেরও সুপারিশ করেন অংশীজনেরা। বাসস
২৯ অক্টোবর ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur