Home / চাঁদপুর / চাঁদপুরের সব ইলিশ পদ্মার নয়
ইলিশ

চাঁদপুরের সব ইলিশ পদ্মার নয়

পদ্মা নদীর ইলিশ স্বাদে পরিপূর্ণ। তাইতো পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা চাঁদপুরের ইলিশের প্রতি আগ্রহ সবার। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে, পাড়া মহল্লায় বিক্রেতারা প্রতিদিন সকাল থেকেই বিক্রি করেন ছোট বড় বিভিন্ন সাইজের ইলিশ। ক্রেতার আগ্রহ বাড়াতে বিক্রেতারা বড় গলায় বলছেন, পদ্মার ইলিশ, আবার কেউ বলছেন চাঁদপুরের ইলিশ।

ক্রেতারা ধরেই নেন, চাঁদপুরের ইলিশ মানেই পদ্মা নদীর ইলিশ। তাই অনেকেই বাজার থেকে পদ্মার বা চাঁদপুরের ইলিশ কিনে স্বাদ না পেয়ে মনক্ষুন্নও হন। আসলে চাঁদপুরের অধিকাংশ ইলিশই পদ্মার নয় বলে জানিয়েছেন জেলেরা।

চাঁদপুর দেশের ইলিশ মাছের বড় বাজার। সেটি গড়ে উঠেছে পদ্মা নদীকে কেন্দ্র করেই। এক সময় পদ্মায় জেলেদের জালে আটকা পড়া ইলিশ মাছ চাঁদপুর বাজারে বিক্রি হলেও এখন আর সেটি প্রায় নেই বললেই চলে। চাঁদপুর ইলিশের মোকামে বিক্রির উদ্দেশে আনা ৯০ শতাংশ ইলিশ মাছই চট্টগ্রামের। যা সমুদ্রে ধরা। প্রতিদিন শত শত ট্রাক চট্টগ্রাম থেকে সাগরে ধরা ইলিশের বহর নামানো হয় চাঁদপুরের বাজারে। চট্টগ্রাম থেকে চাঁদপুর উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, দাম ভালো। পার্শ্ববর্তী পদ্মা নদীর কারণেই রমরমা ইলিশের বড় বাজার গড়ে উঠেছে চাঁদপুরে। এই বাজারেই প্রতিদিন পদ্মার ইলিশ হিসেবেই বিক্রি হয় হাজার হাজার মণ চট্টগ্রামের ইলিশ বা সাগরের ইলিশ।

পদ্মা নদীতে ইলিশের জাল ফেলেন মুন্সিগঞ্জের সিরাজুল ইসলাম। ব্যবসায়ীক কাজে এসেছিলেন রাজধানীর কাওরান বাজারে। সেখানেই কথা হয় এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। মীরকাদিম থেকে ট্রলার যোগে ৮ সহকর্মীকে নিয়ে পদ্মা নদীতে ইলিশ মাছ ধরতে যান ৫৩ বছর বয়সী সিরাজ। ট্রলারে রান্না, ট্রলারেই খাওয়া। দিনরাত নদীর সঙ্গেই বসবাস। জাল ফেলে, জাল তোলা। জালে আটকা পড়া ইলিশ বিক্রিও হয় ট্রলারে। দুইতিন দিন পর পরিবারের সঙ্গে দেখা হয় তাদের।

তিনি জানিয়েছেন, তাদের জালে ধরা পড়া ইলিশ সবই নদীতেই বিক্রি হয়ে যায়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বড় বড় ব্যবসায়ী ও অফিসাররা ট্রলার নিয়ে পদ্মা নদীতেই চলে আসেন ইলিশ কেনার জন্য। তারা দরদাম করে নিয়ে যান। তাদের জালে ধরা পড়া ইলিশ বিক্রির জন্য কোনও দিনই চাঁদপুরের বাজারে নেওয়ার সুযোগ হয়নি। ছোট বড় সব সাইজের ইলিশ নদীতেই বিক্রি হয়ে যায়। সিরাজ জানিয়েছেন, বিভিন্ন জনকে উপহার দিতে বড় বড় সাইজের ইলিশ কিনতে ক্রোতারা চাঁদপুর বাজারে নয়, নদীতেই আসেন। আর বাজার থেকে কেনা ইলিশ তো আর পদ্মার নয়, সাগরের। তাই তো তারা উৎসব করে সশরীরেই পদ্মা বা মেঘনায় চলে আসেন ইলিশ কেনার জন্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চাঁদপুরের ইলিশ ব্যবসায়ী সেকেন্দার আলী জানিয়েছেন, প্রতিদিন চট্টগ্রাম থেকে শত শত ট্রাকভর্তি ইলিশ চাঁদপুরের বাজারে আসে এবং তা বিক্রি হয়ে যায়। পদ্মায় ধরা ইলিশ এই বাজারে আসে, তবে তা পরিমাণে খুবই কম। সাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়া ইলিশ চাঁদপুরের বাজারে পদ্মার ইলিশ নামেই বিক্রি হয়। সাগরের ইলিশ মানেই যে স্বাদহীন- তা সঠিক নয়। বড় সাইজের সাগরের ইলিশও সুস্বাদু—বলেন সেকেন্দার আলী।

কাওরান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী ফিরোজ হাওলাদার জানিয়েছেন, কাওরানবাজার রাজধানীর মাছের বড় পাইকারি বাজার। এ বাজারেও প্রতিদিন শত শত টাক ভর্তি ইলিশ আসে। এর বেশির ভাগই চাঁদপুরের। তবে রাজধানীতে ভোলা, বরিশাল ও বরগুনা থেকে ইলিশ এলেও সেগুলো যাত্রাবাড়ী, সোয়ারিঘাট বাজারে বিক্রি হয়ে যায়। খুব সামান্য পরিমাণে আসে কাওরান বাজার। রাজধানীতে যেখান থেকেই ইলিশ আসুক, সাইজে বড় হলেই তা পদ্মার ইলিশ বলে বিক্রেতারা বিক্রি করেন। ক্রেতারাও লুফে নেন সেটি।

ফিরোজ হাওলাদার জানিয়েছেন, ইলিশের স্বাদ বাড়ে সাইজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। সাইজ ও রঙয়ের পার্থক্য রয়েছে নদী ও সাগরের ইলিশের মধ্যে। সাইজ ঠিক থাকলেও বরফ দেওয়ার পর রঙ বদলে যায়। তাই নদী ও সাগরের ইলিশের মধ্যে যে পার্থক্য তা ক্রেতার পক্ষে বোঝা খুবই কঠিন। সাইজ বড় হলে ইলিশের দাম বাড়ে। বড় সাইজের – বড় দামের ইলিশ সব সময়ই স্বাদের হয়।

রাজধানীতে বসবাসকারী একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান জানিয়েছেন, আমরা তো চাঁদপুরের ইলিশ বলতে পদ্মা নদীর ইলিশকেই বুঝি। চাঁদপুরের বাজারে যে চট্টগ্রামের সাগরে ধরা ইলিশ আসে তাও জানি। কিন্তু কেনও জানি, চাঁদপুরের ইলিশ বলতে কখনোই সাগরের বা চট্টগ্রাম থেকে আসা ইলিশের কথা মনেই পড়ে না। সরল মনের ক্রেতাদের কাছে সাগরের ইলিশকে পদ্মার ইলিশ নামে বিক্রি করাটা এক ধরনের প্রতারণা এবং এটি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

স্টাফ করেসপন্ডেট