আলুর বাজারে ধস-বিপাকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা, পুঁজি হারানোর শঙ্কা
মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের পর আলু উৎপাদনে অন্যতম সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে পরিচিত চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলা। এ উপজেলার মাটি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য বেশ উপযোগী হওয়ায় প্রতিবছরই ব্যাপক পরিমাণ জমিতে আলুর আবাদ করেন কৃষকরা। গত কয়েক বছর আলুর ভালো ফলন ও বাজারে সন্তোষজনক দাম পাওয়ায় এবারও অধিক লাভের আশায় উপজেলার তিনটি হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসে আলুর বাজারে বড় ধরনের দরপতন এবং ক্রেতার অভাবে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। হিমাগারে সংরক্ষিত আলু বিক্রি করতে না পেরে পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কচুয়ার গুলবাহার এলাকায় অবস্থিত দুটি হিমাগারে মোট ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪৩৩ বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে কৃষকরা ৯৯ হাজার ৭৩৮ বস্তা আলু হিমাগার থেকে বের করে নিলেও এখনো প্রায় ৫৯ হাজার ৬৯৫ বস্তা আলু অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অপরদিকে বাতাপুকুরিয়া মনার্ক কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডে চলতি মৌসুমে ২ লাখ ৭৯ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়। বর্তমানে ওই হিমাগারেও প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বস্তা আলু অবিক্রীত অবস্থায় সংরক্ষিত রয়েছে। সব মিলিয়ে উপজেলার তিনটি হিমাগারে এখনো প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৯৫ বস্তা আলু পড়ে রয়েছে। একদিকে আলুর বাজারে ধারাবাহিক দরপতন, অন্যদিকে ক্রেতার সংকট-দুইয়ের চাপে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আলু উৎপাদনকারী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে নতুন মৌসুমে আলু রোপণের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। অথচ আগের মৌসুমের আলুই এখনো হিমাগারে পড়ে থাকায় নতুন করে আলু চাষে বিনিয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাতাপুকুরিয়া মনার্ক কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের এজেন্ট ও স্থানীয় কৃষক মো. নুরু মিয়া, ইব্রাহিম হোসেন, জাহাঙ্গীর পাটোয়ারী, মহসিন পাটোয়ারী, মনির হোসেন ও নবীর হোসেনসহ একাধিক কৃষক জানান, গত বছর আলুর বাজার ভালো থাকায় এবারও ভালো লাভের আশায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন তারা। কিন্তু এবার বাজারের চিত্র সম্পূর্ন ভিন্ন।
আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগার ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় অনেক বেড়েছে। এর ওপর বাজারে আলুর ন্যায্য দাম না থাকায় তারা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তারা বলেন, আলু উৎপাদন, পরিবহন ও হিমাগারে সংরক্ষণ করতে গিয়ে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়েছে, বর্তমান বাজারদরে সেই খরচও উঠছে না। অনেক কৃষক ঋণ ও ধারদেনা করে আলু চাষ করেছেন। এখন আলু বিক্রি করতে না পারলে আগামী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে। স্থানীয় আলু ব্যবসায়ী মোস্তাফা কামাল, আলমগীর হোসেন ও বিল্লাল হোসেনসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, মোকামে আলুর চাহিদা কম থাকায় তারা কাক্সিক্ষত পরিমাণ আলু বিক্রি করতে পারছেন না। প্রতি কেজি আলু ২৬ থেকে ২৭ টাকা দরে কিনে হিমাগারে সংরক্ষণ করলেও বর্তমানে তা ১০ থেকে ১১ টাকা কেজি দরে বিক্রির প্রস্তাব পাচ্ছেন। তাও পর্যাপ্ত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রতি কেজিতে ১৫ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এখন অনেক ব্যবসায়ীর পথে বসার উপক্রম হয়েছে। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, বিভিন্ন খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আলুর চাহিদা কমে যাওয়ায় বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অন্যদিকে মোকামে পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকায় হিমাগার থেকে আলু বের করে বাজারজাত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। সংরক্ষণ খরচ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে বর্তমান বিক্রয়মূল্যে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ছে। এ অবস্থায় কৃষি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলুর চাহিদা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমে আলু রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হলে দেশের বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ কমবে এবং আলুর ন্যায্য মূল্য ফিরে আসতে পারে। পাশাপাশি কৃষকদের উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে কার্যকর সরকারি উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানান তারা।
বাতাপুকুরিয়া মনার্ক কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক কাজী মিজানুর রহমান চাঁদপুর টাইমসকে বলেন, হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা চরম বিপাকে রয়েছেন। হিমাগারের আওতাধীন কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আনুপাতিক হারে ঋণ দেওয়া হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঋণের টাকা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
হিমাগারে এখনো বিপুল পরিমাণ আলু পড়ে রয়েছে। বাজারে চাহিদা ও দাম না বাড়লে কৃষক, ব্যবসায়ী এবং হিমাগার কর্তৃপক্ষ—সব পক্ষকেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন গুলবাহার হিমাগারের ব্যবস্থাপক এস এম শওকত হোসেন। তিনি বলেন, তাদের দুটি হিমাগারেও এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু সংরক্ষিত রয়েছে। নতুন আলু রোপণের মৌসুম শুরু হতে আর বেশি সময় বাকি নেই। এর মধ্যে সংরক্ষিত আলু বিক্রি কিংবা অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না গেলে কৃষকদের পাশাপাশি হিমাগারের মালিকপক্ষকেও বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে। কচুয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. তপু আহমেদ বলেন, গত কয়েক বছর কচুয়ায় আলুর ফলন ভালো হওয়ার পাশাপাশি বাজারদরও সন্তোষজনক ছিল। এ কারণে চলতি মৌসুমে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা অধিক পরিমাণ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছেন। তবে বর্তমানে হিমাগারগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু অবিক্রীত রয়েছে। আলুর বাজারদর বাড়লে কৃষকরা উপকৃত হবেন।
প্রতিবেদক: জিসান আহমেদ নান্নু,
৪ নভেম্বর ২০২৬