Home / ফিচার / শিক্ষকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা : অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত

শিক্ষকতা একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা : অধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার

একজন শিক্ষককেআন্তর্জাতিক শিক্ষা দিবস উপলক্ষে আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী ডা.দীপু মনি বলেন, ‘মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নির্বাচনি ইশতেহারে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য পরিকল্পনামাফিক এগোতে হবে। শিক্ষায় বড় সাফল্য রয়েছে। সেগুলো ধরে রেখে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়াই সরকারের লক্ষ্য।’

তিনি আরো বলেন ‘ গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। পাঠ্যসূচির মানও বাড়াচ্ছি, শিক্ষাক্ষেত্রে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের কাজ।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন,‘এটি কেবল একটি চাকরি নয়,এটি মানুষ গড়ার কাজ। তাই সবার দায়িত্ব ও কর্তব্য স্মরণে রাখতে হবে। ’

অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, ‘কেবল ভালো ফল নয় ; সন্তানদের ভালো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠা প্রত্যাশা করুন ।’

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর সে বক্তব্যের সূত্রেই আমার এ লেখা শুরু করছি। শিক্ষার প্রধান নিয়ামক শক্তি হলো শিক্ষক। শিক্ষক সম্পর্কে পৃথিবীর মনিষীগণ তাঁদের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে মত প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘উত্তম শিক্ষক হবেন উত্তম ছাত্র; শিক্ষকের ছাত্রত্ব গ্রহণে তার মনের তারুণ্য নষ্ট হতে পারে না বরং তিনি সবসময় ছাত্রদের সুবিধা-অসুবিধা ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হবেন।’

। লেখক ড.হেলেন কালডিকট বলেছেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষকরা হলেন সমাজের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ও দরকারি সদস্য, যাঁদের পেশাগত অবদান পৃথিবীর ভাগ্যকে প্রভাবিত করে।’ স্যার জন এডামস বলেছেন, ‘শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর।’

পার্সিভেল রেন বলেছেন,‘শিক্ষক শিশুর বন্ধু, পরিচালক ও যোগ্য উপদেষ্টা এবং চরিত্র গঠনের নিয়ামক।’ নোবেল বিজয়ী শিক্ষা অধিকার কর্মী মালালা ইউসুফজাই বলেছেন, ‘একটি শিশু, একজন শিক্ষক, একটি বই, একটি কলম পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে।’

মোস্তফা কামাল আতার্তুক বলেছেন, ‘একজন শিক্ষক একটি মোমবাতির মতো যিনি নিজের জীবন দিয়ে অন্যের জীবনকে আলোকিত করেন।’ এ পি জে আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘শিক্ষকরাই আলোকিত মানব সমাজ বিনির্মাণ করতে পারেন। তাই, একজন শিক্ষককে হতে হবে সৃজনশীল মনের অধিকারী।’

মানসম্মত শিক্ষার উপাদান হলো মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মানসম্মত শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী। এ পরিসরে আমি মানসম্মত শিক্ষক নিয়ে আলোচনা করবো। শিক্ষার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো শিক্ষক। অন্যভাবে বল্লে বলতে হবে মানসম্মত শিক্ষার মূল উপাদান হলো মানসম্মত শিক্ষক, মানসম্মত শিক্ষা উপকরণ ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ। এই তিনটি উপাদানের মধ্যে শিক্ষকই একমাত্র নিয়ামক যার উপর অন্যান্য উপাদানের তথা শিক্ষার ভাল খারাপ দিক নির্ভর করে।

ভিন্নভাবে বল্লে বলা যায় শিক্ষক হলো আমাদের সমাজের বিবেক। তাই সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা সবার উপরে কিন্তু কালের আবর্তনে শিক্ষকের মর্যাদা আগের মত নেই এটি বলতেই হবে। এর নানাবিধ করাণও রয়েছে।

শিক্ষার মূল চালিকা শক্তি শিক্ষক , সেই চালিকা শক্তিতেই যদি ঘুনে ধরে তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়ায়। তাই শিক্ষকদের মর্যাদাকে সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৯৪ সাল থেকে ৫ অক্টোবর তারিখে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন শুরু করে। শিক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ দিবস উদযাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়।

প্রতিবছর নানা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করার মাধ্যমে এ দিবস উদযাপিত হয়। ২০১৯ সালের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল- “Young Teachers: The future of the Profession” তরুণ শিক্ষক : পেশার ভবিষ্যত গন্তব্য। যা নিয়ে অনেক আলোচনা সভা সেমিনার হয়েছে। সে আলোকে শিক্ষকদের কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় উপস্থাপন করছি।

ত্যাগ স্বীকার
একজন শিক্ষককে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কিছু পাওয়ার আশায় শিক্ষকতা করলে তা আয়-উপার্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু শিক্ষকতার উদ্দেশ্য আয়-উপার্জনের অনেক উর্দ্ধে। একজন শিক্ষককে প্রতিনিয়ত ত্যাগ স্বীকার করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

জ্ঞানের ভান্ডার
একজন শিক্ষককে হতে হয় শিক্ষার্থী সহায়ক। শিক্ষার্থীদের জ্ঞান আহরণের লক্ষ্যে তাঁকে সবসময় সচেষ্ট থাকতে হয়। শিক্ষীর্থীদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করার জন্য্ প্রয়োজনীয় তথ্য ও উপকরণ সরবরাহ করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের অবদানের উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে।

দুরদর্শীতা
শিক্ষককে হতে হয় দূরদর্শী জ্ঞান সম্পন্ন এবং দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গী সম্পন্ন। শিক্ষক তাঁর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে অভিযোজনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করেন। শিক্ষা, উন্নয়ন, অর্থনীতি, রাজনীতি ও প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান বিকাশ সম্পর্কে তাঁকে সম্যক ধারণা রাখতে হয়। সেই জ্ঞান দিয়েই তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদেরকে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণে সক্ষম করে তোলেন।

জ্ঞান অর্জন
একজন শিক্ষককে সবসময় পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হয়। প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন জ্ঞানভান্ডারে নিজেকে সমৃদ্ধ রাখেন একজন ভালো শিক্ষক। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। সেই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চলমান প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধকরণে অবদান রাখেন।

রোল মডেল
শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষক হবেন অনুকরণীয়। চিন্তা-চেতনায়, সহনশীলতায়, আত্মবিশ্বাসে, আন্তরিকতায় ও সহজগম্যতায় একজন শিক্ষককে বহু শিক্ষার্থী জীবনের আদর্শ হিসেবে বেছে নেয়। তাই শিক্ষার্থীদেরকে ভবিষ্যত সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষককে নিজেকে একজন রোল মডেল বা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করতে হয়।

নেতৃত্বগুণ
একজন শিক্ষককে একজন নেতার ভূমিকায় অবতীর্ন হতে হয়। বাস্তব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা পরিসরে একজন শিক্ষককে নেতৃত্ব দিতে হয়। সেই নেতৃত্বের দক্ষতা ও গুণ শিক্ষার্থীরা অর্জন করে শিক্ষকের কাছ থেকে। তাই শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বের ইতিবাচক গুণাবলি অর্জনের পথ তরান্বিত করার জন্য শিক্ষককে প্রগতিশীল মূল্যবোধ সৃষ্টিতে অত্যন্ত পারদর্শী হতে হয়।

বন্ধুত্ব
একজন শিক্ষককে শিখন প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীর সাথে মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করতে হয়। তিনি নিজের সাথে শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষার্থীদের মাঝে ত্রিমাত্রিক মেলবন্ধন রচনা করেন। এই মেলবন্ধনের ফলে শিক্ষার্থীরা কোন সমস্যায় পড়লে সহজেই শিক্ষকের সাথে তা আলোচনা করতে পারে এবং উভয়ে মিলে সমাধানের একটি উত্তম পথ বের করতে সক্ষম হয়।

এসডিজি ৪ অর্জনে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বিকার্য। শিক্ষামন্ত্রী ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ট অর্জনের কথা বলেছেন। এ দুটি অর্জনে শিক্ষক কেবল দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কারিগরই নন, বরং অন্য সকল পেশারও মূল উৎস। মোমবাতি যেমন নিজে পুড়ে ছাই হয়ে অন্যকে আলোকিত করে, তেমনি শিক্ষকরাও নিজের জীবনের সুবর্ণ সময়গুলো বিনিয়োগ করে মানুষকে আলোকিত করেন এবং জাতিকে দক্ষ জনশক্তি উপহার প্রদান করেন।

শিক্ষকের এ কাঙ্ক্ষিত রূপই সমাজ দেখতে চায়। তার বিপরীতে শিক্ষক সমাজেরও একটিই চাওয়া- সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতি ও সম্মান। এ মর্যাদা ও স্বীকৃতি বৃদ্ধি হলে তবেই এ মহান পেশাটি আগামী প্রজন্মের নিকট আকর্ষনীয় হয়ে উঠতে পারে এবং শিক্ষকরাও এতে আত্মনিবেদিনে ব্রতী হতে উৎসাহিত হবেন। আর নিবেদিত শিক্ষকই পারেন প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে যা সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে।

রঅধ্যক্ষ রতন কুমার মজুমদার , পুরাণবাজার ডিগ্রি কলেজ , চাঁদপুর । ৪ জুন ২০২০
এজি

ইন্টারনেট কানেকশন নেই