Home / বিশেষ সংবাদ / ইত্যাদিতে আলোচিত সাইকেল বাদশাহ’র আরো কিছু অজানা তথ্য
Cycle Badsah

ইত্যাদিতে আলোচিত সাইকেল বাদশাহ’র আরো কিছু অজানা তথ্য

সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে মানুষকে ব্যতিক্রমী এক সেবা দিয়ে চলেছেন পাবনার বাদশা আলম। নিজের একটি সাইকেল নিয়ে তিনি ঘুরে ঘুরে গ্রামের মানুষের মাঝে বিনামুল্যে বিতরণ করেন শাক-সবজীর বীজ। শুধু সবজীর বীজ-ই নয়, সমাজ সচেতনতামুলক বিভিন্ন লিফলেটও বিতরণ করেন তিনি।

তার এই কাজে একদিকে গ্রামের দরিদ্র মানুষ হচ্ছে স্বচ্ছল, অন্যদিকে সচেতনতা বাড়ছে সবার মাঝে। নিজ খরচে, বিনা স্বার্থে বাদশা আলম এই কাজ করছেন প্রায় ১০ বছর ধরে। সাইকলে নিয়ে ঘুরে কাজ করেন, তাই নামই হয়ে গেছে ‘সাইকেল বাদশা’।

জেলা সদর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে বেড়া উপজেলার তাঁত সমৃদ্ধ জগন্নাথপুর গ্রাম। এই গ্রামের আব্দুল বাতেন মোল্লা আর মনোয়ারা খাতুনের চতুর্থ সন্তান বাদশা আলম (৩৫)। পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর দারিদ্রের কষাঘাতে আর লেখাপড়া করতে পারেননি।

তাঁত শ্রমিকের কাজ করে চলে তার ৪ সদস্যের সংসার। ভাঙা ঘরে, টানাটানির সংসারে যেখানে নুন আনতে পানতা ফুরোয়, সেখানে নিজ অর্থে, বিনা স্বার্থে গ্রামের মানুষকে ১০ বছর ধরে ব্যতিক্রমী এক সেবা দিচ্ছেন তিনি। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার তাঁত বন্ধ থাকায় একটি আধা ভাঙ্গা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বাদশা আলম। সাইকেলের পিছনে প্লাস্টিকের বোতলে সাজানো থাকে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজির বীজ। ঘুরে বেড়ান গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। তাই গ্রামবাসীর কাছে তার পরিচিতি ‘সাইকেল বাদশা’ নামে।

চলার পথে কোনো বাড়ির পাশে পতিত জমি দেখলেই, বাড়ির মালিকককে ডেকে তাদের সবজী চাষে উদ্বুদ্ধ করেন, একইসাথে বিনামুল্যে লাউ, বেগুন, শাক, শিম সহ বিভিন্ন সবজীর বীজ বিতরণ করেন। শুধু বীজ বিতরণই নয়, কীভাবে বীজ বপণ ও যতœ করতে হয় তাও শিখিয়ে দেন। মাঝে মধ্যে নিজে গিয়ে সেসব বীজ থেকে উৎপাদিত চারার যতœ করেন তিনি। সবজী বীজ বিতরণ ছাড়াও বাল্য বিবাহ, যৌতুক ও মাদক বিরোধী লিফলেট ছাপিয়ে বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করে মানুষকে সচেতন করেন বাদশা আলম।

এ বিষয়ে আলাপকালে বাদশা আলম জানান, ছোটবেলায় দেখতাম, মা বাড়ির পাশে ফেলে রাখা জমিতে বিভিন্ন শাক সবজী লাগাতেন। সবজীর বীজ হলে সেগুলো যতœ করে রাখতেন এবং পাড়া প্রতিবেশী বাড়িতে আসলে তাদের বীজ দিতেন। আমি বলতাম, মা তুমি বীজ অন্য মানুষকে দাও কেন? তখন মা বলতেন, প্রতিবেশীদের বীজ দেয়া ভাল কাজ। এতে আল্লাহ খুশি হন। প্রতিবেশীদের প্রতি মায়ের সেই ভালবাসা দেখে আমি এই কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। আমি মায়ের সেই কথা ধরে রেখে গ্রামের মানুষকে বিনামুল্যে বিভিন্ন শাকসবজীর বীজ বিতরণ করি। বাদশা আলম বলেন, আমি সাইকেল নিয়ে গ্রামে ঘুরি, যে বাড়ির পাশে পতিত জমি দেখি, সেই বাড়ির মালিককে বলি সেখানে সবজি চাষ করার জন্য।

বাদশা আলম বলেন, ‘এর বাইরে যখন বীজ দেয়ার মৌসুম নয়, সেই সময় আমি মাদক, যৌতুক ও বাল্য বিবাহ বিরোধী লিফলেট বিতরণ করি। লিফলেটে শ্লোগান লেখা থাকে, মাদক থেকে দুরে থাকুন, যৌতুক ও বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন, দেশকে ভালবাসুন। আমি মানুষকে উৎসাহ দিতে ও সচেতন করতে এসব লিফলেট বিতরণ করি। আমার এ কাজকে সবাই ভালবাসে এবং করতে উৎসাহ দেয়। আর এসব কাজে আমি কারো সাহায্য নেই না। নিজের খরচে বিতরণ করি।’

বাদশা আলম বলেন, ‘‘আমি মনে করি, একটি ভালকাজ কোনোদিনও হারিয়ে যায় না। ‘একটি করে ভাল কাজ, বদলে যাবে এ দেশের সাজ’। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের ৩২ কোটি হাত যদি দেশের কাজে লাগানো যায়, তাহলে এই দেশ আর গরীব থাকবে না, উন্নত মডেল দেশ হিসেবে রুপ লাভ করবে। আমি যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন এই কাজ করে যাবো।’’

বাদশা আলমের স্ত্রী মিনারা খাতুন বলেন, বিয়ের পর থেকে শুরু হয় তার স্বামীর এই জনকল্যাণমুখী কাজ। প্রথমদিকে স্বামী বাদশার এই কাজকে অসহ্য মনে হলেও, মানুষের জন্য বাদশার ভালবাসাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন স্ত্রী মিনারা খাতুন। বলেন, আমি তাকে বলতাম সংসার চলে না, তুমি টাকা খরচ করে এসব করো কেন। তিনি বলতেন, এই কাজ করতে তার খুব ভাল লাগে। পরে হাট থেকে ৯শ’ টাকা দিয়ে একটি একটি পুরোনো সাইকেল কিনে বীজ বিতরণ শুরু করে। আমিও তাকে সহযোগিতা করি, মানুষ তাকে ভালবাসে।

এ দিকে বাদশা আলমের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে হাসি ফুটেছে গ্রামবাসীর মুখে। এই কাজকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন এলাকাবাসী। স্থানীয় কয়েকজনের সাথে কথা হলে তারা জানান, বাদশা আলম যে কাজ করেন তা খুবই ভাল কাজ। তার এই কাজে সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। সরকারি সহযোগিতা পেলে বাদশা তার সেবামুলক এই কাজ আরো বড় পরিসরে করতে পারবে।

বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাঁত শ্রমিকের কাজ করে নিজের অর্থে মানুষকে সেবা দেয়ার এমন মানুষ খুব একটা দেখা যায় না। বাদশা আলম মানুষকে বীষমুক্ত সবজি চাষে উৎসাহিত করেন। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, যৌতুক, মাদকের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করে যাচ্ছেন। পরোক্ষাভাবে তিনি স্থানীয় সরকারের কাজের ধারাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। আগামীতে তাকে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কিভাবে সহযোগিতা করা যায় সে চেষ্টা করার আশ্বাস দিলেন তিনি।

চ্যানেল ২৪ এর সৌজন্যে ভিডিও দেখুন-

করেসপন্ডেন্ট
: আপডেট, বাংলাদেশ ১০:০৩ পিএম, ০৮ অক্টোবর, ২০১৭ রোববার
ডিএইচ

শেয়ার করুন
x

Check Also

ভারত ও বাংলাদেশ প্রথম!

দক্ষিণ ...