Oops! It appears that you have disabled your Javascript. In order for you to see this page as it is meant to appear, we ask that you please re-enable your Javascript!
Home / বিশেষ সংবাদ / অসহায়ের সহায় গ্রাম আদালত : পাওনা টাকা উদ্ধার
vill.coart
প্রতীকী ছবি

অসহায়ের সহায় গ্রাম আদালত : পাওনা টাকা উদ্ধার

চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলাধীন টামটা-দক্ষিণ ইউনিয়নের দোপল্লা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে বসবাস করেন খুর্শিদা বেগম (৫০)।ঔ গ্রামের সহিদুল্লার সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয় খুর্শিদা বেগম। তার স্বামী দিন-মজুরের কাজ করত। তার এক ছেলে ও দু ’মেয়ে।

আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে তিনি স্বামীর বাড়ি থেকে পিত্রালয়ে চলে আসেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন,‘ তার অজান্তে তার স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করেন। এজন্য তিনি ৩ সন্তানসহ পিত্রালয়ে চলে আসেন। বড় মেয়েকে খুব কষ্ট করে বিয়ে দিয়েছেন। অন্যের বাড়িতে কাজ করতেন এবং বিভিন্ন সময় দিন-মজুরিরও কাজ করতেন। এভাবে কষ্ট করে দ্বিতীয় মেয়েকে বিবাহ দেয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা জমা করেন। ’

তার ছেলেটি হোটেলে কাজ করে। সেখান থেকে সে দৈনিক ৩ শ’ টাকা মুজরি পায়। খুর্শিদা বেগম খুব কষ্ট করে ছোট মেয়েটিকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশুনা করান।

বিরোধের কারণ হিসেবে জানা যায়, ৫০ হাজার টাকা প্রায় আড়াই বছর পূর্বে অত্র ইউনিয়নের ওয়ার্ডের রাজাপুরা গ্রামের মাহবুব আলম (৩২), পিতা- ফজুলল হক-এর নিকট দেন। শর্ত থাকে যে, বছর শেষে ১০ মণ ধান সহ উক্ত টাকা ফেরত দিবেন। কিন্তু দেখতে দেখতে আড়াই বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও ১০ মণ ধান দেয়াতো দূরের কথা উক্ত ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেয়ার কোনো কথাই নেই। বর্তমানে তিনি অসুস্থ।

নিজস্ব কোনো আয় নাই। তার ছেলের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তার ছেলের মাসিক আয় প্রায় ৯ হাজার টাকা। বর্তমানে ছেলে, ছেলের বউ, ছোট মেয়ে ও নিজেসহ ৪ জনের সংসার। মামলা দায়ের এক মাস আগে মাহবুব আলমের নিকট টাকা চাহিতে গেলে সে কোনো কথাই বলেন নি। তার বাড়িতে প্রায় ৩ ঘন্টা বসে থেকে চলে আসেন।

গ্রাম আদালতে মামলা দায়েরের আগে বিচার প্রাপ্তির চেষ্টায় খুর্শিদা বেগম সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বারকে বিষয়টি জানালে তিনি কোনো ধরণের সহযোগিতা করেন নাই। খুর্শিদা বেগম এ টাকার চিন্তায় আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, ‘মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত । আমি টাকা দিয়ে কি সর্বনাশ করলাম। আমি মেয়েকে এখন বিয়ে দেব কীভাবে। এ চিন্তায় তার খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ। অতপর গ্রাম আদালতের কথা শুনে তিনি একটা মামলা করেন। খুর্শিদা বেগমের বাড়ির পার্শ্বে গ্রাম পুলিশ সুকুর আলম ঘটনাটি জানতে পান। তিনি ইউনিয়ন পরিষদে মামলা দায়েরের পরামর্শ দেন। খুর্শিদা বেগম ১০ মে ২০১৮ তারিখে ইউনিয়ন পরিষদে এসে মো. আরিফ হোসেন গ্রাম আদালত সহকারীর নিকট উক্ত ঘটনার বিস্তারিত বলেন এবং মামলা করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০ টাকা ফি দিয়ে একটি দেওয়ানী মামলা দায়ের করেন যার মামলা নং-৯/২০১৮।

গ্রাম আদালত গঠন ও বিচার-প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহিরুল আলম ভূঁইয়া আবেদনকারীর আবেদনটি গ্রহণ করেন এবং ১০ মে ২০১৮ তারিখে প্রতিবাদীর প্রতি সমন জারী করার নির্দেশ দেন। সমন পেয়ে প্রতিবাদী ১৬ মে ২০১৮ তারিখে ইউনিয়ন পরিষদে এসে উপস্থিত হলে তাকে অভিযোগের বিষয়টি জানানো হয় এবং বিধি-৩১ -এর বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়।

প্রতিবাদী তার দোষ স্বীকার করেন নি। উক্ত তারিখে চেয়ারম্যান মহোদয় সদস্য মনোনয়ন ফরম ও নির্দেশনামা বুঝিয়ে দেয়ার জন্য আদালত সহকারীকে বলেন এবং ২৩ মে ২০১৮ তারিখে মনোনীত সদস্যদের নাম দাখিল করার জন্য নির্দেশ দেন। ২৩ মে ২০১৮ তারিখের মধ্যে উভয়পক্ষ সদস্য মনোনয়নের নামগুলো দাখিল নি¤œরূপ করেন ।

আবেদনকারীর পক্ষে : ১। মোসাম্মৎ হাসিনা বেগম, ইউপি সদস্য (১,২,৩), স্বামী- হাবিবুর রহমান, ২। মো. অলি উল্যা (গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি), পিতা- মুসলিম বেপারী।

প্রতিবাদীর পক্ষে : ১। মো. ইমরান হোসেন ইউপি সদস্য (৩), পিতা- মৃত আবুল খায়ের, ২। মো. হোসেন মিয়া (গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি), পিতা- মো. আবুল বাশার।

২৩ মে ২০১৮ তারিখে গ্রাম আদালত গঠন করা হয় এবং মামলার নথি গ্রাম আদালতে প্রেরণ করা হয়। প্রতিবাদীকে লিখিত আপত্তি দাখিলের জন্য ২৭ মে ২০১৮ তারিখ নির্দেশ দেন এবং ১ম শুনানি ৬ জুন ২০১৮ তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

সে মোতাবেক বিচার কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য চেয়ারম্যান মনোনীত সদস্যগণকে অনুরোধপত্র প্রেরণ করার নির্দেশ দেন। স্বাক্ষীর প্রতি সমন জারীর জন্য নির্দেশ প্রদান করেন এবং উভয়পক্ষকে মামলার স্লীপের মাধ্যমে বিচার কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য আদেশ প্রদান করেন।

মামলার শুনানী ও নিস্পত্তিতে ৬ জুন ২০১৮ তারিখে বিচারকম-লি মামলার শুনানীতে বসেন এবং বিচার্য-বিষয় নির্ধারণ করেন। সে মোতাবেক আবেদনকারীর বক্তব্য প্রতিবাদীর বক্তব্য ও স্বাক্ষীর বক্তব্য শুনার পর তাদের জবানবন্ধী লিপিবদ্ধ করা হয়।

চেয়ারম্যান মহোদয় প্রাক-বিচারের উদ্যোগ নিলে প্রতিবাদী আপোষ মিমাংসার প্রস্তাব দেন। তখন উভয় পক্ষের মধ্যে আপোষনামা সম্পাদনের নির্দেশ দেন। প্রতিবাদী ৬ জুন ২০১৮ তারিখে সকলের উপস্থিতিতে ২০ হাজার টাকা অত্র ইউনিয়ন পরিষদে জমা প্রদান করেন। বাকি ৩০ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য প্রতিবাদী ৩ মাসের সময় চান। সে হিসেবে উক্ত ৩০ হাজার টাকা ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখে প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক যথা সময়ে উক্ত টাকা ইউনিয়ন পরিষদে এসে পরিশোধ করেন।

দাবিকৃত ৫০ হাজার টাকা ফেরত পেয়ে খুর্শিদা বেগম খুশি হয়ে বলেন , ‘ চেয়ারম্যান ভালো মানুষ । চেয়ারম্যান বাবা আমার টাকাটা নিয়ে দিছে। তার ভালো হউক। এ রকম সমস্যা অন্য কারো হলে আমি তাদের গ্রাম আদালতে আসতে বলুম। আমার যাতায়াতসহ ২ শ’ ৫০ টাকা খরচ হয়েছে। আর কোথাও কোনো টাকা দেয়া লাগে নাই। খুব তাড়াতাড়ি বিচার পাইছি আমি।’

বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় উক্ত টাকা পেয়ে আশা ছিল তার মেয়েকে বিয়ে দিবে। কিন্তু খুর্শিদা বেগমের শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সেখানে প্রায় ২০ হাজার টাকার মত খরচ হয়ে গেছে। বাকি টাকাগুলো দিয়ে তিনি এখন বড় মেয়েকে বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

তথ্যসূত্র :মো. আরিফ হোসেন, গ্রাম- আদালত সহকারী, টামটা-দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ, শাহরাস্তি, চাঁদপুর।
মোহাম্মদ জহিরুল আলম ভূইয়া, চেয়ারম্যান, টামটা-দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদ, শাহরাস্তি।

সম্পাদনায় : আবদুল গনি
১১ অক্টোবর , ২০১৮ বৃহস্পতিবার

Leave a Reply