Home / জবস / চাকরির সন্ধানে শিক্ষিত তরুণদের হাহাকার

চাকরির সন্ধানে শিক্ষিত তরুণদের হাহাকার

একদিকে অর্থনৈতিক উন্নতি। মেগা প্রজেক্ট। বাড়ছে শিক্ষিতের হার। অন্যদিকে, বাড়ছে শিক্ষিত তরুণদের হাহাকার। প্রত্যাশিত চাকরি পাওয়া যেন রীতিমতো যুদ্ধ।

বাংলাদেশের কর্মক্ষম ও শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কত তা নিয়ে অবশ্য বেশ গরমিল লক্ষ্য করা গেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি হিসাব এক রকম, অন্যদিকে আইএলও, জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব আরেক রকম।

এর মধ্যে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ ২০১৫ অনুযায়ী, দেশে কর্মক্ষম ২৬ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বেকার। এর মধ্যে পুরুষ ১৪ লাখ, নারী ১২ লাখ ৩০ হাজার। যা মোট শ্রমশক্তির ৪.৫ শতাংশ। আর সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে ১৫ লাখ তরুণ-তরুণী এখন বেকার অবস্থায় রয়েছেন।

অন্যদিকে ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) প্রতিবেদন মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য মতে, দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ১ কোটি ৩২ লাখ। বাংলাদেশে এখন ১০ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ কর্মক্ষম, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৬৬ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার ৪.৩৩ শতাংশ। দেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। সংস্থাটির মতে, বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান ১২তম।

এদিকে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এক প্রশ্নের জবাবে শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু জানিয়েছেন, দেশে মোট বেকারের সংখ্যা সংক্রান্ত কোনো তথ্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে নেই। তবে ২০১৩ সালে বিবিএসের জরিপে দেশে মোট বেকারসংখ্যা ২৬ লাখ বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিক্ষিতদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারার পেছনে প্রথম ব্যর্থতা হলো আমাদের কোনো হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্ট নেই। শূন্য পদ পূরণে নীতিমালা নেই। শূন্য পদ পূরণ হলেও ঠিকমতো হয় না; সময়মতোও হয় না। তাদের মতে, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে উদ্যোগ নিতে হবে।

জানা গেছে, বেসরকারি খাত দেশের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের জোগানদাতা। কিন্তু দেশে কর্মক্ষম শিক্ষিত জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে হারে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে না। দেশে যত বেকার আছে, এদের মাঝে প্রতি ৪ জনের ৩ জনই বয়সে তরুণ। দেশের এক-চতুর্থাংশ মানুষের বয়স এখন ১৫ থেকে ২৯ বছর।

এমন বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ১৭ লাখ। এদের অর্ধেকই পড়াশোনা করছেন। বাকি তরুণেরা শ্রমবাজারে এসে চাকরি করছেন। পড়াশোনার সুযোগ না পেয়ে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী লোকদের মধ্যে বেকার মাত্র দেড় লাখ। প্রতি বছর গড়ে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে চাকরির খোঁজে। এর মধ্যে সাড়ে ৫ লাখ উচ্চশিক্ষিত। অন্যান্য পরিসংখ্যান বলে, দেশে চাকরির বাজারে শিক্ষিতরাই রয়েছেন বেশি বেকায়দায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৫ অনুযায়ী, গেল দুই বছরে মাত্র ৬ লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৩ লাখ মানুষ চাকরি বা কাজ পেয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, উচ্চমাধ্যমিক পাস তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি, ১১.৭৫ শতাংশ। উচ্চমাধ্যমিক পাস করাদের মধ্যে ৭ লাখ ১৬ হাজার বেকার। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে ৫.৭০ শতাংশ বেকার। অন্যদিকে অশিক্ষিতদের বেকারত্বের হার সবচেয়ে কম, ২.১৪ শতাংশ। তাদের সংখ্যা ৪ লাখ ১৩ হাজার। বিবিএসের হিসাবে দেশে প্রতিবছর ২৭ লাখ কর্মক্ষম মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ পাচ্ছে মাত্র ১ লাখ ৮৯ হাজার মানুষ।

শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন ২৬ লাখ ৩১ হাজার বেকার রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ১৪ লাখ, নারী ১২ লাখ ৩০ হাজার। যা মোট শ্রমশক্তির ৪.৫ শতাংশ। তিন বছর আগে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৯০ হাজার। এক দশক আগে ছিল ২০ লাখ। বেকারদের মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ কিংবা ৮ লাখ ১০ হাজারই হলেন উচ্চমাধ্যমিক কিংবা স্নাতক ডিগ্রিধারী। বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৪ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে থেকে ২৯ বছর।

তাদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা শেষ করেও প্রায় ৭৮ হাজার তরুণ-তরুণী কাজ বা চাকরি পাচ্ছেন না। বর্তমানে শ্রমশক্তির আকার ৬ কোটি ১৪ লাখ। এর মধ্যে ৫ কোটি ৮৭ লাখ কাজ করেন। এ বিশাল কর্মরত শ্রমশক্তির মধ্যে ৩২ শতাংশ বা ১ কোটি ৯০ লাখ লোকের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই।

বিবিএসের জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শ্রমবাজারে আছে ৬ কোটি ১৪ লাখ জন। তাদের সবার বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছর। এ বিশাল শ্রমবাজারে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী ২ কোটি ৩ লাখ ৮৬ হাজার তরুণ-তরুণী আছেন। শ্রমবাজারের এক-তৃতীয়াংশই তরুণ। তাদের মধ্যে চাকরি বা কাজ করছেন ১ কোটি ৮৪ লাখ ৪৭ হাজার।

জানা গেছে, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ১ কোটি ২৯ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন মাসে এ কর্মসংস্থান হবে। পরিকল্পনায় আরও বলা হয়েছে, এ সময়ে ৯৯ লাখ তরুণ-তরুণী শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। তাই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে ওই পরিকল্পনায়।

জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন সূচক সংক্রান্ত চলতি বছরের এপ্রিলে জনমিতির পরিবর্তন নিয়ে করা ইউএনডিপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এখন ১০ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ কর্মক্ষম, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৬৬ শতাংশ।

তাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছর পর্যন্ত। সংস্থাটির মতে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী ২০৩০ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা গিয়ে পৌঁছাবে ১২ কোটি ৯৮ লাখে, যা হবে তখনকার মোট জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ। তথ্য মতে, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সালে ১৫-২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ। কিন্তু ২০০৫ থেকে ১০ সালের মধ্যে তা প্রায় পাঁচগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ৩২ লাখে। এখন এটি আরও কয়েকগুণ বেড়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৪.২ শতাংশ। এর ওপর প্রতি বছর নতুন করে ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে যোগ হচ্ছে। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের হার ২ শতাংশ বাড়ানো গেলে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত হবে।

অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান ‘বিডিজবস’ সূত্র মতে, প্রতিদিন এই ওয়েবসাইটে ১ লাখ ২০ হাজার একক গ্রাহক (একজন একাধিকবার ব্রাউজ করলেও একজন হিসাবে) চাকরি খোঁজে। সাইটটিতে রেজিস্ট্রেশন করে জীবনবৃত্তান্ত রেখে দিয়েছে ১১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি শিক্ষিত বেকার। এদের মধ্যে ৭০-৮০ শতাংশই একেবারে নতুন, অনার্স-মাস্টার্স শেষ করা, যারা প্রথমবারের মতো চাকরি খুঁজছেন। বাকি ২০-৩০ শতাংশ চাকরিজীবী রয়েছেন।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারি খাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে ২ লাখ ৬৬ হাজার ২৭৫ জন। এর মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৫০ হাজার ৪৭৩ জন, ২০১৩-১৪-তে ৫৯ হাজার ১৩২ জন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৯ হাজার ৭৫২ জন, ২০১১-১২-তে ৫১ হাজার ০১৩ জন এবং ২০১০-১১ অর্থবছরে ৭৫ হাজার ৯০৫ জন। এই পাঁচ অর্থবছরে সরকারি চাকরিতে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ৬০ হাজার ২৯২ জন। তাদের সবাই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা। কর্মচারী পদে নিয়োগ পেয়েছেন ২ লাখ ৫ হাজার ৯৮৩ জন। এদের প্রায় অর্ধেক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করা। বাকিরা অষ্টম শ্রেণী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা। এখনো সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় ২ লাখের বেশি পদ শূন্য রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ইউজিসির সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০১৩) বলা হয়, ২০১৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ লাখ ১২ হাজার ৯০৪ জন শিক্ষার্থী স্নাতক শেষ করেছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করেছেন ৫৪ হাজার ১৬০ জন। সেই হিসাবে এক বছরে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ স্নাতক বের হচ্ছেন।

বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট-এর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকই বেকার।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের (আইএলও) ‘বিশ্ব কর্মসংস্থান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার ৪.৩৩ শতাংশ। বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। প্রতিষ্ঠানটির ধারণা এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে তা দ্বিগুণ হয়ে ৬ কোটিতে দাঁড়াবে, যা মোট জনসংখ্যার ৩৯.৪০ শতাংশ হবে। সংস্থাটির মতে, বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান ১২তম।

২০১০ সালে ‘সমুন্নয়’ নামে একটি বেসরকারি সংস্থা হিসাব দিয়েছিল, দেশে কর্মক্ষম নারীর সংখ্যা ১০ লাখ। এ সংখ্যা ৬ বছরে নিশ্চয়ই আরো বেড়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে বছরে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এদের মধ্যে কাজ পায় মাত্র ৭ লাখ। এর মধ্যে শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় মাধ্যম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে শতকরা ৯৫ ভাগ কর্মসংস্থান করে। এর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান করছে পোশাকশিল্প। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ লোক কাজ করছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার অবদান মাত্র ৫ শতাংশ।

এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমদ বলেন, বেসরকারি খাতে শ্রমিক ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের দরকার হয় ৭০ শতাংশ। কিন্তু দেশে উচ্চশিক্ষিতদের ৯০ শতাংশই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, যার সঙ্গে শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার সম্পর্ক থাকে না। বেকার বাড়ার এটাও একটা অন্যতম কারণ। (মানবজমিন)

নিউজ ডেস্ক ।। আপডটে, বাংলাদশে সময় ০৯ : ০০ এএম, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৬ সোমবার
এইউ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

চাঁদপুর সফরমালী ব্রীজে গর্ত : ঝুঁকিপূর্ণ যান চলাচল

চাঁদপুর ...