জাতির পিতার জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ার পথে

যাবো! টুঙ্গিপাড়ায়! যেখানে আছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মুজিবর! আমি জীবন্ত সেই কিংবদন্তী রাজনীতির মহানায়ককে জীবন্ত দেখিনি! কিন্তু যে মুজিব লুকান্তরে অথচ লাখো কোটি মুজিব ঘরে ঘরে – তার সেই স্পর্শ খোঁজে পাবো তার শয়ন আঙিনায় পদধূলি দিলে।

মুজিবের বাড়িতে যাবো- এমন নিমন্ত্রণ নিয়ে এগিয়ে এলেন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি শহীদ পাটোয়ারী তথা আমাদের প্রিয় শহীদ ভাই।প্রথম বিশ্বাস করতে পারলাম না। মনে করলাম, একটা বুঝ দিয়ে বোধহয় এ বছরটাও পার করবেন! না তার কোন অস্তিত্ব খোঁজে পেলান না যখন ওনার এবং সাধারণ সম্পাদক বন্ধুবর লক্ষনের চিঠিটা পেলাম যে, ২৫ আগষ্ট যাচ্ছি! তো আমার যাওয়া নিশ্চিত করার জন্য স্বাক্ষরসহ মতামত চাওয়া চিঠি। কী বলে? যাবো না মানে? আবার জিগায়!

২৫ আগষ্ট রোববার ভোর ৫ টা। যাত্রা শুরুর জায়গা। বাহন তিনটি হাইস। কি বলে এতো সকালে? ২৩ আগষ্ট ফোন দিয়ে জানতে চাইলাম এতো ভোরে কেন? সম্পাদকের সাফ কথা- আমি জানিনা! কথা বলো শহীদ ভাইয়ের সাথে। ফোন দিলাম। বল্লো হ টাইম ঐটাই! লড়চড় নাই। রেডি হইয়া চইলা আইসো বাস্! আর কোন বয়ান নেই। মনে হলো হেডস্যারের সাথে কথা শেষ করলাম।

পরদিন ২৪ আগষ্ট শহীদ ভাইয়ের ফোন! এই তুই কী যাবি না? কেন ভাই? স্বাক্ষর করলা নোটিশে টিক তো দিলা না? আরে বাবা ভুল হইছে, দেখি নাই ভাই। কথা শেষ না করতেই সময় মতো আইসা পরবা হাসান আলী স্কুল মাঠে। আর কোন কথা বলার নেই চান্চ।

২৫ আগষ্ট ভোর। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। মোবাইলের রিং টোন জানান দিলো সাড় ৪ টা। উঠে বসলাম। মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে। কারণ সবমিলিয়ে ঘুম গেছি বোধহয় ঘন্টা তিনেক। না বউ বল্লো – উঠে দাঁড়াও, এখনি শহীদ ভাই ফোন করলো বলে! যাক আস্তে আস্তে করে বাথরুম পর্যন্ত প্ৌঁছলাম। ফ্রেস হলাম।

এরইমধ্যে বউ এনে দিলো গরম চা। প্যান্ট পড়ার পর পান্জাবি পড়বো। পান্জাবি ৭/৮ এর মধ্যে একদম কালো পান্জাবিটাই চোখের সামনে! পড়লাম। ১৫ মিনিটের মধ্যে সাজগোজ সেরে গেটে যখন এলাম তখনও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি। হঠাৎ মনে হলো আমার বার্তা সম্পাদক ও দীপ্ত টিভির সাংবাদিক ইব্রাহীমকে ফোন করা দরকার। দিলাম কিন্তু ফোনটা ধরা হচ্ছে না। ভাবলাম, হয়তো এখনো ঘুমে। আবার করবো পরে।

রিক্সার দেখা নেই।
না, হেটেই যেতে হবে স্কুল মাঠে। হাটতে হাটতে নিজের কাছে প্রশ্ন জাগছিলো- টুঙ্গিপাড়ায় যাচ্ছি তো? যেতে পারবো তো? বৃষ্টি আরো জোরে যদি আসে তাহলে বোধহয় যাওয়া বাতিল! আহ! এবছরের ভরসাও বোধহয় গুড়ে বালি। ভোরের সূর্যটা তখনো উঁকি দেয়নি।

মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। হঠাৎ কেন জানি মনে পড়ে গেলো সেই ১৫ আগষ্ট এমনি ভয়ালো রাতটির কথা! গা শিহরে উঠছে। না, আমি এসব কী ভাবছি। ৪৪ বছর আগে এই আজানের ধ্বনির সাথে সাথে জাতির পিতাকে হত্যা করছে!তো কেউ এগিয়ে এলো না। ঘাতকরা মারলো ৩২ নাম্বারের সবাইকে! দূর! আমি এসব কী ভাবছি ঐ অলক্ষনীয় সময় নিয়ে? আমার ভাবনাগুলো শেষ না হতেই পাশে এসে দাঁড়ালো কালো একটা গাড়ি।

আরে বাবা! এইটার মধ্যে কেরে? কোন ঘাতক! আমায় টুঙ্গিপাড়ায় যেতে বাঁধা দিতে এসেছে? অন্ধকার কাটে না বলেই কাউকে দেখছি না। গাড়িটার সামনের গ্লাসটা খুলতেতে আবছা আলোয় দেখলাম শহীদ ভাই হেসে হেসে বলছে – উঠ পিছনে! অবশেষে ঘুম থেইকা উঠতে পারলি? দুজনেই হাসলাম। মাত্র ২ শ গজ যেতেই গন্তব্যে পৌঁছলাম।

ছবিতে লেখক : ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী

ওমা! ঘড়ির কাঁটায় ৫ টা। অথচ আমি আর শহীদ ভাই! একচোট নিলাম শহীদ ভাইকে। বল্লেন- চুপ কইরা দেখো, অল্প সময়ের মধ্যেই সবাই চইলা আইবো। বল্লাম- আসলে কী টুঙ্গিপাড়ায় যাইতাছি? বল্লো – কী কয় পাগলে!

অবশেষে একেক করে সবাই আসতে শরু করেছে। ততোক্ষনে অবশ্য ৫ টা ৪০ সময় গড়ালো। তিনটে গাড়ি ছাড়লো হরিনা ফেরিঘাটের উদ্দেশ্যে। ৩৫/৪০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম হরিনা ফেরিঘাটে। আমরা ২৮ সংবাদকর্মীর অপেক্ষায় ছিলো ফেরি কস্তুরি। গাড়ি তোলা হলো ফেরিতে। আমরা ফেরিঘাটে হালকা কিছু খেয়ে নিলাম।
অবশেষে কস্তুরি ভেসে চল্লো।

যাচ্ছি তাহলে!? অবশ্যই টুঙ্গিপাড়ায়। ফেরিতে বেশ ভালো ব্যবস্থা আমাদের জন্যে। অবশ্য এটি ভিআইপি বলে নয়, সারা বছরের ফেরি ঘাটের দুখের দিনের বন্ধু হিসাবে। কারণ ফেরি অচল হলেই কিংবা কোন সমস্যা হলেই যে মানুষগুলোকে ফেরি কর্তৃপক্ষ কাছে পায় – সেই সুবাদে যদি একটু তারা আমাদের জন্য করতে পারে তাহলে তারা ধন্য। বেশ গল্পে গপ্পে আর মুজিবের অপরূপ বাংলার মুখ দেখে পদ্মা মেঘনা পাড়ি দিয়ে নামলাম শরীয়তপুর অংশের নরসিংহপুর ফেরিঘাট অংশে।

নরসিংহপুর ফেরি ঘাট। সকাল ৮/ ৯ টাতেই বেশ হইচই। ফেরি থেকে গাড়িগুলো নামতে শুরু করেছে। আমার পেছনের সীটে বসা এনটিভির হাবিব ভাই বল্লেন- পাটোয়ারী সাব! শক্ত হইয়া বসেন।অহন দেখবেন কতো যে চিৎ আর কাৎ হইতাছেন। আমি তার কথার কিছুটা মর্মার্থ বুঝতে পারলাম। কারণ আমায় ফেরিতেই ইঙ্গিত দিয়েছে সাংবাদিক কানন, অনিক তালহা তারা যে, শরীয়তপুরের ২০/২৫ কিলো রাস্তা খুবই খারাপ!

বিশেষ করে ভেদেরগন্জ উপজেলা শহর পর্যন্ত। এই জেলারই সন্তান ইলশেপাড় এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান সুমনও বলেছিলো ক্ষানিকটা। পাশে বসা সময় টিভির ফারুক ভাই আর চিমকা শয়তান আমার প্রিয় চ্যানেল- ২৪ এর শোভনটাও নানা আতংক ছড়াচ্ছিলো সড়ক নিয়ে।

সামনের সীটে বসা কাজী শাহাদাৎ ভাই গম্ভীর হয়ে বল্লেন- আরে একটু কষ্টতো হবেই। হঠাৎ গাড়ির জানলায় মুখ রেখে ফেরির এক কর্মচারী এসে বলছিলো- স্যার আপনাদের কারা জানি ফেরিতে ৪/৫ টুকরা গরম ইলিশ খেয়ে টাকা পরিশোধ না করে চলে এসেছে। কি বলেরে ভাই লোকটা? সবার মুখে হাসি চলে এলো। শোভন বল্লো- আপনি সভাপতির সাথে যোগাযোগ করেন, আমাদের এখানে যারা খেয়েছে তারা কেউই এমন না। পরে দেখলাম লোকটা পেছনের দিকে শহীদ ভাইয়ের সাথে কথা বল্লো এবং চলে গেলো। বোধকরি লোকটাই ভুল করেছে।

আমাদের গাড়িগুলো ফেরি থেকে একেক করে তীরে উঠলো এবং চলা শুরু। ৫০ গজ যেতেই শুরু হলো ঝাঁকুনি।! আহ! একদম পেছনের সীটে বসা ডিভিসি টিভির তালহা আর সুদীপ্ত চাঁদপুরের বাবু বলছে- শরীরের সব যেন এক হইয়া যাইতাছে ভাই অহনি! আর তো! যাক ঝাঁকুনির মধ্যেই নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তা চলছে। রাশভারি মানুষ শাহাদাত ভাইও কথায় যোগ দিলেন।

হেলে দুলে গাড়ি এগুচ্ছে। যে গতিতে চলার তা চলতে মোটেও পারছে না! অথচ বেলা বাড়তে শুরু করেছে। যদিও ঘড়ির কাটা ১০ টার নীচে। এখন বুঝতে পারছি, শহীদ এতো প্রত্যুষে কেন রওয়ানা দিতে বলছিলেন। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি এসপি সাহেবের ফোন। হঠাৎ ওনার ফোন!? বুঝতে পারছি না। এতো সকালে তো কোনদিন ফোন দেননি তিনি তার ১ বছর সময়ে! আজ কি তাহলে কোন বিপদ হলো না কি শহরে?

মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি এসপি সাহেবের ফোন। হঠাৎ ওনার ফোন!? বুঝতে পারছি না। এতো সকালে তো কোনদিন ফোন দেননি তিনি তার ১ বছর সময়ে! আজ কি তাহলে কোন বিপদ হলো না কি শহরে?

ফারুক ভাই বল্লেন ফোন ধরেন। রিসিভ করে সালাম বিনিময়ের মধ্যেই বল্লেন- আপনারা কোথায়? আরে কি বলেন তিনি! আপনারা কোথায়? আমরা যেথায় থাকি, তা ওনার কী? বল্লাম – আমরা গাড়িতে। কতটুকু এগুলেন? কি কয়? ওনি জানলেন কী করে আমরা টুঙ্গিপাড়ায় যাচ্ছি? বল্লাম আমরা শরীয়তপুরের সখীপুর এলাকা পের হচ্ছি।

এসপি স্যার বল্লেন, আমি জানলাম, দেখলাম।
কিভাবে? আরে আপনাদের অনেকেই ফেইসবুকে ছবি দিলো দেখলাম! আরে এই কাম? তখন আমারও মনে পড়ে গেলো আমিও তো দোয়া চেয়ে আগের রাতে পোষ্ট দিয়েছি। যাক এসপি সাহেব বল্লেন আপনারা আসতে কতোক্ষণ লাগবে? বল্লালাম রাস্তায় কয়তো ৪/৫ ঘন্টা।

তিনি জানালেন, তিনি বাড়ি গেছিলেন এবং সে পথে টুঙ্গিপাড়া ঘুরে মাদারীপুর হয়ে ঢাকা যাবেন।
বল্লাম স্যার, আপনাকে পেলেতো ভালোই হতো।কিন্তু তিনি অলরেডি বাঘেরহাট থেকে সেখানে পৌঁছে গেছেন। সরি। বল্ল্লেন না, আপনারা ভালোভাবে পৌঁছেন এটি কামনা করি।

এসপির সাথে কথা বলার পর ব্যথা ঝাঁকুনি এসব টের পেলাম কম। আবার শুরু হলো।
একসময় দু ‘ সড়কের মুখ পাওয়া গেলো। একটা একটু ভালো দেখে গাড়িগুলো সে রাস্তায় ঢুকলো। যাচ্ছি তো এখানেও আরাম যেন হারাম! গর্ত আর গর্ত। হায়রে মাবুদ! গত ১০ টা বছর আওয়ামী লীগ হেন কোন রাস্তা নাই যেটার সংস্কার করেনি। কিন্তু এই রাস্তা এমন কেন? এছাড়া এই সখিপুর ভেদের গন্জ ডামুড্ডা এলাকাসহ ১৯৯১ সালের পর থেকেই আওয়ামীলীগ এখানে আসনগুলো পাচ্ছে একচেটিয়া! কর্ণেল( অবঃ) শওকত, প্রয়াত আবদুর রাজ্জাকসহ সব ভাগা ভাগা নেতা! এরা কি এই পথে জাননি কোনদিন? এমনসব বলাবলি আমাদের।

হঠাৎ রাস্তার এক মোড়। ৫/৭ ট্রাক রাস্তার পাশে লোড করা। ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে দিলো! কি ব্যাপার? সামনে রাস্তার উপর ট্রাক কাত হয়ে পড়ে আছে।

যাওয়া সম্ভব না! নামলাম গাড়ি থেকে। আহারে! এই বুঝি চাঁদপুর ফেরতই যেতে হবে! বঙ্গবন্ধুর সমাধি জিয়ারত, বাড়ি পরিদর্শন এসব স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে।
তিন গাড়ি থেকেই নেমে এলো সবাই। শহীদ ভাইয়ের মন খারাপ, মন খারাপ আমাদের। যাক নেমে কতোক্ষন ভাঙা রাস্তার পাশে ঘুরা ঘুরি। এলাকার মানুষ বলছে, আমনেরা কি পাগল? আমরা নাইলে তাই। সইয়া গেছে!

কিন্তু আমনেরা যাইবেন কতো দূরে বঙ্গবন্ধুর দেশে! খবর নিয়া আইতেন! এখন পথ একটাই বিকল্প রাস্তা। গাড়ি ঘুরান পিছনে ৫/৬ কিলো যান, তারপর রাস্তা একটা পাইবেন, ডামুড্ডা হইয়া যান। কি আর করা যেতে তো হবেই বঙ্গবন্ধুর মাটিতে! গাড়ি ঘুরানো হলো। আধঘন্টা পর সেই মোড় পাওয়া গেলো এবং চোখে মুখে স্বস্তির আভা। (চলবে)

লেখক : ইকবাল হোসেন পাটওয়ারী,
সাবেক সভাপতি, চাঁদপুর প্রেসক্লাব,
চাঁদপুর প্রতিনিধি, দৈনিক সমকাল
প্রকাশক ও সম্পাদক : চাঁদপুর প্রতিদিন

চাঁদপুর