জীবিকার তাগিদে বছরখানেক আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন স্বামী মো. রিয়াদ হোসেন। কিন্তু সেখানে আকামা (বৈধ কাগজপত্র) না থাকায় ঠিকমতো মিলছিল না কাজ। দেশে থাকা স্ত্রী পপি বেগমও ধারদেনা করে দুই অবুঝ সন্তানের মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে অতি কষ্টে গড়ে তুলেছিলেন একটি ছোট বসতঘর। কিন্তু এক রাতের বিধ্বংসী আগুন মুহূর্তেই ভস্মীভূত করে দিল সেই শেষ সম্বল। দুই নিষ্পাপ শিশুকে নিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটছে পপি বেগমের।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) গভীর রাত আনুমানিক ১টার দিকে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়নের দক্ষিণ ধানুয়া গ্রামের ‘খাসের বাড়িতে’ এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিনের মতো সোমবার রাতে দুই সন্তানকে নিয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে ঘুমিয়ে পড়েন পপি বেগম। রাত ১টার দিকে ঘরের চারদিকে আগুনের প্রচণ্ড তাপে ও ধোঁয়ায় তাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। আগুনের লেলিহান শিখা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে পরা পরনের সামান্য কাপড়টুকু সম্বল করে দুই সন্তানকে কোলে নিয়ে কোনোমতে ঘর থেকে বের হয়ে প্রাণ রক্ষা করেন তিনি।
তাঁদের ডাকচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালান এবং ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন। তবে মুহূর্তের মধ্যেই ঘরটি পুরো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ঘরের আসবাবপত্র, শিশুসন্তানের স্কুলের বইপত্র ও জমানো সব টাকা ভস্মীভূত হয়।
হাউমাউ করে কেঁদে পপি বেগম বলেন, আমার ৭ বছরের মেয়ে ফাতেমা আর ৩ বছরের ছেলে ফারাজকে নিয়ে রাতে ঘুমে আছিলাম। হঠাৎ আগুনের আঁচে ঘুম ভাঙলে সন্তানদের কোলে নিয়া ঘরের বাইরে এক কাপড়ে ভাইগ্যা বের হই। স্থানীয় মানুষ আর ফায়ার সার্ভিস আইসা আগুন নিভানের চেষ্টা করলেও কিচ্ছু বাঁচানো যায় নাই। আমার স্বামী সৌদিতে অবৈধ হইয়া পড়ায় কাজকর্মে আয়-রোজগার নাই। শিশু বাচ্চাদের নিয়া এখন কই যামু, কী খামু-কিছুই ভাইবা পাচ্ছি না।
ফরিদগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ মো. কামরুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। স্থানীয়দের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও ঘরটির সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
স্থানীয় গোবিন্দপুর উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম শেখ বলেন, পরিবারটি মারাত্মক আর্থিক অনটনের মধ্যে রয়েছে। আগুনে নতুন তৈরি করা ঘরটি পুড়ে যাওয়ায় তারা এখন সম্পূর্ণ নিঃস্ব। ইউপি পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা তাৎক্ষণিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করছি। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষদেরও এই অসহায় পরিবারটির পুনর্বাসনে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।
অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক জানান, অগ্নিকাণ্ডে ঘর পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপাতত জরুরি শুকনো খাবার দেওয়া হচ্ছে। লিখিত আবেদন পাওয়ার পর তাদের ঘর পুনর্নির্মাণে সরকারি ঢেউটিন ও অনুদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিবেদক: শিমুল হাছান,
২০ অক্টোবর ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur