বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থেকে শুরু করে,মন্ত্রী,রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সংসদ সদস্যদের ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব,এক্স ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা, ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি, মনগড়া বক্তব্য প্রচার এবং সম্পাদিত ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা চলছে। বিএনপি ও সরকারের দাবি,রাজনৈতিকভাবে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই পরিকল্পিতভাবে এসব অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এখন এসব অপতথ্য ঠেকাতে সরকার কঠোর হচ্ছে। অপপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রথম ১৮০ দিনে ৪৬৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার এগুলো শনাক্ত করে। এগুলোর প্রায় ৯১ শতাংশই ছিল নেতিবাচক। শনাক্ত হওয়া কনটেন্টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে। পাশাপাশি মন্ত্রিসভার সদস্য, রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং সংসদ সদস্যদের নিয়েও ধারাবাহিকভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সরকারের প্রথম ১৮০ দিনে প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে ১৫৭টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে বলে রিউমার স্ক্যানারের তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে ২৬টি, মন্ত্রীদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে ঘিরে ৪৮টি এবং শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে ঘিরে ৩৩টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
এ ছাড়া স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমকে ঘিরে ২৩টি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীকে ঘিরে ১৬টি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে ঘিরে ১৫টি এবং রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস এবং তথ্য উপদেষ্টা ডা.জাহেদ উর রহমানকে ঘিরে ১৪টি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
সরকারের পাশাপাশি বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যদের নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। রিউমার স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী ফজলুর রহমানকে ঘিরে ১৬টি, লুৎফুজ্জামান বাবরকে ঘিরে পাঁচটি, তরুণ সংসদ সদস্য মানসুরা আলমকে ঘিরে তিনটি এবং বরকতউল্লা বুলু, মনিরুল হক চৌধুরী, শাহাদাত হোসেন সেলিম ও নিলোফার চৌধুরী মনিকে ঘিরে দুটি করে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
গত বুধবার সংসদে ব্যাংক রেজুলেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬ নিয়ে আলোচনার সময় বিএনপির সরকার ও বিভিন্ন সংকট নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার বক্তব্যও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেয়। বিএনপির নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেই তিনি সরকারের সমালোচনায় সরব হয়েছেন।
বর্তমানে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে বিভিন্ন দেশে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশেও তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে চাপ রয়েছে। এই বাস্তব পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো ভিডিও,অন্য দেশের দৃশ্য ও সম্পাদিত ছবি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি হিসেবে প্রচারের অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি গাজীপুরে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সিফাত আবদুল্লাহ নামের এক ছাত্রের বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন অশালীন বক্তব্য দেওয়া হয়। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকার অপতথ্যের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে চাচ্ছে।
বিএনপি নেতাদের ভাষ্য,সরকারের সমালোচনার অধিকার সবার রয়েছে। তবে সমালোচনার নামে মিথ্যা বা যাচাইহীন তথ্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রধানমন্ত্রীও বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে অপতথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলায় সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। সরকারের অবস্থানও ক্রমেই কঠোর হচ্ছে।
সরকারের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিরা বলছেন,সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার অধিকার সবারই রয়েছে। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে সঠিক তথ্য,রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার ভিত্তিতে। একই সঙ্গে অপতথ্য মোকাবিলার নামে যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হন,সে বিষয়েও সরকার সতর্ক রয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স খবরের কাগজকে বলেন,নির্বাচনের আগে থেকে শুরু হয়েছে অপতথ্য ছড়ানো। এখনো ছড়ানো হচ্ছে। যারা এসব করছেন, তারা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। অনেকে নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার হতাশা থেকেও এমন প্রচারণায় যুক্ত হচ্ছেন।
অন্য বিষয়ের পাশাপাশি ঋণখেলাপি প্রসঙ্গে তিনি বলেন,ঋণ নেয়ার পর নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ না করলে ঋণখেলাপির বিষয়টি আসে। বিএনপি সরকার গঠনের ছয় মাসও পূর্ণ হয়নি। এ অল্প সময়ে ঋণ নেয়ার প্রক্রিয়াই যেখানে শেষ হয় না, সেখানে ঋণখেলাপির প্রশ্ন কীভাবে আসে? সরকারের বিরুদ্ধে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,অপতথ্য মোকাবিলায় দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এবং স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাদের নেতা-কর্মীদের যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার বিষয়ে সচেতন করতে হবে। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য কয়েক মিনিটের মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু সেই তথ্যের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সময় লাগে অনেক বেশি।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur