Home / বিশেষ সংবাদ / চাঁদপুরের চাঁদমুখ অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. হাসিনা সুলতানা
চাঁদমুখ

চাঁদপুরের চাঁদমুখ অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. হাসিনা সুলতানা

চাঁদপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজেদের কর্ম ও কৃতিত্বে শুধু পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেননি, আলোকিত করেছেন জন্মভূমির নামও। তাঁদের জীবন যেন নদীর মতোই বহমান, নীরব অথচ গভীর। অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. হাসিনা সুলতানা তেমনই এক উজ্জ্বল মুখ। চিকিৎসাবিজ্ঞান, সামরিক পেশা, শিক্ষা, গবেষণা এবং মানবসেবার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি আজ নিজেই এক অনুপ্রেরণার নাম।

চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগদী ইউনিয়নের নানুপুর গ্রামের মরহুম হাবিবুল্লাহ খান, যিনি পেশায় ছিলেন কাস্টমস কর্মকর্তা, এবং মরহুমা খুরশিদা বেগমের সুযোগ্য সন্তান ডা. হাসিনা সুলতানার শৈশব কেটেছে শিক্ষা ও মূল্যবোধের আবহে। মেধা, অধ্যবসায় আর মানুষের জন্য কিছু করার প্রত্যয় তাঁর জীবনের শুরু থেকেই পথ দেখিয়েছে।

মেধার স্বাক্ষর শিক্ষাজীবনে

১৯৭২ সালে মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ১৯৭৪ সালে চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে চাঁদপুর থেকে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী প্রথম বিভাগ অর্জন করেছিলেন বলে জানা যায়, তাঁদের একজন ছিলেন হাসিনা সুলতানা।

শিক্ষার প্রতি গভীর নিষ্ঠা তাঁকে নিয়ে যায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠিন অথচ মহৎ পথে। ১৯৮১ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় মানুষের জীবন রক্ষার মহান ব্রতকে পেশা হিসেবে গ্রহণের পথচলা।

সেনাবাহিনীতে চিকিৎসক হিসেবে অনন্য যাত্রা

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সামরিক শৃঙ্খলা ও চিকিৎসাসেবার মানবিক দায়িত্বকে একসঙ্গে ধারণ করে তিনি এগিয়ে যান সাফল্যের পথে।

১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিজিও পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। একই সময়ে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস থেকে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে এই প্রতিষ্ঠানের ফ্যাকাল্টি মেম্বার ও পরীক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা তাঁকে ধীরে ধীরে নিয়ে যায় নেতৃত্বের আসনে।

পরবর্তীতে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এর গাইনি বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

তারকা খচিত সামরিক ক্যারিয়ার
সামরিক চিকিৎসাবিদ্যায় তাঁর মেধা ও দক্ষতার স্বীকৃতি আসে পদোন্নতির মধ্য দিয়ে। ২০০৮ সালে তিনি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হন। একজন নারী চিকিৎসকের জন্য এটি ছিল যেমন গৌরবের অর্জন, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের জন্য ছিল সাহস ও সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর পেশাগত দক্ষতার স্বাক্ষর রয়েছে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ান সশস্ত্র বাহিনীতে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নিজেকে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে রাখতে দেশে-বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন অধ্যাপক হাসিনা সুলতানা। রাশিয়া ও ভারত থেকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির ওপর এবং ইংল্যান্ড ও ভারত থেকে গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি ও ইনফার্টিলিটির ওপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি।

তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে প্রকাশিত হয়েছে ১৫টিরও বেশি রচনা ও প্রকাশনা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল বিষয়কে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর পাশাপাশি জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও তাঁর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

অবসরের পরও থামেনি সেবার পথচলা

২০১৪ সালে সশস্ত্র বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করলেও থেমে থাকেননি তিনি। অবসর যেন তাঁর কাছে কর্মজীবনের সমাপ্তি নয়, বরং মানুষের জন্য কাজ করার আরেকটি নতুন অধ্যায়।

অবসর-পরবর্তী সময়ে শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রায় পাঁচ বছর গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

সংগঠন ও পেশাজীবনে সক্রিয়

চিকিৎসাক্ষেত্রে পেশাগত সংগঠনগুলোর সঙ্গেও তাঁর রয়েছে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা। তিনি ইন্টারন্যাশনাল গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সার সোসাইটি, গাইনি এন্ডোস্কোপি সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং ফার্টিলিটি অ্যান্ড স্টেরিলিটি সোসাইটি অব বাংলাদেশের আজীবন সদস্য। এছাড়া অবস অ্যান্ড গাইনি সোসাইটি অব বাংলাদেশের কার্যকরী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

পরিবারেও চিকিৎসা ও সেবার ঐতিহ্য

ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. হাসিনা সুলতানা প্রকৌশলী নুর মোহাম্মদ খানের সহধর্মিণী। তাঁর স্বামী বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। দুই পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের গর্বিত জননী তিনি।

তাঁর পরিবারেও রয়েছে চিকিৎসা ও দেশসেবার উজ্জ্বল ঐতিহ্য। তাঁর বড় ভাই ছিলেন দেশের স্বনামধন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ। ছোট ভাই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. তারিকুল ইসলাম খান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মানুষের পাশে, নীরবে

একজন চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর ডিগ্রি কিংবা পদবি নয়, মানুষের দুঃসময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। সেই মানবিক পরিচয়টিই যেন ডা. হাসিনা সুলতানার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।

চাঁদপুর শহরে নিজের অর্থায়নে তিনি একটি এতিমখানা ও মহিলা মাদ্রাসা পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি সমাজের দুস্থ, অসহায় ও অবহেলিত মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্নভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

শিক্ষা, চিকিৎসা, মানবসেবা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর এই সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে, মানুষের কল্যাণের জন্য বড় কোনো পদ বা পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন একটি উদার হৃদয়ের।

চাঁদপুরের গর্ব, মানুষের প্রেরণা

জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. হাসিনা সুলতানা আজ একটি নামের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। তিনি চাঁদপুরের সেই আলোকিত মুখ, যার সাফল্যের গল্পে মিশে আছে মেধা, শ্রম, শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ আর মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

নানুপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া এক কন্যা আজ দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিসরে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। সামরিক বাহিনীর কঠোর শৃঙ্খলা থেকে চিকিৎসা শিক্ষার অধ্যাপনা, দেশ-বিদেশের উচ্চতর প্রশিক্ষণ থেকে মানবিক সেবার নীরব অধ্যায়, প্রতিটি বাঁকে তিনি রেখে চলেছেন তাঁর কর্মের স্বাক্ষর।

চাঁদপুরের নদী যেমন আপন স্রোতে বয়ে চলে, তেমনি কিছু মানুষ তাঁদের কর্মের আলোয় সময়কে অতিক্রম করে যান। অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. হাসিনা সুলতানা তেমনই এক আলোকিত মানুষ। তাঁর জীবন শুধু সাফল্যের গল্প নয়, এটি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বার্তা: মেধা যখন মানবতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন একজন মানুষ নিজেই হয়ে ওঠেন একটি প্রতিষ্ঠানের নাম।

প্রতিবেদক: আশিক বিন রহিম/
২৭ আগস্ট ২০২৬