ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্তও সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। ইসলামের সূচনালগ্নেই মুসলিম সমাজে এমন এক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যা ছিল ন্যায়, স্বচ্ছতা ও মানবকল্যাণের অনন্য উদাহরণ। এ কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ‘বাইতুল মাল’ তথা মুসলিমদের কোষাগার।
বাইতুল মাল’ বলতে সেই স্থান বা ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের সরকারি সম্পদ—যেমন যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, কর, অনুদান ইত্যাদি সংরক্ষণ করা হয় এবং সেগুলো যথাযথভাবে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। সাহাবিদের মধ্যে সর্বপ্রথম মুসলিমদের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত হন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)। তাঁকে এ গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)। তাঁর খিলাফতকালে আবু উবাইদাহকে এ পদে মনোনীত করা হয়, কারণ তিনি ছিলেন অসাধারণ বিশ্বস্ত, সৎ ও আমানতদার।
আবু উবাইদাহ (রা.)-এর সততা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মহানবী (সা.) নিজেই তাঁকে ‘এই উম্মতের আমিন তথা ‘বিশ্বস্ত তত্ত্বাবধায়ক’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ফলে তাঁর হাতে মুসলিমদের অর্থভাণ্ডারের দায়িত্ব দেওয়া ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তবে ইসলামে ‘বাইতুল মাল’ বা কোষাগারের গোড়াপত্তন কে করেন এ বিষয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে।
প্রথম মত অনুযায়ী, আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-ই সর্বপ্রথম এ কোষাগারের গোড়াপত্তন করেন।
তিনি ‘আস-সুনহ’ নামক স্থানে এটি উদ্বোধন করেন। তবে তিনি কোনো প্রহরী নিয়োগ করেননি। কারণ তাঁর শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল বিশ্বাস ও তাকওয়া। পরবর্তী সময়ে তিনি কোষাগারটি নিজের ঘরে স্থানান্তর করেন, যাতে সহজে তা তত্ত্বাবধান করতে পারেন। সেখানে সংগৃহীত সম্পদ দরিদ্র ও অভাবী মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করা হতো।
এ ছাড়া যুদ্ধের জন্য ঘোড়া, অস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনা হতো এ তহবিল থেকেই। আবু বকর (রা.)-এর ইন্তেকালের পর উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর তত্ত্বাবধান করেন।
দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ছিলেন মুসলিমদের কোষাগার গোড়াপত্তনের প্রথম ব্যক্তি। তাঁদের মতে, মহানবী (সা.)-এর যুগে এবং আবু বকর (রা.)-এর সময়ে আনুষ্ঠানিক কোনো কোষাগার ছিল না। তবে বেশির ভাগ ঐতিহাসিকের মতে, এই মতটি সঠিক নয়, বরং আবু বকর (রা.)-ই সর্বপ্রথম ‘বাইতুল মাল’ গোড়াপত্তন করেন এবং এর দায়িত্বে আবু উবাইদাহ (রা.)-কে নিযুক্ত করেন।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে বাইতুল মাল প্রতিষ্ঠা এবং তার সঠিক পরিচালনা আমাদের সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। এটি শুধু অর্থ সংরক্ষণের মাধ্যম ছিল না, বরং এটি ছিল ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ ও সামাজিক ভারসাম্যের প্রতীক। আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর দূরদর্শিতা এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)-এর সততার ফলেই এ ব্যবস্থা সফল ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ইসলামের এ মডেল আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল পথনির্দেশক হয়ে থাকতে পারে। (তারিখুল খোলাফা, পৃষ্ঠা-৬৪, মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ কুয়েতিয়্যাহ, পৃষ্ঠা-২৪৫-২৪৬)
৪ মে ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur