এবার বাম্পার ফলনের কারণে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগোচ্ছে দেশ। বাজারে দামও সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। কৃষক ও কৃষিবিদগণ জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগে ৯ শতাধিক স্থাপনা নির্মাণ, কৃষি বিভাগের তদারকি এবং অনুকূল আবহাওয়ায় রোগবালাই কম হওয়ায় এবার উৎপাদন খুব ভালো হয়েছে। ফলে এবার আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নাসির-উদ-দৌলা (অতিরিক্ত সচিব) বাসস’কে বলেন, এবার পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে দেশ। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে, দামও স্থিতিশীল রয়েছে।
তিনি বলেন, দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশে ৯শ টি সংরক্ষণ ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রাম পর্যায়ের কৃষকদেরও পেঁয়াজ সংরক্ষণের পদ্ধতি জানানো হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাজারে সংকটকালে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। তবে দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন হওয়ায় খুব বেশি আমদানি করতে হয়নি। একই সঙ্গে কৃষক যাতে উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পান, সে বিষয়েও সরকার সজাগ রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি ২০২৫- ‘২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১শ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
পেঁয়াজ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষক ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।
অন্যদিকে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৮৬ হাজার ৩৯৮ দশমিক ৮৪ মে. টন পেঁয়াজ আমদানি করা হয়েছে। আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৮১১ দশমিক ২৭ মে. টন। দেশে বার্ষিক পেঁয়াজের চাহিদা সাধারণত ৩৫ থেকে ৩৬ লাখ মে. টন।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার রূপাপাত ইউনিয়নের বনমালীপুর গ্রামের কৃষক পার্থ কুমার মণ্ডল বাসস’কে জানান, এবার পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। বেশি লাভের আশায় তিনি আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর যে পরিমাণ পেঁয়াজ পাই, এবার তার থেকে অনেক বেশি পেয়েছি।’
একই ইউনিয়নের সুতালিয়া গ্রামের আরেক চাষি সাধন হীরা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার শতাংশপ্রতি উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। প্রতি শতাংশে প্রায় সাড়ে তিন মণ পেঁয়াজ পেয়েছি।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১ হাজার টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। ফলন ভালো হওয়ায় শতাংশ প্রতি উৎপাদন খরচ কমেছে। এতে কৃষকরা লাভের মুখ দেখার আশায় রয়েছেন।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারা, কন্দ ও বীজ মিলিয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার ১শ হেক্টর জমিতে ৪২ লাখ ৫০ হাজার মে. টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৩শ হেক্টর জমিতে আবাদ এবং ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১শ মে. টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত কয়েক বছরের আমদানি চিত্রে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১০ লাখ ৯১ হাজার টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬ লাখ ৬৭ হাজার ১৫১ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬ লাখ ২ হাজার ২৯ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৬৮ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬ লাখ ৫ হাজার ৩শ ৩৭ মে. টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৮১১ দশমিক ২৭ মে. টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৮৬ হাজার ৩৯৮ দশমিক ৮৪ মে. টন।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক হেলাল উদ্দিন বলেন, এবার পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হওয়ায় অন্যান্য বছরের তুলনায় আমদানি সবচেয়ে কম হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত একটি মডেল ঘরে ৩শ মণ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাবে। পাঁচজন কৃষকের জন্য একটি ঘর করা হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্য, এসব মডেল ঘর দেখে কৃষকরা নিজেরাই একই ধরনের ঘর তৈরি করে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করবেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকার ‘বায়ু প্রবাহ পদ্ধতিতে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং বিপণন কার্যক্রম’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারায় ২৫ থেকে ৩০ % পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। ইতোমধ্যে নতুন এয়ার-ফ্লো মেশিনের মাধ্যমে সংরক্ষণ শুরু হয়েছে। আট থেকে নয় মাস পর্যন্ত ওই নিয়মে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা গেলে দেশ পেঁয়াজে পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে যাবে। ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ বাসস
২৫ এ প্রিল ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur