Home / সারাদেশ / চলতি বছর শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচন
lged---

চলতি বছর শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত সময় পার করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনের পর পর স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়।

এমন প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার কাঠামোয় উপজেলা ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের পরিকল্পনা করেছে সরকার। এই বিবেচনায় চলতি বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে ধাপে ধাপে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির সিনিয়র নেতারা মনে করেন, দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে নির্বাচন হওয়ার কারণে বিগত স্থানীয় নির্বাচনে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনার পাশাপাশি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এছাড়া গ্রামীণ সম্প্রীতির ওপরও প্রভাব পড়ে। এজন্য দলীয় প্রতীক তুলে দিয়ে অতীতের মতোই স্থানীয় সরকার কাঠামোর ভোটকে উৎসবে পরিণত করতে চায় দলটি।

সরকারের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, জুন ও জুলাই মাসে প্রচণ্ড গরম এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বর্ষার মধ্যে নির্বাচনে অনুষ্ঠানের নজির খুব কম। যদিও ২০২৪ সালের মে ও জুন মাসে চার ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজন করেছিল আগের সরকার। এছাড়া চলতি বছরের ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে শেষ হবে ২০ মে। এরপর ব্যবহারিক পরীক্ষা চলবে ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত। এরপর জুন-জুলাই মাসে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সরকার সংশ্লিষ্ট অনেকেই। সব মিলিয়ে শীতের সময়টিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সুবিধাজনক বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে গত ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন বিল-২০২৬ পাস হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে রাজনৈতিক দলের সদস্য স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচন করবেন।

এর আগে একটি অনুষ্ঠানে উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ না দিয়ে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের কথা জানিয়েছে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা নেই। বর্তমানে যেসব স্থানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন, সেখানে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেবেন।

প্রতিমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর তৃণমূল পর্যায়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করতে শুরু করেছেন সরকার দলের নেতাকর্মীরা। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে নিজেদের প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেছেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার চারটি অধ্যাদেশ জারি করে স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে। সে সময় জনপ্রতিনিধিদের বড় অংশ আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬১টি জেলা পরিষদ ও ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং প্রশাসকের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদের কাঠামো বহাল রাখা হলেও যেসব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান অনুপস্থিত ছিলেন, সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের কয়েক দিনের মধ্যেই দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৫৪টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে উপজেলা ও পৌরসভায় এখনো কোনো প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

এদিকে সরকারের এমন অবস্থানের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে সংগঠনকে চাঙা করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণে কাজ করছেন দলীয় নীতিনির্ধারকরা।

দলটির নেতারা মনে করছেন, জাতীয় নির্বাচনের বিজয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। সে লক্ষ্যেই পরিকল্পিতভাবে মাঠ গোছানোর কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরি ও পুরোনো কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্যরা বিজয়ী হয়েছেন, সেসব এলাকায় সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে তারা সরকারের এক মাসের সফলতার কার্যক্রম তুলে ধরছেন। বিশেষ করে সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই ফ্যামিলি কার্ড চালু, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদান এবং খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধনকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন দলীয় নেতাকর্মীরা।

প্রার্থী বাছাইয়ে সতর্ক বিএনপি

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী খুঁজে বের করতে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। স্থানীয় জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে প্রার্থী তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ওপরও নজরদারি রাখছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল যাতে নির্বাচনে প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির দলীয় সূত্রে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় একক প্রার্থী দিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দল কঠোর অবস্থানে থাকবে। ইতিমধ্যে প্রতিটি এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা হচ্ছে। বিএনপির হাইকমান্ড থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিদ্রোহী প্রার্থিতা কঠোরভাবে দমন করতে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং সেলও গঠন করা হতে পারে বলে জানা গেছে। যে কোনো মূল্যে একক প্রার্থী নিশ্চিত করতে চায় দলটি।

এছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি সমন্বিত কৌশল প্রণয়নেও কাজ করছে বিএনপি। ভোটারদের কাছে দলীয় অবস্থান তুলে ধরতে স্থানীয় ইস্যুভিত্তিক প্রচারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন, স্থানীয় সমস্যা সমাধান ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে নির্বাচনি প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিএনপিও দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায় জানিয়ে দলটির যুগ্ম মহাসচিব ইমরান সালেহ প্রিন্স আমার দেশকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহার অনুযায়ী বিএনপি দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে চায়। তবে সবেমাত্র সরকারের বয়স দুই মাস হয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছে, ফলে বৈশ্বিকভাবে অর্থনীতি গতি হারিয়েছে। আর নির্বাচন আয়োজনে একটা বিশাল বাজেট প্রয়োজন। এছাড়া এ সময়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বোর্ড পরীক্ষা রয়েছে। এরপর বর্ষা আছে। এর মধ্যেই দ্রুত নির্বাচন আয়োজনে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করি, চলতি বছরের শেষের দিকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ইতোমধ্যে মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপে উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সর্বশেষ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। সরকারের সিদ্ধান্ত পেলে দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন শেষ করা হবে।

১৮ এ প্রিল ২০২৬