Home / সারাদেশ / চাঁদপুর-৩ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
দাঁড়িপাল্লা

চাঁদপুর-৩ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১০ দলীয় জোট সমর্থিত চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনের প্রার্থী ও জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী এডভোকেট মো. শাহজাহান মিয়া নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টায় চাঁদপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সর্বস্তরের সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে তিনি এই ইশতেহার ঘোষণা করেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও চাঁদপুর শহর জামায়াতের আমির এডভোকেট মো. শাহজাহান খান।

বক্তব্য দেন এনসিপি চাঁদপুর জেলা কমিটির আহবায়ক মো. মাহবুব আলম, চাঁদপুর সদর জামায়াতের আমির মাওলানা আফছার উদ্দিন মিয়াজী, শহর ছাত্রশিবির সভাপতি মো. জাহিদুল ইসলাম। শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তিলাওয়াত করেন হাফেজ মো. হামেদ।

প্রার্থী মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, তিনি সাংবাদিক পরিবারের একজন। সুখে-দু:খে তিনি সব সময় সাংবাদিকদের পাশে ছিলেন এবং আগামীতে থাকবেন।

পরে তিনি লিখিত ইশতেহার পাঠ করে শুনান।

নিম্নে ইশতেহার তুলে ধরা হলো: আসসালামুয়ালাইকুম। আশাকরি আপনারা সবাই ভালো আছেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আপনারা সৎ যোগ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচিত করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। চাঁদপুর একটি সম্ভাবনাময় জেলা। পদ্মা মেঘনা ডাকাতিয়া নদী পরিবেষ্টিত চাঁদপুর সদর-হাইমচর এলাকা নিয়ে চাঁদপুর -৩ নির্বাচনী এলাকা। এই নদী একদিকে আমাদের দুঃখ। অন্যদিকে আশির্বাদ। দুঃখ এ জন্য যে, নদী ভাঙনের ফলে চাঁদপুর শহর থেকে শুরু করে উত্তরে মতলব দক্ষিণে হাইমচর পর্যন্ত ভাঙনের ফলে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়েগেছে। বিভিন্ন সয়য়ে ব্লক ফেলে নদী ভাঙনরোধে চেষ্টা হলেও যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত ছিল তারা লাভবান হতে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের।

অন্যদিকে বালু সিন্ডিকেটের কারণে নদী ভাঙন আরো ত্বরান্বিত হয়েছে। এসব কারণে এই নদী আমাদের দুঃখ। অন্যদিকে আশির্বাদ এ জন্য যে, বৃটিশ আমল থেকে এই নদীই চাঁদপুরকে নদী বাণিজ্যিক নদী বন্দর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আপনারা জানেন, আমাদের এই নির্বাচনী এলাকার মানুষের মানুষের চাওয়া পাওয়া গুলো খুব বেশি না। তারা চায় নিরাপত্তা, সম্মানজনক জীবন জীবিকা। তারা চায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা। নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা। তারা চায় সন্তানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। তারা চায় অনাচার অবিচার ও সামাজিক বৈষম্য ও দুর্নীতি সন্ত্রাসমুক্ত স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে, আপনাদের সন্তান, আপনাদের ভাই হিসেবে সাধারণ মানুষের সেই চাওয়া গুলো পূর্ণতা দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমি বিশ্বাস করি যতটুকু কাজ আপনাদের দিতে পারব, আপনাদের জন্য যতটুকু সেবা নিশ্চিত করতে পারব আপনারা আমাকে ভোটে নির্বাচিত করলে একজন সেবক হিসেবে তা করার জন্য আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করব। আমি জানি এই এলাকার মানুষের সমস্যা কী। কীভাবে একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তা সমাধানের জন্য উদ্যোগী হতে হবে সেই অভিজ্ঞতাও আলহামদুলিল্লাহ আছে। এই প্রত্যাশা সামনে রেখে আমি আমার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছি।

ইশতেহার : ১. চাঁদপুরকে একটি পর্যটন নগরী গড়ে তোলার জন্য আমি আমার তরফ থেকে সবধরনের উদ্যোগ নেব ইনশাআল্লাহ। এটি করা গেলে চাঁদপুরে নতুন করে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। শুধু দেশ নয় বিদেশে চাঁদপুরের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি ও চাঁদপুরে পর্যটকদের আগমনের জন্য একটি সুপ্রশস্ত পথ উন্মুক্ত হবে। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হবে জেলা এবং জেলার মানুষ। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মেরিন ড্রাইভের আদলে তিন নদীর মোহনা থেকে মতলব মুন্সীগঞ্জের সাথে সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে রাজধানীর সাথে দুরুত্ব কমিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ২. সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নৈতিকতা সম্পন্ন নাগরিক গড়ে তোলার জন্য আরও একাধিক বিদ্যালয় গড়ে তোলা। ৩. শহরে পৌর ঈদগাঁও মাঠটি ছোট হওয়ার ফলে ঈদের নামাজ ও কেউ মারা গেলে তার জানাজার জন্য স্থান সংকুলান হয় না। তাই শহরের আশেপাশে একটি বড় ঈদগাঁও মাঠ করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

৪. চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ণাঙ্গ রূপ এবং চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ পূর্ণাঙ্গভাবে স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহন করা হবে। যাতে করে শুধু চাঁদপুর নয়, দেশের অন্যপ্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সুযোগ পাবে। ৫. চাঁদপুর-কক্সবাজার রুটে যাত্রীদের এবং ভ্রমন পিপাসুদের সুবিধার জন্য সরাসরি চাঁদপুর-কক্সবাজার রেল যোগাযোগ বাস্তাবায়ন করা হবে। ৬. ইলিশের বাড়ি চাঁদপুরের ঐতিহ্য রক্ষায় ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশে বিদেশে রপ্তানি যোগ্য হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ৭. চাঁদপুরে একটি স্টেডিয়াম রয়েছে, কিন্তু ফুটবল খেলার জন্য কোনো প্রশস্ত মাঠ নেই। শহরের আশেপাশে একটি খেলার মাঠ তৈরি এবং পুরান বাজারের খেলার মাঠ সংস্কার ও নতুন একটি মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। ৮. হাইমচরকে পৌরসভা রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যেগ গ্রহন করা হবে এবং একই সাথে যে জলাবদ্ধতা রয়েছে তা নিরসন করা হবে।

৯. মসজিদ ভিত্তিক প্রকল্প গ্রহন করা হবে-ঈমাম, মুয়াজ্জিনদের আর্থ সামাজিক সুযোগ সুবিধা, প্রতি মসজিদে উন্নতমানের খাটিয়া এবং মৃত ব্যক্তির দাফন কাফনের আধুনিক সরঞ্জামাদি সরবরাহ করা হবে। ১০. মননশীল সৃজনশীল এবং মানবিক নাগরিক তৈরির লক্ষ্য প্রতি ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি করে পাঠাগার তৈরি করা হবে। ১১. কিশোর গ্যাং ও মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। মাদকের ছোবল থেকে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের স্থানীয় দপ্তর ও প্রশাসনের সহায়তায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

১২. যে সময়ে এবং যে পরিকল্পনায় চাঁদপুর শহর গড়ে তোলা হয়েছিল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে শহরটি সবার বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এখানে যানজটে মানুষের জীবন নাকাল। এই অবস্থা দেখে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে চাঁদপুর পৌরসভায় পরিকল্পিত নগরায়ন, রাস্তাঘাটগুলো প্রসস্তকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে উন্নত বিশ্বের আদলে নিয়ে আসার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে শহরের ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে শহরকে বিকেন্দ্রীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর জন্য শহরে বিকল্প বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হবে।

১৩. সুশাসন জবাবদিহিতা নিশ্চিকরণ এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বন্ধে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। যাতে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে স্বস্তি আসে এবং ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করতে পারেন।
১৪.নদী বেষ্টিত এলাকাকে পরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করে ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করার জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ১৫. আমার নির্বাচনি এলাকার রাজরাজেস্বর, চরমেশা এবং মাঝেরচর এলাকাকেও পযর্টন এলাকার আওতায় আনা হবে। এর অংশ হিসেবে যতটুকু উন্নয়ন দরকার তা করা হবে।

১৬. প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে চাঁদপুর পৌরসভায় পরিকল্পিত নগরায়ন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য রাস্তাঘাটগুলো প্রসস্তকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে উন্নত বিশ্বের আদলে নিয়ে আসা। ১৭. দলমত নির্বিশেষে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষের জন্য নিরাপদ ও বসবাস উপযোগী চাঁদপুর গড়ে তোলার জন্য আমার তরফ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। ১৮. চাঁদপুর নদী তীরকে কেন্দ্র করে বন্ধ শিল্প কল-কারখানা খোলার ব্যবস্থার পাশাপাশি নতুন শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে দেশি বিদেশী সংস্থাকে নিয়ে আসবো। এর মাধ্যম বেকারত্ব ঘুচবে।
১৯. ইলিশ ও নদী রক্ষায় বালু সিন্ডিকেটের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা বন্ধ করা হবে। ২০. পান সুপারির জন্য প্রসিদ্ধ হাইমচর আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। এই শিল্প জাতীয় অর্থনীতিতে যেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সে ব্যবস্থা করা হবে। ২১. বয়স্ক ও শিশুদের জন্য পার্ক নির্মাণ করা হবে। ২২. পৌর মেয়র এবং উপজেলা পরিষদের সাথে সমন্বয় করে সকল প্রকার উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে। ২৩. বয়স্ক ও বিধবা নারীদের জন্য সরকারি বরাদ্দ শতভাগ বাস্তবায়ন করা হবে।

২৪. শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, আইসিটি খাত থেকে প্রকল্প গ্রহণসহ অন্যান্য কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে। যাতে তাদের বেকার থাকতে না হয়। ২৫. আইনশৃঙ্খলা সহনীয় রাখতে আমার তরফ থেকে সার্বক্ষণিক তদারকি জোরদার করা হবে এবং গরিবের জন্য সরকারি সেবার পাশাপাশি বেসরকারিভাবে আইনি সেবা দেওয়া হবে। ২৬. চাঁদবাজ, দখলবাজদের রুখে দেওয়ার জন্য ‘পাহারাদার’ এ্যাপস এবং রাষ্ট্রীয় সকল আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ন্ত্রনের জন্য ‘আমার টাকা আমার হিসাব; বাস্তবায়ন করা হবে।

উপরোক্ত কাজগুলো বাস্তবায়ন করা হলে আমার নির্বাচনী এলাকায় চাঁদপুর সদর-হইমচরকে দেশের একটি মডেল এলাকা হিসেবে তুলে ধরা হবে। এখানে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো এগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিব ইনশাআল্লাহ।

এ সময় প্রেসক্লাব সভাপতি সোহেল রুশদী, সাধারণ সম্পাদক এমএ লতিফসহ স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

ইশতেহারের বিষয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিক কাদের পলাশ, আল-ইমরান শোভন, শাহাদাত হোসেন শান্ত, আশিক বিন রহিম ও মো. মাইনুল ইসলাম।

প্রতিবেদক: আশিক বিন রহিম
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬