প্রতিবছরের প্রথম দিনে স্কুল আঙিনায় নতুন বই হাতে শিশুদের উচ্ছ্বাস- এই দৃশ্যই ছিল বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় উৎসব ‘বই উৎসব’। তবে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে সেই উৎসবের রঙ মলিন। জানুয়ারির অর্ধেক পার হয়ে গেলেও দেশের বহু শিক্ষার্থীর হাতে এখনও পৌঁছায়নি বিনামূল্যের পাঠ্যবই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- সময়মতো বই দিতে পারল না কেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেরিতে শুরু হওয়া দরপত্র প্রক্রিয়াই এবারের প্রধান সংকটের কারণ। পাঠ্যবই ছাপার মূল ভিত্তি হলো টেন্ডার ব্যবস্থা। অথচ নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে দরপত্র আহ্বান করায় পুরো প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। একাধিক লটে যোগ্য দরদাতা না পাওয়ায় বারবার পুনঃটেন্ডার করতে হয়। এতে ছাপার কাজ শুরুতেই কয়েক মাস পিছিয়ে যায়।
মুদ্রণ সমিতির সাবেক এক সভাপতি বলেন, ‘পাঠ্যবই প্রকল্পে সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এবার দরপত্র ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় শৃঙ্খলার ঘাটতি ছিল।’
নতুন শিক্ষাক্রমের চাপ
চলতি বছর নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রস্তুতি ছিল সীমিত। বহু বইয়ের পাণ্ডুলিপি একাধিকবার সংশোধন, কনটেন্ট পুনর্বিন্যাস এবং নীতিগত সিদ্ধান্তে বিলম্ব পুরো প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সুলতানা নাহার বলেন, ‘শিক্ষাক্রম সংস্কার ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া বাস্তবায়নের চাপ বই উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে।’
প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রভাব
গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেও। নীতিগত সিদ্ধান্তে দেরি, টেন্ডার বাতিল এবং বারবার নির্দেশনা পরিবর্তনের ফলে পুরো কার্যক্রমে দেখা দেয় বিশৃঙ্খলা। এনসিটিবির এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, ‘শিক্ষার মতো স্পর্শকাতর খাতে ধারাবাহিকতা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অস্থির সিদ্ধান্ত সেই ধারাবাহিকতাই নষ্ট করেছে।’
ছাপাখানার সংকট
পাঠ্যবই ছাপার দায়িত্বে থাকা একাধিক প্রেস মালিক জানান, কাজ হাতে এসেছে দেরিতে, অথচ সময়সীমা ছিল অত্যন্ত সীমিত। তাদের ভাষ্য, এত অল্প সময়ে কোটি কোটি বই ছাপা বাস্তবসম্মত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাগজের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং ব্যাংকঋণের জটিলতা।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা
ঢাকার মিরপুরের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক শারমিন আক্তার বলেন, ‘ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির অনেক বই এখনও পাওয়া যায়নি। বই ছাড়া পাঠ পরিকল্পনা করেও তা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।’
রামপুরার অভিভাবক নাজমা বেগমের আক্ষেপ, ‘মেয়েটা স্কুলে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বই ছাড়া পড়বে কীভাবে? বাধ্য হয়ে গাইড বই কিনতে হচ্ছে।’
এনসিটিবির বক্তব্য
এনসিটিবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। জানুয়ারির মধ্যেই অধিকাংশ বই পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। বিলম্ব অনাকাক্সিক্ষত হলেও এটি সাময়িক।’ তবে শিক্ষাবিদদের মতে, এই ‘সাময়িক সংকট’ প্রতিবছরই ফিরে আসে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পাঠ্যবই সংকটে ক্লাস কার্যক্রমে ধীরগতি আসে, শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে এবং কোচিং ও গাইডনির্ভরতা বাড়ে। গ্রামীণ এলাকায় ভোগান্তি আরও বেশি, যেখানে অভিভাবকরা অনলাইনের পিডিএফ কপিও প্রিন্ট করতে পারেন না।
সমাধানের পথ
শিক্ষাবিদরা সময়মতো বই বিতরণ নিশ্চিত করতে কয়েকটি উদ্যোগের কথা বলেছেনÑ যেমন অন্তত ৮-১০ মাস আগে আগাম টেন্ডার ক্যালেন্ডার প্রণয়ন, শিক্ষাক্রম ও বই উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান, স্বাধীন ও শক্তিশালী তদারকি সেল, জরুরি প্রয়োজনে ই-বুক প্রস্তুতি, কাগজ আমদানিতে শুল্কছাড় ও মুদ্রণশিল্পে সহজ ঋণ সুবিধা।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, ‘বিনামূল্যের পাঠ্যবই কর্মসূচি শুধু একটি সরকারি উদ্যোগ নয়। এটি কোটি শিশুর শিক্ষাযাত্রার প্রথম সোপান। বছরের শুরুতেই সেই সোপানে ধাক্কা লাগলে ক্ষতিটা শুধু শিক্ষার নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের।’ তিনি বলেন, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে আবারও ফিরবে সেই চেনা দৃশ্যÑ নতুন বছরের সকালে বই হাতে উচ্ছ্বসিত শিশুদের হাসিমুখ।
উল্লেখ্য, এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মোট পাঠ্যবইয়ের সংখ্যা ৩০ কোটি ২ লাখের বেশি। ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৯০ শতাংশ পাঠ্যবই সরবরাহ করা হয়েছে।
চাঁদপুর টাইমস ডেস্ক/
১৭ জানুয়ারি ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur