জরায়ুর এক ধরনের টিউমারের নাম ফাইব্রয়েড। এটি ক্যান্সার বা প্রাণঘাতী কোনো রোগ না হলেও দেহে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। ফাইব্রয়েড নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ভূমিকা নিয়ে লিখেছেন পুষ্টিবিদ মো.
নাহিদ নেওয়াজ জরায়ুর মায়োমাস বা সেল লিওমায়োমাস জাতীয় টিউমারকে সামগ্রিকভাবে বলা হয় ‘ফাইব্রয়েড’। রোগটির চিকিৎসায় ওষুধ বা সার্জারির পাশাপাশি সুস্থ জীবনযাপন ও সুষম খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যা খাওয়া উচিত : ফাইব্রয়েড নিয়ন্ত্রণে ডায়েটারি ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার অত্যন্ত কার্যকর। ইস্ট্রোজেনের এন্টারোহেপাটিক রিসার্কুলেশন কমাতে সাহায্য করে এটি। ফলে দেহে ইস্ট্রোজেনের ভারসাম্য অটুট থাকে। খাদ্যতালিকায় তাই লাল চাল, গোটা গমের দানা থেকে তৈরি ভুসিযুক্ত আটা, ওটস, ডাল, শিম, ছোলা, মটরশুঁটি, ফলমূল এবং শাক-সবজি যোগ করা উচিত। অন্ত্রে বাস করা উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো বিটা-গ্লুকুরোনিডেজ এনজাইমের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সহায়ক। এর মাধ্যমে দেহে ইস্ট্রোজেন পুনঃশোষণের হার হ্রাস পায়।
এসব ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য ধরে রাখতে টক দই,ঘোল, প্রাকৃতিকভাবে ফারমেন্টেড খাবার (পান্তা, ফারমেন্টেড সবজি ও আচার), পেঁয়াজ-রসুন, চিয়া সিড, কাঁচ কলা গ্রহণ করা জরুরি। অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফল ও সবজি; যেমন—আমলকী, পেয়ারা, বেরি জাতীয় ফল (স্ট্রবেরি ও ব্লুবেরি), সাইট্রাস ফল (কমলা, লেবু), গাঢ় রঙের শাক-সবজি (পালংশাক, ব্রকোলি, লাল বাঁধাকপি), গাজর, মিষ্টি আলু, টমেটো, অ্যাভোকাডো, ডালিম, পেঁপে, সবুজ শাক ইত্যাদি ফাইব্রয়েড টিস্যুর অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সহায়ক। হলুদের কারকিউমিন, গ্রিন টির এপিগ্যালোকাটেচিন গ্যালেট এবং উদ্ভিজ্জ পলিফেনল শরীরে প্রদাহজনিত সাইটোকাইন নিঃসরণ কমিয়ে ফাইব্রয়েডের আকার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে।
জরায়ুর পেশির কোষ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে ভিটামিন ডি : ডিমের কুসুম, সামুদ্রিক মাছ ও ভিটামিন ডি-ফর্টিফাইড খাবার খাওয়ার মাধ্যমে দেহে পর্যাপ্ত ভিটামিন ডি গ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে। পেশির অযাচিত সংকোচন রোধ করে ব্যথা কমাতে সহায়ক ম্যাগনেসিয়াম। ম্যাগনেসিয়ামের প্রধান খাদ্য উৎস হলো গাঢ় সবুজ শাক-সবজি, বিভিন্ন বাদাম ও বীজ, ডাল ও শিম জাতীয় খাবার, হোল গ্রেইন শস্য, কলা ইত্যাদি।
ভিটামিন বি কমপ্লেক্স লিভারে ইস্ট্রোজেন ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। ভিটামিন বি কমপ্লেক্স পেতে মাংস, কলিজা,মাছ, ডিম,দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার (দই ও পনির), গোটা শস্য (বাদামি চাল ও লাল আটার রুটি) সবুজ শাক, পালংশাক, মটরশুঁটি, বাদাম, মাশরুম ইত্যাদি খাওয়া যেতে পারে।
ফাইব্রয়েডের প্রদাহ কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ খাবার; যেমন—তৈলাক্ত মাছ, তিসি, তিল, চিয়া সিড, বাদাম ইত্যাদি।
যা খাবেন না : অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত গরুর মাংস, মহিষের মাংস এবং খাসির মাংস ফাইব্রয়েড বৃদ্ধিকে উদ্দীপিত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভালো বিকল্প হতে পারে চামড়া ছাড়া মুরগির মাংস এবং বিভিন্ন মাছ, বিশেষত সামুদ্রিক ও তৈলাক্ত মাছ। বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার,পরিশোধিত শর্করা, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবার ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়িয়ে দেয়, যা পরোক্ষভাবে ইস্ট্রোজেন উৎপাদন বাড়াতে পারে।
জীবনযাপনে পরিবর্তন: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও অপর্যাপ্ত ঘুম হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বাড়িয়ে তুলতে পারে এবং ফাইব্রয়েডের লক্ষণগুলোকে আরো খারাপ করতে পারে। এ জন্য দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টা ঘুমের পাশাপাশি মেডিটেশন করা যেতে পারে। কার্ডিও ওয়ার্কআউট (হাঁটা,দৌড়ানো,সাঁতার কাটা ও সাইকেল চালানো) ভারোত্তোলন, পেলভিক ফ্লোর ব্যায়াম ইতাদি শরীরে হরমোনের ভারসাম্যকে উন্নত করার পাশাপাশি জরায়ুস্বাস্থ্যের উন্নতি করতে সাহায্য করে।
লেখক : টেকনিক্যাল অফিসার
২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
এজি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur