নতুন পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের নতুন পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন-পরিমার্জন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড । প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ,স্বাধীনতার ঘোষণা,পরবর্তী রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তথ্য নতুনভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের গুণমান উন্নত করা হয়েছে।

নতুন পাঠ্যবই পর্যালোচনায় দেখা যায়,ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম যুক্ত করা হয়েছে।

আগে এসব বইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করা ছিল। এছাড়া দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধ,১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান,’২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার পতন ও তার পলায়নের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে ।

এছাড়া বাংলা ও ইংরেজি বইয়েও কিছু পরিমার্জন করা হয়েছে। সংশোধিত পাঠ্যবইগুলো ১ জানুয়ারি থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে।

২০২৬ সালের অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের পর নেতৃত্বশূন্য পরিস্থিতিতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর ২৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পুনরায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তার এ ঘোষণা সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আশা ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করে।

সবাই স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে । যুদ্ধের প্রাথমিক প্রস্তুতি বিক্ষিপ্তভাবে শুরু হলেও ক্রমান্বয়ে এটি জনযুদ্ধে রূপ নেয়। কৃষক,শ্রমিক,ছাত্র,যুবকদের সঙ্গে সেনাবাহিনী,ইপিআর,পুলিশ ও আনসারে কর্মরত বাঙালি তথা সর্বস্তরের মানুষ এ যুদ্ধে অংশ নেয়। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এখানে শহীদ জিয়ার একটি ছবিও সংযোজিত হয়েছে।

নবম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ অংশেও একইভাবে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

এ অধ্যায়ের ২২ পৃষ্ঠায় দেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক অবদানের কথা তুলে ধরে বলা হয়,১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সরকার সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল প্রতিষ্ঠা করলে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থেমে যায়।

রাজনৈতিক অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু হয়।

এছাড়া কৃষি ও অর্থনীতিতে জিয়ার অবদানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে,খাল খনন, ফসল বহুমুখীকরণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থব্যবস্থায় রূপান্তরের মাধ্যমে শিল্প ও রপ্তানি খাতে গতি আসে, বিশেষ করে পোশাক শিল্পে।

এর আগে ২০১০ সালের পর থেকে পাঠ্যবইয়ে লেখা ছিল,১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ১২টা ২০ মিনিটে (২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে) পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার এ ঘোষণা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ওয়্যারলেস, টেলিফোন ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান,অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ও জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির অনুমোদনে এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে। উদ্দেশ্য—তরুণ প্রজন্মের সামনে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বাস্তব ও ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র উপস্থাপন করা এবং পাঠ্যবইকে ‘অতিরঞ্জিত ও চাপানো ইতিহাস’ থেকে মুক্ত রাখা।

এনসিটিবি কর্মকর্তারা বলছেন,নতুন শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে একাধিক পাঠ্যবই থেকে বাদ দেয়া হয়েছে শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ।

নবম ও দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে শেখ হাসিনার শাসনামলকে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের পর ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে বিরোধী দল ও ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন, দুর্নীতির বিস্তার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্বল করার অভিযোগ রয়েছে।

নতুন পাঠ্যবইয়ে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকেন্দ্রিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে পর্যায়ক্রমে এ আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, বিস্তার ও পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।

জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে বলা হয়েছে, ৩৬ দিনের আন্দোলনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হন, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল শিশু।

এবারের পাঠ্যবই সংস্কারের অংশ হিসেবে অষ্টম শ্রেণির সাহিত্য কণিকা বই থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ে ‘কার্টুন, ব্যঙ্গচিত্র ও পোস্টারের ভাষা’ শিরোনামের একটি পাঠে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের প্রতীকী উপস্থাপনা যুক্ত করা হয়েছে। এতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছোড়ার একটি কার্টুন চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়া একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ইংলিশ ফর টুডে পাঠ্যবইয়ের ‘হিস্টরি’ শিরোনামে চতুর্থ অধ্যায় থেকে শেখ মুজিবের ভাষণ বাদ দেয়া হয়েছে। আগে এখানে থ্রি স্পিচ এবং গ্রেট ওমেন শিরোনামে দুটি পাঠ ছিল,এবার সেখানে ‘জুলাই আপরাইজিং: এ ট্রান্সফরমেটিভ মুভমেন্ট’ শিরোনামে একটি পাঠ যুক্ত হয়েছে; যেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, ঘটনাপ্রবাহ,পতিত স্বৈরাচারের হত্যাযজ্ঞ, পলায়ন কাহিনী এবং জুলাই ঘোষণা বর্ণনা করা হয়েছে।

‘থ্রি স্পিচ’ পাঠের শিরোনাম পরিবর্তন করে করা হয়েছে ‘ট্রান্সফরমেটিভ স্পিচেস’। এ পাঠ থেকে শেখ মুজিবের ভাষণ বাদ দিয়ে শুধু মার্টিন লুথার ও নেলসন ম্যান্ডেলার ভাষণ রাখা হয়েছে।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের এসব পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিমার্জন করা হয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষের পুস্তকগুলো থেকে ‘জাতির পিতা’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’সহ নানা বিতর্কিত বিষয়ও বাদ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে গতকাল রাতে এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক জানান, বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ ও এনসিসিসির অনুমোদনের মধ্য দিয়েই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পাঠ্যবইগুলোর এ পরিমার্জন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদক : সরদার আনিছ
৯ জানুয়ারি ২০২৬
এ জি