চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার বদরপুর (বেলতলী) গ্রামে ঐতিহ্যবাহী গাউছে পাক শাহ্ সূফি সোলেমান লেংটার ১০৭তম ওরশ শরীফ উপলক্ষে উপজেলার ষাটনল ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ৫ বারের নির্বাচিত সফল মেম্বার মোঃ হারুন অর-রশিদের আস্তায় মিলাদ, কিয়াম,দোয়া ও ওরশ শরীফে আগত ভক্তবৃন্দদের মাঝে তাবারুক বিতরণ করা হয়েছে।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বাদ এশা মোঃ হারুন অর-রশিদের আস্তায় তার উদ্যোগে মিলাদ, কিয়াম,দোয়া ও ওরশ শরীফে আগত ভক্তবৃন্দদের মাঝে তাবারুক বিতরণ করা হয়।
মিলাদ মাহফিল ও দোয়া পরিচালনা করেন, বদরপুর হাজ¦ী বাড়ি জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা মোঃ শফিকুল ইসলাম। এসময় ষাটনল ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ৫ বারের নির্বাচিত সফল মেম্বার মোঃ হারুন অর-রশিদ, ছেংগারচর পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর বোরহান উদ্দিন প্রধান, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজ সেবক আহম্মদ উল্লাহ দর্জি, ছেংগারচর পৌর পরিষদের মাহাবুব আলম সরকার, ছেংগারচর বাজারের স্টুুডেন্ট লাইব্রেরীর মালিক আবুল সিকদারসহ গাউছে পাক শাহ্ সূফি সোলেমান লেংটার আশেকান ভক্তবৃন্দ এসময় উপস্থিত ছিলেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফী স্বাধক হযরত শাহ্ সোলেমান লেংটা (রহঃ) মেলা শুরু থেকে প্রতিদিনই মেম্বার মোঃ হারুন অর-রশিদের আস্তায় বিশেষ প্রার্তনা, তাবারুক বিতরণ, অধ্যাতিক গান,মিলাদ,কেয়াম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
প্রসঙ্গত বাংলার ওলী হযরত সৈয়দ সোলেমান শাহ্ লেংটা বাবা রহঃ আঃ এর পবিত্র মাজার শরীফ চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার সাদুল্যাপুর ইউনিয়নের বদরপুরের বেলতলীতে ৭ দিনব্যাপী গাউছে পাক হজরত শাহ্ সোলেমান লেংটা পাগলের মেলা শুরু হয় ৩১ মার্চ থেকে। ১৭ই চৈত্র বাৎসরিক ওরোছ মোবারক এবং মাসব্যাপী আসেকান পাগল স্বাধুদের মিলন মেলা। উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফী স্বাধক হযরত শাহ্ সোলেমান লেংটা (রহঃ)। তাঁর জীবন ও আদর্শকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর এখানে যে বিশাল ওরস শরীফ ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়, তা লোকজ সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
শুরু হওয়ার দুই দিনের মাথায় প্রশাসনিক ভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। ফলে বন্ধ রয়েছে গান,বাচনা। তাই প্রতিটি আস্তানায় মিলাদ,কিয়াম,বিশেষ প্রার্থনা করছেন সোলেমান রেংটার আশেকান ভক্তবৃন্দরা। তবে শাহ সুফি সোলেমান লেংটা পাগলের মেলায় এসে সোলেমান শাহ ল্যাংটার অনুকরণ করছে তার ভক্তরা। এবার পালিত হচ্ছে শাহ্ সোলেমান লেংটার ১০৭তম ওরশ শরীফ। মেলায় প্রতিদিন আশেকান ভক্তবৃন্দের সমাগম ঘটে। অসংখ্য ভক্ত ল্যাংটা বাবার মাজার জিয়ারত করছেন এবং জিকির আসকার করে ঢোল বাদ্য, বাজনা বাজিয়ে মাজার ত্যাগ করছেন। কারণ তাদের মতে, ল্যাংটা ফকির ছিলেন একজন ভালো মানুষ। মেলাকে ঘিরে শুরু থেকেই অসংখ্য পাগল ও ভক্তবৃন্দদের ভিড়ে মুখরিত হয়ে উঠেছে মতলবের বেলতলী। আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে এ মেলা।
হযরত শাহ্ সোলেমান লেংটা (রহঃ) ১৮২৫ সালে (মতান্তরে ১৮২০-এর দশকে) বর্তমান কুমিল্লা জেলার মেঘনা উপজেলার ওমরাবাদ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ছিল হযরত শাহ্ আলিম উদ্দিন। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছিলেন এবং জাগতিক বিলাসিতার প্রতি তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না।
আধ্যাত্মিক জীবন ও ‘লেংটা’ উপাধির রহস্যঃ
শাহ্ সোলেমান শাহ্ মূলত একজন মজ্জুব (আল্লাহর প্রেমে আত্মহারা) সাধক ছিলেন। সুফিবাদে ‘মজ্জুব’ বলা হয় তাদের, যার ¯্রষ্টার ধ্যানে এতটাই নিমগ্ন থাকেন যে নিজের দেহ বা পারিপার্শ্বিক জগত সম্পর্কে তাঁদের কোনো হুঁশ থাকে না।
বিবাগী জীবন: তিনি ঘরবাড়ি ত্যাগ করে বনে-জঙ্গলে এবং নির্জন স্থানে ধ্যানমগ্ন থাকতেন।
বসনহীনতা: লোকমুখে প্রচলিত যে, আধ্যাত্মিক স্তরের এক বিশেষ পর্যায়ে তিনি পোশাক-পরিচ্ছদ ত্যাগ করেন। তিনি মনে করতেন, অন্তরের আবিলতা দূর করাই আসল বিষয়, দেহের আচ্ছাদন সেখানে গৌণ। এই উদাসীন বা বিবাগী অবস্থার কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘লেংটা বাবা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
সাধনা: তিনি দীর্ঘ সময় মতলবের বেলতলী এলাকায় নির্জন স্থানে আস্তানা গেড়ে আল্লাহ্র ইবাদতে মগ্ন থাকতেন। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আধ্যাত্মিক শক্তির কথা দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. অলৌকিক ঘটনা ও কারামত-
ভক্তদের মতে, শাহ্ সোলেমান লেংটার জীবনে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা বা কারামত ঘটেছে। লোকগাঁথা অনুযায়ী:
তিনি বৃক্ষ বা প্রাণীর সাথে কথা বলতে পারতেন বলে অনেক অনুসারী বিশ্বাস করেন।
অসুস্থ ব্যক্তিদের আরোগ্য দান এবং মানুষের বিপদে আধ্যাত্মিক সাহায্যের অনেক গল্প এই অঞ্চলে প্রচলিত।
তিনি হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল ধর্মের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন, কারণ তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবেই ভালোবাসতেন।
৪. মৃত্যু ও সমাধি
এই মহান সাধক ১৯১৮ সালের চৈত্র মাসে (ইংরেজি হিসেবে ১৩২৫ বঙ্গাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন। মতলব উত্তর উপজেলার বেলতলী নামক স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর সেই স্থানটি ‘বদরপুর দরবার শরীফ’ বা ‘বেলতলী মাজার’ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে।
৫. বেলতলী মেলা ও ওরস শরীফ
প্রতি বছর শাহ্ সোলেমান লেংটার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চৈত্র মাসের ১৭ তারিখ থেকে বেলতলীতে বিশাল ওরস শুরু হয়। এই ওরসকে কেন্দ্র করে মাসব্যাপী মেলা চলে। শাহ্ সোলেমান লেংটার ওফাত দিবস উপলক্ষে গত ১০৭ বছর যাবত উদযাপিত হয়ে আসছে এ মেলা। স্থানীয়দের মতে বেলতলীর বদরপুর গ্রামে সোলেমান শাহ্ নামে এক ফকিরের মাজার আছে। এই মাজারই ল্যাংটা ফকিরের মাজার হিসেবে পরিচিত। প্রতি বছরে অসংখ্য ভক্তরাই লেংটার মেলার আয়োজন করে থাকেন। নামে লেংটা হলেও আদতে এখানে আসা পাগলেরা কেউই লেংটা নন। তবে তারা ভাবের পাগল।দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছোট-বড় লঞ্চ, ট্রলার, বাস, মিনি বাস, ট্রাক, মেক্সী, প্রাইভেটকার, সিএনজি, অটোবাইক যোগে ওরশে আসে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ লাখ মানুষ।
নিজস্ব প্রতিবেদক/
৪ এপ্রিল ২০২৬
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur