জাতীয়

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ থেকে যেভাবে সারাদেশে ছড়াচ্ছে করোনা

সারা দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ক্রমেই বাড়ছে। এক দিনে ৩১২ জন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় গতকাল রবিবার পর্যন্ত দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৫৬। আর এক দিনে নতুন সাতজনের মৃত্যু হওয়ায় মৃত ব্যক্তির মোট সংখ্যা হলো ৯১।

আক্রান্ত রোগী ঢাকা ও পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জেই বেশি। গত শনিবার পর্যন্ত একমাত্র ঢাকায়ই আক্রান্ত ছিল ৮৭৩ জন। আর ঢাকার বাইরে যেসব জেলায় করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তার মধ্যে বেশির ভাগ রোগীই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া।

এ বিষয়ে গতকাল দুপুরে করোনাভাইরাসসংক্রান্ত অনলাইন স্বাস্থ্য বুলেটিনে এসব তথ্য দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার নাসিমা সুলতানা। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে সারা দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, লকডাউন কাজ করছে না সেভাবে। আর লোকজন আক্রান্ত এলাকা থেকে ভালো এলাকায় যাচ্ছে। এতে নতুন লোক আক্রান্ত হচ্ছে।

গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত মৃত্যু এবং আক্রান্ত সম্পর্কে তথ্য জানানো হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে। এতে বলা হয়, একই সময়ে ৯ জন সুস্থ হয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে মোট ২৩ হাজার ৮২৫ জনের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে দুই হাজার ৪৫৬ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে মারা গেছে ৯১ জন। সুস্থ হয়েছেন মোট ৭৫ জন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পরীক্ষা সংখা বাড়াতে হবে, ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত ঘরে থাকতে হবে। একটু কষ্ট করে ঘরে থাকুন, তাহলে আমাদের জয় আসবেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বেড়ে যাচ্ছে। অক্সিজেন থেরাপির ওপর জোর দিতে হবে। সাড়ে তিন হাজার বোতল অক্সিজেনের অর্ডার দেওয়া হয়েছে। মজুদ আছে ১০ হাজার বোতল। আইসিইউর ফল ভালো পাওয়া যায়নি। ভেন্টিলেশনে রাখা ৯ জন রোগীর মধ্যে আটজনই মারা গেছে। ৮০ শতাংশ রোগী এমনিতেই ভালো হয়ে যায়। ১৫ শতাংশের হাসপাতালের সামান্য পরিচর্যা প্রয়োজন। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে বাইরে গিয়ে আক্রান্তের হার বাড়াচ্ছে।

বুলেটিনে জানানো হয়, শেষ ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হওয়া ৩১২ জনের মধ্যে ৬৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৪ শতাংশ নারী। ঢাকার ৪৪ শতাংশ, নারায়ণগঞ্জে ৩১ শতাংশ, বাকি ২৫ শতাংশ অন্যান্য জেলার। এ ছাড়া শেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া সাতজনের মধ্যে পাঁচজন পুরুষ এবং দুই জন নারী। তাদের মধ্যে তিনজন ঢাকার এবং চারজন নারায়ণগঞ্জের। এ ছাড়া মোট ৬৪০ জন আইসোলেশনে এবং ৫১ হাজার ১৬১ জন কোয়ারেন্টিনে আছে।

রোগী বেশি চিহ্নিত হওয়ায় গত ৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জকে লকডাউন ঘোষণা করে স্থানীয় প্রশাসন। কিন্তু এর পরও এ জেলা থেকে লোকজন পালিয়ে অন্য জেলায় (নিজ এলাকা) যাচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে তারা। এর মধ্যে গত শনিবার রাতে ট্রাকে করে সুনামগঞ্জ যাওয়ার সময় স্থানীয় প্রশাসন ফতুল্লায় ৪৬ জনকে আটক করে। এরপর তাদের আগের জায়গায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন পথে মানুষ নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা ছাড়ছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিদিনই পোস্ট দিচ্ছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেও গতকাল ঢাকা থেকে ট্রেনে করে প্রায় ৫০ জন সিলেটে গেছে। তারা কিভাবে গেল, তা নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে প্রশাসন।

রাজধানীতে যেসব এলাকায় করোনা রোগী শনাক্ত : আদাবরে পাঁচজন, আগারগাঁওয়ে পাঁচজন, আরমানীটোলায় একজন, আশকোনায় একজন, আজিমপুরে ১৩ জন, বাবুবাজারে ১১ জন, বাড্ডায় আটজন, বেইলি রোডে তিনজন, বনানীতে আটজন, বংশালে ১৬ জন, বানিয়ানগর একজন, বাসাবো ১৭ জন, বসুন্ধরায় ছয়জন, বেগুনবাড়ীতে একজন, বেগমবাজারে একজন, বেড়িবাঁধে একজন, বকশীবাজারে একজন, বছিলায় একজন, বুয়েট ক্যাম্পাস এলাকায় একজন, ক্যান্টনমেন্টে একজন, সেন্ট্রাল রোডে একজন, চানখাঁরপুলে সাতজন, চকবাজারে ১২ জন, ঢাকেশ্বরীতে একজন, ডেমরায় তিনজন, ধানমণ্ডিতে ২১ জন, ধোলাইখালে একজন, দয়াগঞ্জে একজন, ইস্কাটনে একজন, ফরিদাবাদে একজন, ফার্মগেটে একজন, গেণ্ডারিয়ায় ১৬ জন, গোরানে একজন, গোপীবাগে তিনজন, গ্রিন রোডে ১০ জন, গুলিস্তানে তিনজন, গুলশানে ১৪ জন, হাতিরঝিলে একজন, হাতিরপুলে তিনজন, হাজারীবাগে ১৬ জন, ইসলামপুর দুজন, জেলগেটে দুজন, যাত্রাবাড়ীতে ২৫ জন, ঝিগাতলায় পাঁচজন, জুরাইনে তিনজন, কল্যাণপুরে দুজন, কামরাঙ্গীর চরে চারজন, কাজীপাড়ায় তিনজন, কারওয়ান বাজারে একজন, কচুক্ষেতে একজন, খিলগাঁওয়ে দুজন, খিলক্ষেতে একজন, কলতাবাজারে একজন, কদমতলীতে দুজন,

কোতোয়ালিতে চারজন, কুড়িলে একজন, লালবাগে ২৩ জন, লক্ষ্মীবাজারে পাঁচজন, মালিটোলায় একজন, মালিবাগে চারজন, মানিকদীতে একজন, মাতুয়াইলে একজন, মিরহাজারীবাগে দুজন, মিরপুর-১-এ আটজন, মিরপুর-৬-এ তিনজন, মিরপুর-১০-এ সাতজন, মিরপুর-১১-এ ১৩ জন, মিরপুর-১২-তে ১১ জন, মিরপুর-১৩-তে দুজন, মিরপুর-১৪-তে ছয়জন, মিটফোর্ডে ২৬ জন, মগবাজারে ১১ জন, মহাখালীতে ১২ জন, মোহনপুর একজন, মোহাম্মদপুর ৩৪ জন, মতিঝিলে একজন, মুগদায় তিনজন, নবাবপুরে একজন, নবাবগঞ্জে দুজন, নারিন্দায় তিনজন, নাখালপাড়ায় পাঁচজন, নিমতলীতে চারজন, নিকুঞ্জতে একজন, পীরেরবাগে দুজন, পুরানা পল্টনে দুজন, রাজারবাগে ১৩ জন, রামপুরায় চারজন, রমনায় পাঁচজন, রায়েরবাগে একজন, রাজাবাজারে একজন, রায়েরবাজারে একজন, সবুজবাগে দুজন, সদরঘাটে একজন, সায়েদাবাদে একজন, সায়েন্সল্যাবে একজন, শাহআলীবাগে দুজন, শাহবাগে ছয়জন, শাঁখারীবাজারে ১০ জন, শান্তিবাগে একজন, শ্যামপুরে একজন, শান্তিনগরে আটজন, শ্যামলীতে সাতজন, শেওড়ারাপাড়ায় একজন, শেখেরটেকে একজন, সোয়ারীঘাটে তিনজন, সিদ্ধিশ্বরীতে তিনজন, শনিরআখড়ায় একজন, সূত্রাপুরে ৯ জন, তেজগাঁওয়ে ১৬ জন, তেজতুরী বাজারে একজন, টোলারবাগে ১৯ জন, উর্দুরোডে একজন, উত্তরায় ২৩ জন, ভাটারায় একজন এবং ওয়ারীতে ২৮ জন।

দেশজুড়ে গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জ ভীতি : রাজধানীর পর দেশে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের ‘বিপদসংকুল’ এলাকা নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর। এই দুই জেলা আবার শ্রমিক অধ্যুষিত। করোনা ভয়ে এই দুই জেলার শ্রমিকরা যে যেভাবে পারছেন পালিয়ে নিজেদের ঘরে ফিরতে চাইছেন। তাঁরা নিজ এলাকায় ফিরে আবার করোনা ভীতি ছড়াচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর থেকে শ্রমিক আসার খবর পেলেই সংশ্লিষ্ট এলাকা লকডাউন করে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পাঠানো হচ্ছে হোম কোয়ারেন্টিনে। এ ব্যাপারে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) : ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে কুড়িগ্রামের গ্রামের বাড়িতে মানুষ ফিরছে নানা ব্যতিক্রমী কৌশলে। জরুরি ওষুধ, খাদ্যসামগ্রী বহনকারী ট্রাক, পিকআপ ও কাভার্ড ভ্যান গাড়িতে ‘পণ্যসামগ্রী’ হয়ে ফিরছে তারা।

রাজীবপুর বটতলা বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করা ১৫ জনের এক শ্রমিকদলের সঙ্গে। তাঁরা একটি পিকআপ ভ্যানে এসে নামলেন বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু দূরে। ওই শ্রমিকদের বাড়ি চিলমারীর ব্রহ্মপুত্র বিচ্ছিন্ন করইবইশাল চরজনপদে।

ওই শ্রমিকদলের একজন শামসুর রহমান জানান, লকডাউনের মধ্যে চৌরাস্তা থেকে পণ্যবাহী পিকআপে আসার কাহিনী। এ জন্য তাঁদের দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পিকআপ মালের ওপর আমাদের শুয়ে থাকতে বলে চালক। গাড়ির শেষের দিকে মালের বস্তা দিয়ে আমাদের ভেতরে ফেলা হয়। তারপর মোটা এক ধরনের প্লাস্টিক কাগজ দিয়ে ঢেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে দিয়ে আমাদের পণ্য বানিয়ে ফেলা হয়। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নাই যে ওই গাড়িতে আমরা আছি। রাস্তায় অনেক স্থানে গাড়ি দাঁড় করিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু জরুরি খাদ্যসামগ্রীর কথা বলে চালক আমাদের নিয়ে আসে। এতে আমাদের কষ্ট হয়েছে তার পরও তো আসতে পেরেছি।’

নারায়ণগঞ্জ : ৪৬ যাত্রীসহ ফতুল্লা থেকে সুনামগঞ্জগামী একটি ট্রাক গত শনিবার রাতে জব্দ করেছে পুলিশ। পরে সব যাত্রীকে নিজ নিজ স্থানে ফেরত পাঠানো হয়।

বার্তা কক্ষ, ২০ এপ্রিল ২০২০

Share