রোজা আত্মসংযমের বিজ্ঞান,রোজা ধৈর্যের সর্বোচ্চ অনুশীলন। মানুষ যখন নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং আল্লাহর আদেশে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও কামনা-বাসনা সংযম করে তখন সে শুধু একটি ইবাদত পালন করে না; বরং নিজের নফসকে শাসন করার মহড়া দেয়। রোজাদার দিনের পর দিন বৈধ খাদ্য থেকেও দূরে থাকে,অথচ কেউ তাকে বাধ্য করে না। এ আত্মনিয়ন্ত্রণই ধৈর্যের চূড়ান্ত রূপ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দেওয়া হবে হিসাব ছাড়া। আবার তিনি আহবান করেন ‘হে প্রশান্ত আত্মা,তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে।’ রোজা সেই প্রশান্ত আত্মা গঠনের কারখানা। ক্ষুধা মানুষকে দুর্বল করে, কিন্তু রোজা মানুষকে দুর্বলতার ভেতর শক্তির সন্ধান দেয়।
তৃষ্ণা মানুষকে অস্থির করে, কিন্তু রোজা তাকে সংযমের গভীর শিক্ষা দেয়। কামনা-বাসনা মানুষের বিবেককে আচ্ছন্ন করে,কিন্তু রোজা সেই পর্দা সরিয়ে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে। একজন রোজাদার যখন রাগ সংবরণ করে তখন সে শুধু ঝগড়া এড়িয়ে যায় না, বরং নিজের চরিত্রকে উন্নত করে। যখন সে অন্যায় থেকে দূরে থাকে তখন সে শুধু পাপ এড়িয়ে যায় না, বরং আত্মাকে আলোকিত করে।
রোজা মানুষকে শেখায় প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থির থাকতে। এই স্থিরতা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগণিত ফল বয়ে আনে। ব্যক্তিগত জীবনে রোজা আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে, কারণ সে প্রমাণ করে যে মানুষ নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। পারিবারিক জীবনে রোজা সহনশীলতা বাড়ায়, কারণ ক্ষুধার মধ্যেও যে ধৈর্য ধারণ করতে পারে সে সম্পর্কের টানাপোড়েনও সামলাতে পারে। সামাজিক জীবনে রোজা ন্যায়বোধ জাগ্রত করে, কারণ ক্ষুধা অনুভব করে মানুষ দরিদ্রের কষ্ট বুঝতে শেখে।
অর্থনৈতিক জীবনে রোজা অপচয় কমায়, কারণ সংযমের অভ্যাস তাকে মিতব্যয়ী করে তোলে। আধ্যাত্মিক জীবনে রোজা হৃদয়কে কোমল করে, কারণ দীর্ঘ সিয়ামে আত্মা আল্লাহর দিকে অধিক মনোযোগী হয়। রোজা মানুষকে সময়ের মূল্য শেখায়, কারণ নির্দিষ্ট মুহূর্তে সাহরি ও ইফতার তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে। রোজা মানুষকে নীরব শক্তি দেয়,কারণ সে জানে তার ত্যাগ কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন। এই অনুভূতি তাকে অন্তর্গত মর্যাদা দেয়। ধৈর্যের চর্চা মস্তিষ্কের স্থিরতা বৃদ্ধি করে, মনকে প্রশান্ত করে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিপক্বতা আনে। একজন রোজাদার দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায় না,বরং বিবেচনা করে কথা বলে। ফলে তার সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
রোজা মানুষকে কৃতজ্ঞ করে তোলে,কারণ সে উপলব্ধি করে এক গ্লাস পানির মূল্য। কৃতজ্ঞ হৃদয় কখনো অহংকারী হয় না। ধৈর্যশীল হৃদয় কখনো হঠকারী হয় না। সংযমী আত্মা কখনো সীমা লঙ্ঘন করে না। তাই রোজার ফল শুধু পরকালে সীমাবদ্ধ নয়,দুনিয়ায়ও এর অগণিত ফল দৃশ্যমান। কর্মক্ষেত্রে রোজাদার অধিক মনোযোগী হয়, কারণ সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিখেছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সে অধ্যবসায়ী হয়,কারণ ধৈর্য তাকে স্থায়িত্ব দেয়। সমাজে সে বিশ্বাসযোগ্য হয়, কারণ সংযম তাকে নৈতিক শক্তি দেয়।
আখিরাতে তার জন্য রয়েছে সীমাহীন পুরস্কার, কারণ ধৈর্যশীলদের প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে নির্ধারণ করেন। রোজা শেষ হলে যদি মানুষের ভেতর এই ধৈর্য স্থায়ী হয়, তবে সে সত্যিই প্রশান্ত আত্মার পথে অগ্রসর হয়। সেই আত্মাকেই একদিন বলা হবে ‘হে প্রশান্ত আত্মা ফিরে যাও তোমার প্রতিপালকের দিকে সন্তুষ্ট ও সন্তোষজনক হয়ে।’ এ আহবান লাভই রোজার সর্বোচ্চ রেজাল্ট আর এর চেয়ে বড় সাফল্য মানুষের জন্য কল্পনাতীত। রোজা ধৈর্যের সর্বোচ্চ অনুশীলন, এ সত্য শুধু আধ্যাত্মিক নয়,বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। দীর্ঘ সময় খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকা মানুষের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করে, যা আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে,সংযম চর্চা করলে ডোপামিনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রিত হয়, ফলে তাৎক্ষণিক তাড়না কমে এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনের ক্ষমতা বাড়ে।
নিয়মিত রোজা রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ উন্নত করে, ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়ায় এবং অটোফেজি প্রক্রিয়া সক্রিয় করে, যা কোষ পুনর্গঠনে সহায়তা করে। বাস্তব জীবনে আমরা দেখি, রোজাদার ব্যক্তি অধিক স্থির, সহনশীল ও মনোসংযোগী হয়ে ওঠে।
অতএব, রোজা আত্মিক পরিশুদ্ধির পাশাপাশি স্নায়বিক ও শারীরিক ভারসাম্য গঠনের এক কার্যকর অনুশীলন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক,সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ,ময়মনসিংহ এবং শিক্ষাবিদ, গবেষক ও ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক লেখক
মার্চ ২, ২০২৬
এ জি
Chandpur Times | চাঁদপুর টাইমস Top Newspaper in Chandpur