শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে শিক্ষা খাত। এ জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রাক্কলন করা হচ্ছে। দুই খাত মিলিয়ে মোট বরাদ্দ দাঁড়াচ্ছে ৯২ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের চেয়ে ৯ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা বেশি।
অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের সম্ভাব্য ব্যয়সীমার মধ্যে শিক্ষা খাতকে শীর্ষে রাখা হচ্ছে। সর্বোচ্চ ব্যয়ের ১০টি খাতের জন্য মোট ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এসব খাতে বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ ২৭ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে এই খাতগুলোতে মোট বরাদ্দ বাড়ছে ৩০ হাজার ১৭০ কোটি টাকা। এই তালিকায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। এ বিভাগের বরাদ্দ ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকার প্রাক্কলন করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৭ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা। ফলে আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে ২ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।
জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে রাখা হচ্ছে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩১ হাজার ২২ কোটি টাকা। ফলে আগামী অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার বিভাগে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪২ হাহজার ৪৩৩ কোটি টাকা। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে রাখা হচ্ছে ৪৩ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। শীর্ষ বরাদ্দ দেওয়া অন্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে
৪২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৪২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ৩৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ৩১ হাজার ১০ কোটি টাকা এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ে ২৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগে জন্য ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৮ হাজার ৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রাক্কলন করা হয়েছে।
জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের বরাদ্দ চলতি অর্থবছরের চেয়ে কমানো হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ২০ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। আগামী অর্থবছরে ১ হাজার ৯৮ কোটি টাকা কমিয়ে ১৯ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পেছনে সরকারের একটি বড় পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য সংস্কারের অংশ হিসেবে ‘ই-হেলথ কার্ড’ এবং ‘জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই দুটি উদ্যোগকে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য খাতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ করে আসছে। ফলে জনগণের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয় বহনের হার অনেক বেশি। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বড় আকারে বরাদ্দ বৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত। ই-হেলথ কার্ড ও জাতীয় স্বাস্থ্যবীমার মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়বে এবং ব্যয় কাঠামো আরও স্বচ্ছ হবে। তাদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং এই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয় নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি ও অপচয় নিয়ন্ত্রণ করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জানা গেছে, বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়ন ব্যয় কমানোর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। দেশে মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার ৭৩৮ মেগাওয়াট হলেও প্রকৃত চাহিদা ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান অবকাঠামোর দক্ষ ব্যবস্থাপনার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১০ শতাংশ কমিয়ে ভর্তুকির চাপ কমানোর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে, যা বাজেট বরাদ্দে প্রভাব ফেলেছে। এ ছাড়া বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটে গ্যাস, কয়লা ও তেল আমদানিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এর ফলে নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেয়ে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রাহকের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
৯ মে ২০২৬
এ জি