শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আজ

মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের এ দেশীয় দোসর আলবদর ও আলশামস বাহিনীর গুপ্তঘাতকেরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল দেশের কৃতী সন্তান বুদ্ধিজীবীদের। ৯ মাসের যুদ্ধের শেষ দিকে বাঙালি জাতি যখন আসন্ন বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত, ঠিক সেই মুহূর্তে বাঙালির মেধা ও মননকে ধ্বংস করার জঘন্য তৎপরতায় মেতে ওঠে গুপ্তঘাতকেরা।

১৯৭১ সালের ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে কেবল ঢাকা শহরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী-সাহিত্যিকসহ প্রায় দেড় শ বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীকে অপহরণ করে প্রথমে মোহাম্মদপুরে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। কাউকে কাউকে অবশ্য কয়েক দিন আগেই তুলে নেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে চামেলীবাগের বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল ১০ ডিসেম্বর গভীর রাতে। অপহরণ করা বুদ্ধিজীবীদের পরে রায়েরবাজার ও মিরপুরে বধ্যভূমিতে নিয়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে, গুলি করে হত্যা করা হয়।

একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নিধনযজ্ঞ শুরু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষকদের হত্যার মধ্য দিয়ে। পরে দেশব্যাপী গণহত্যার পাশাপাশি মেধাবী বাঙালিদের বেছে বেছে হত্যা করা হচ্ছিল। ঢাকায় তখনকার মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড একাত্তরের ২৮ মার্চ ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ শিরোনামে যে গোপন তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে—তাতে উল্লেখ ছিল, খতম করার জন্য যাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছাড়া আছেন ছাত্রনেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। যুদ্ধের শেষ দিকে পরাজয় অনিবার্য জেনে হানাদার বাহিনী ও সহযোগীরা ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী নিধন করছিল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। তবে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত ছিল। মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীর নীলনকশা অনুযায়ী বাছাই করা বুদ্ধিজীবীদের হত্যার কাজটি করেছিল আলবদর ও আলশামস। কিছু রাজাকারও ছিল সঙ্গে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর বিদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা রায়েরবাজার বধ্যভূমি পরিদর্শন এবং প্রত্যক্ষদর্শী ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

বধ্যভূমিতে পড়ে থাকা বুদ্ধিজীবীদের লাশের ছবিসহ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ওই সব সংবাদমাধ্যমে। ৩০ ডিসেম্বর ১৯৭১ দ্য টাইমস-এ ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কেউ কখনো জানবে না তাঁদের সংখ্যা কত—বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার, সাংবাদিক ও যুবক, যাঁদের অধিকাংশই কখনো রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না, চিরতরে নিরুদ্দিষ্ট হওয়ার আগে যাঁদের তাড়া করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং জড়ো করা হয়েছে। বড় গর্তগুলোর পাশে যেখানে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের গলিত দেহ আবিষ্কৃত হয়েছে, সেখানে স্বামীর দেহটি শনাক্ত করতে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার পাশার স্ত্রী মোহসিনা পাশা। আত্মসমর্পণের দুদিন আগে আরও অনেকের মতোই অধ্যাপক পাশাকে তুলে নেওয়া হয় এবং পাঠানো হয় এই বধ্যভূমিতে। তাঁর আরও দুজন সহকর্মী—ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক রাশীদুল হাসান এবং ইতিহাসের অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্যকেও সেই সকালেই রাজাকারদের একই দল বাসা থেকে ধরে নিয়ে আসে। পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীরা বলে যাচ্ছেন, এই নৃশংসতা সম্পর্কে তাঁদের কিছুই জানা নেই। কিন্তু এখন সাক্ষ্য উঠে আসছে যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশেই রাজাকাররা দায়িত্ব পালন করেছে। একটি পত্রে একজন ভিকটিমের নাম ছিল নিজামউদ্দিন, পাশে মন্তব্য “উদ্দেশ্যপ্রবণ কাহিনি’’, নিজামউদ্দিনের নামের পাশে কাটা দাগ।’

দ্য সানডে টাইমস ১৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে ‘আত্মসমর্পণের আগে…’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় বৃহস্পতিবার আত্মসমর্পণের আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শহরের বুদ্ধিজীবী, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করেছে এবং তাঁদের মধ্যে পঞ্চাশেরও বেশি লোককে গুলি করে হত্যা করেছে। আকস্মিক সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে নিবিড় পরিকল্পনার আওতায় বাঙালি এলিট নিধনের অংশ হিসেবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এটা অবশ্যই কমান্ডিং অফিসার জেনারেল নিয়াজিসহ পাকিস্তানের হাইকমান্ডের পূর্ণ জ্ঞাতসারে ঘটেছে। নিকোলাস টোমালিন লিখেছিলেন, ‘ঢাকার মূল শহরের পাশে রায়েরবাজারে কতগুলো বিচ্ছিন্ন গর্তে বুদ্ধিজীবীদের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। আমি নিজে ৩৫টি গলিত দেহ দেখেছি। আপাতদৃষ্টে মনে হয়, তারা চার-পাঁচ দিন আগে নিহত হয়েছেন। মৃত মানুষের সংখ্যা সম্ভবত আরও বেশি হবে। ঢাকায় অপহরণ করা এ ধরনের লোকের সংখ্যা অন্তত ১৫০ হতে পারে।’

গুম-খুন হওয়া বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আরও আছেন অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. মোহাম্মদ মোর্তুজা, ডা. মোহাম্মদ শফি, সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার, নিজামউদ্দিন আহমদ, খোন্দকার আবু তালেব, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, ড. আবুল খায়ের, ড. সিরাজুল হক খান, ড. ফয়জুল মহী, ডা. আলীম চৌধুরী প্রমুখ।

জাতিকে চিরকালের জন্য মেধাহীন ও পঙ্গু করে দেওয়ার অশুভ উদ্দেশ্যেই হানাদার ও দোসররা পরাজয়ের আগমুহূর্তে সারা দেশে সহস্রাধিক বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে। ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কালো সোয়েটার ও খাকি প্যান্ট পরা আলবদর সদস্যরাই যুদ্ধের শেষ তিন রাতে বুদ্ধিজীবীদের তুলে নিয়ে যায়। ধরা পড়া আলবদর সদস্যরা পরে জানিয়েছে, স্বাধীনতা ও সেক্যুলার রাষ্ট্র গড়ার আন্দোলনের সমর্থক বাঙালি সব বুদ্ধিজীবীকে নির্মূল করাই ছিল তাদের লক্ষ্য।

বার্তা কক্ষ, ১৪ ডিসেম্বর ২০২২

Share