জাতীয়

করোনা সংকটে এবার শহর ছাড়ছেন মধ্যবিত্তরা

করোনার প্রভাবে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড একরকম স্থবির। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, আয় কমেছে ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষের। কমেছে ভোগ ও বিনিয়োগ দুটিই। এতে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত। এই শ্রেণির অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন অথবা কমিয়ে দেয়া হয়েছে বেতন। অন্যান্য উৎস থেকেও কমে গেছে আয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংসারের খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।

অন্যদিকে নিম্ন আয়ের লোকজন সরকার ও বিত্তবানদের কাছ থেকে নানা ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা পেয়েছেন এবং এখনও তা অব্যাহত আছে। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতার কারণে মধ্যবিত্তের পক্ষে সেটা নেয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি তাদের সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে কার্যকর অর্থে কোনো পক্ষই (সরকার ও বিত্তবান) এগিয়েও আসছে না। বাধ্য হয়েই তাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাচ্ছেন।

শুধু দেশেই নয়, প্রবাসে যারা কাজ করতেন, তাদের বড় অংশ কাজ হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। এরাও বড় সংকটে পড়েছেন। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের আঘাতে রীতিমতো ‘চিড়েচ্যাপ্টা’ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। পরিস্থিতি উত্তরণ না হওয়া পর্যন্ত মধ্যবিত্তদের জন্যও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মধ্যবিত্তদের অবস্থা শোচনীয়। মানুষের আয় বন্ধ হয়েছে, অথবা কমেছে। এ অবস্থা উত্তরণে খুব বেশি কিছু করার নেই। আপাতত এদেরকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনতে হবে। এজন্যই আমরা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে বলেছিলাম। এই কর্মসূচির মাধ্যমেই কাজ হারানো মানুষকে সাপোর্ট দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ২ থেকে ৩ মাসে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে কীভাবে মানুষ আগের কাজে ফিরে যেতে পারে, সেজন্য চেষ্টা করতে হবে। তার মতে, পরিস্থিতির কারণে মধ্যবিত্তদের কিছুটা কষ্ট মেনে নিতে হবে। কারণ তাদের আয় বাড়ানোর পথ নেই।

রাষ্ট্রীয়ভাবে মধ্যবিত্তদের সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। তবে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যাদের দৈনিক আয় ১০ থেকে ৪০ ডলারের মধ্যে, দেশে তারাই মধ্যবিত্ত। এ হিসাবে মধ্যবিত্তদের মাসিক আয় ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে। তবে এটি শুধু বেতনের মাধ্যমে আয় হতে হবে, এমন নয়। যে কোনোভাবে আয় করে যারা এ ধরনের একটি সামাজিক মর্যাদা তৈরি করেছেন, তারাই মধ্যবিত্ত। এক্ষেত্রে শিক্ষার হার বিবেচনা এবং গ্রাম ও শহরে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।

গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকেই অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব পড়তে শুরু করে। মানুষের চলাচল কমে যায়। কেনাবেচা স্থবির হয়ে পড়ে। কমতে থাকে মানুষের আয়। প্রথমদিকে মধ্যবিত্তের ওপর তেমন প্রভাব পড়েনি। কিন্তু সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় আক্রান্ত হতে থাকে তারা।

এই মুহূর্তে মধ্যবিত্ত গভীর সংকটে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে দেশে মধ্যম আয়ের লোকের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। এর মধ্যে ঢাকা শহরে আছে প্রায় ৮০ লাখ। এরা নিজেদের আয় দৈনন্দিন খরচসহ সন্তানদের পড়াশোনা, ভ্রমণ, বিনোদন, চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচগুলো মিটিয়ে কিছু সঞ্চয়ও করতে পারে। এদের একটি বড় অংশ ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আরকেটি অংশ চাকরিজীবী।

অপর একটি অংশ পৈতৃক সূত্রেই অর্জিত সম্পদ দেখভাল করে জীবিকানির্বাহ করছেন। এ তিনটি শ্রেণিই এখন সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে যারা ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের একটি অংশ পণ্য উৎপাদন করে বিপণনের মাধ্যমে আয় করে, আরেকটি অংশ দোকানে সেগুলো বিক্রি করে।

আবার একটি অংশ আছে পণ্যের জোগানে কাজ করে। এরা সবাই এখন আক্রান্ত। উৎপাদকরা আগের মতো পণ্য বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন কমে গেছে। মানুষের আয় কমে যাওয়ায় পণ্য বিক্রিও হচ্ছে কম। ফলে বিক্রেতাদের আয় কমে গেছে। মাঝপথে সমস্যা তৈরি হয়েছে জোগানেও। তারাও এখন জটিলতায় পড়েছে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটিতে বাস করেন আরাফাত হোসেন। তিনি প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে করে নতুন ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তিনজন কর্মী নিয়োগ দিয়েছিলেন। প্রত্যেকের বেতন ছিল ২০ হাজার টাকা করে। শুরুর তিন মাসের মাথায় এলো করোনার ধাক্কা। এপ্রিলে কর্মী যাচাই করেছেন। এখন নিজে দোকান চালান। বেচাকেনা নেই। ভাড়া দিতে পারছেন না। এখান থেকে অর্জিত আয়ে তার সংসার চলত। এখন কোনো আয় নেই। পুঁজি ভেঙে খাচ্ছেন।

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, এভাবে কত দিন চলতে পারব, আল্লাহই জানেন। মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশ বেসরকারি চাকরিজীবী। যারা বেতনের ওপর নির্ভর করেই জীবিকানির্বাহ করেন। এই অংশটিও এখন সংকটে। কেননা বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে। অনেকে বেতন কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে বাধ্য হয়ে মধ্যবিত্তের এ অংশটি এখন ব্যয় কমাচ্ছে।

একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন মনোয়ারুল ইসলাম। স্ত্রী-সন্তানসহ চারজনের সংসার ভালোই চলছিল। আগে নিয়মিত পেলেও করোনার ধাক্কায় মে মাসে বেতন কমে যায়। জুনে তাকেসহ ৪৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এখন সামনে অন্ধকার দেখছেন।

ঢাকা শহরে বসবাসকারীদের ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে তারা একটি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলেছে। এতে দেখা যায়, ঢাকা শহরে প্রায় বহুতল বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে ৬০ লাখ মানুষের। এর মধ্যে ভাড়া থাকেন ১ কোটি ২০ লাখ লাখ মানুষ। এদের অধিকাংশই মধ্যবিত্তের মধ্যে পড়েন। যেসব মধ্যবিত্তের বাড়ি, গাড়ি, মার্কেটে দোকানের মালিকানা রয়েছে, তারাও এখন সংকটে। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরি, ফ্ল্যাট বা গাড়ি কিনেছেন।

সব দিকে আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই এখন বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে পারছেন না। বিভিন্ন ধরনের পরিবহন থেকেও আয় আসছে অনেক কম। অন্য যেসব সম্পদ রয়েছে, সেগুলো থেকেও আয় কমে গেছে।

ফলে এ অংশটিও এখন সংকটে পড়েছে। টিকাটুলি এলাকার আসিফ শওকত জানান, তাদের বাসার ভাড়া থাকতেন দোকানে চাকরি করেন এমন কয়েকজন। দুই মাস ধরে তারা ভাড়া দিতে পারছেন না। কিন্তু তাদের বাসা ছাড়তেও বলতে পারছেন না। তারা বাসা ছেড়ে দিলে নতুন করে ভাড়া দেয়া যাবে না। ফলে তাদের ভাড়া ছাড়াই এখন রাখা হচ্ছে।

মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ সঞ্চয় করে থাকেন। সেগুলো ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রে জমা করেন। কেউ কেউ বিনিয়োগ করেছেন শেয়ারবাজারেও। কিন্তু শেয়ারবাজারের অবস্থা খুবই শোচনীয়। ওখান থেকে আয় তো দূরের কথা, প্রতিনিয়ত পুঁজি হারাচ্ছেন। সঞ্চয়পত্র থেকে নিয়মিত আয় এলেও নতুন করে কেনা যাচ্ছে না। ফলে মেয়াদ পূর্তির পর তাদের আয়ে ভাটা পড়বে।

কেননা সরকারি বিধিনিষেধের কারণে এগুলোয় বিনিয়োগ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ব্যাংকেও মুনাফার হার কমিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে সঞ্চয় থেকে আয়ের পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখনও পরিবেশ প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে টিকে আছে।

তবে কতদিন টিকে থাকতে পারবে, সেটা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, পরিস্থিতি খুবই খারাপ। এই অবস্থা উত্তরণের একটি উপায় আছে, আর তা হল অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আর অর্থনীতি কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কারণ অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দরকার ভোগ ও বিনিয়োগ। কিন্তু করোনা নিয়ন্ত্রণে না এলে কেউ বিনিয়োগও করবে না এবং কেনাকাটাও করবে না। ফলে সবার আগে করোনা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ জোর দেয়া উচিত।

এদিকে সরকারি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে করোনাভাইরাসের প্রভাবে চাকরি হারিয়েছেন প্রায় ১৩ শতাংশ মানুষ। আয় কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষের। সম্প্রতি ব্র্যাকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনার প্রভাবে ৩৬ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। তিন শতাংশের চাকরি থাকলেও বেতন পান না। এদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত।

এদিকে প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংস্থা রামরু বলছে, ১ কোটি প্রবাসীর মধ্যে, ইতোমধ্যে ৬ থেকে ৭ লাখ প্রবাসী কাজ হারিয়েছেন। কাজ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন আরও কয়েক লাখ। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও রিপোর্টে বলা হয়েছে, করোনার কারণে বিশ্বে ৩৩ কোটি মানুষের আয় কমেছে। এটি বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় বেশি প্রভাব পড়ছে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মধ্যবিত্ত খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তাদের আয় বাণিজ্য বন্ধ। অনেকে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। এ অবস্থা তাদের আয় বাড়াতে করোনার পরিস্থিতি উত্তরণ জরুরি। তাই করোনা নিয়ন্ত্রণকে সবার আগে গুরুত্ব দেয়া উচিত। এর আগে তাদেরকে টিকে থাকার জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নগদ সহায়তা দেয়া যেতে পারে। এজন্য মন্ত্রণালয়ভিত্তিক উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তবে যত তাড়াতাড়ি করোনা নিয়ন্ত্রণে এনে অর্থনীতি চালু করা যায়, সেটিই হবে মধ্যমেয়াদি কৌশল।

মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ যে এ মুহূর্তে সহযোগিতা পেতে যে উন্মুখ হয়ে আছে, তা একটি ঘটনায় বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। করোনার সংক্রমণের পর শুরুতে মৈত্রী সংঘ মীরপুর এলাকায় দরিদ্রদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করত। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তারা দেখল তাদেরই কিছু পরিচিত মধ্যবিত্তের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। পরে নীরবে তাদের কিছু সহায়তা দেয়া হল। তারা কিছুই বললেন না, সহায়তা নিলেন। পরে তারা বাছাই করে এমন আরও বেশকিছু পরিবারকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন।

সংগঠনটির সভাপতি নাসির মাহমুদ জানান, তাদের তহবিলেও এখন টান পড়েছে। যাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতাম, তারা এখন দিতে পারছে না। ফলে সংগঠনটির কার্যক্রমও সংকুচিত করতে হয়েছে। (যুগান্তর)
বার্তা কক্ষ, ২ জুলাই ২০২০

Share