মন্ত্রিসভায় কুমিল্লা থেকে স্থান পেল তিন মন্ত্রী

বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেলেনে কুমিল্লার তিন জন। তারা হলেন কুমিল্লা-৩ মুরাদনগর আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ্ব কাজী শাহ্ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, কুমিল্লা-৮ বরুড়া আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমন এবং কুমিল্লা-৬ সদর আসন থেকে প্রার্থী (স্বতন্ত্র) হয়েও দলের নির্দেশে সরে দাঁড়ানো হাজী আমীন-উর-রশিদ ইয়াছিন।

কুমিল্লা জেলা থেকে তিন মন্ত্রী পাওয়ায় কুমিল্লার সাধারণ মানুষের মাঝে বৈছে আনন্দের বন্যা। ইতোমধ্যে অভিবাদন ও শুভেচ্ছা পোস্টারে সয়লাব হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

কুমিল্লা-৩ মুরাদনগর আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আলহাজ্ব কাজী শাহ্ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। তিনি পেয়েছেন ধর্ম মন্ত্রনালয়।

আলহাজ্ব কাজী শাহ্ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন আলোচিত এবং বর্ষীয়ান ব্যক্তিত্ব। কাজী শাহ্ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল আশির দশকে। তিনি এখন পর্যন্ত মোট ৬ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন (১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ এবং ২০২৬)। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি জাতীয় পার্টির সাথে যুক্ত থাকা কালে জাতীয় পার্টি সরকারের সময় জাতীয় সংসদের হুইপ (১৯৮৯) এবং ধর্ম ও ওয়াকফ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী (১৯৯০) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন এবং বর্তমানে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কায়কোবাদ দীর্ঘদিন যাবৎ বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাণর করে আসছিলেন। তিনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী হিসেবে ১৩ বছরেরও বেশি সময় দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ১৩ বছরের নির্বাসন শেষে ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশে ফিরে আসেন এবং পরবর্তীতে আদালত তাকে ওই মামলা থেকে সসম্মানে খালাস প্রদান করেন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কায়কোবাদ ১ লাখ ৫৯ হাজার ২৫১ ভোট পেয়ে ষষ্ঠবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। নির্বাচনের আগে তার দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হলেও সুপ্রিম কোর্ট তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছিল। কায়কোবাদ মূলত একজন সফল উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী।

কুমিল্লা-৮ বরুড়া আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি পেয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী। জাকারিয়া তাহের সুমন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৮ বরুড়া আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে ১ লাখ ৬৯ হাজার ১শ ৭৮ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন।

বর্তমানে তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক। তিনি মূলত একজন ব্যবসায়ী। ২০২৬ সালের নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, তার বার্ষিক আয় ৫৯ কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি, যার একটি বড় অংশ আসে মূলধনি আয় এবং ব্যবসা থেকে। ২০০৮ সালে তিনি গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি অফিস প্রদান করেছিলেন। এ ছাড়াও তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার পিতা একেএম আবু তাহের ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি, ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং কুমিল্লা-৭ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।

এবং কুমিল্লা-৬ সদর আসন থেকে প্রার্থী (স্বতন্ত্র) হয়েও দলের নির্দেশে সরে দাঁড়ানো হাজী আমীন-উর-রশিদ ইয়াছিন। তিনি পেয়েছেন কৃষি, মৎস ও প্রাণিজ সম্পদ এবং খাদ্য মন্ত্রনালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ তিন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব।

কুমিল্লার বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবং শিল্পপতি বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হাজী আমীন-উর-রশিদ ইয়াছিন ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ সদর আসন থেকে বিএনপি’র প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও শেষ পর্যন্ত দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয় দলের চেয়ার পার্সনের উপদেষ্টা মনিরুল হক চৌধূরীকে। কুমিল্লা-৬ আসনে ইয়াছিনের মনোনয়ন নিয়ে তুমুল দাবি উঠে। তাঁর সমর্থক ও স্থানীয় শিক্ষার্থীরা তাঁর দাবিতে মশাল মিছিল ও বিক্ষোভও করেছিলেন। পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে মাঠে নামলেও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলের ঐক্য বজায় রাখতে হাজী ইয়াছিন নিজে প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন এবং নির্বাচনে কুমিল্লা দক্ষিণের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

হাজী আমীন-উর-রশিদ ইয়াছিন একজন অত্যন্ত সফল শিল্প উদ্যোক্তা। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে তার সততা ও অবদানের জন্য তিনি ১৩ বার সিআইপি (CIP) মর্যাদা লাভ করেছেন। এ ছাড়া তিনি ৪ বার শ্রেষ্ঠ করদাতা হিসেবে জাতীয় সম্মাননা এবং ১২ বার জাতীয় রপ্তানি ট্রফি (স্বর্ণ ও রৌপ্য) অর্জন করেছেন।

তিনি দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে কুমিল্লা সদর আসনে বিএনপির রাজনীতির হাল ধরে আছেন। ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে কুমিল্লা-৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের কাছে পরাজিত হন।

এদিকে, কুমিল্লায় তিনজন মন্ত্রী পাওয়ার খবরে কুমিল্লার সর্বস্তরের জনগণের মাঝে বইছে আনন্দের বন্যা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইতোমধ্যে এ নিয়ে অভিবাদন ও শুভেচ্ছা পোস্ট ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা।

পাশাপাশি গুঞ্জন রয়েছে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য সাবেক মন্ত্রী ও কুমিল্লা-১ দাউদকান্দি আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।

প্রতিবেদক: জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল,
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬