মতলব উত্তর

পরকীয়া জের : মতলবে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীর নবজাতক সন্তানের বাবা নিয়ে ধুম্রজাল

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় পরকীয়া প্রেমিকের ওরসে জন্ম নেয়া নবজাতক শিশুপুত্রের বাবা হিসেবে সাবেক ও প্রবাসী স্বামীর নাম দেয়া নিয়ে ধু¤্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।

নবজাতক জন্ম নেয়া সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল সূত্রে এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জানা যায়, গত ১৪ জুলাই মতলব মা ও শিশু হাসাপাতালে নুরুন্নাহার বেগম শিল্পী একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেন। ওখানে সন্তানের বাবার নামের স্থলে প্রকৃত বাবা তথা পরকীয়া প্রেমিকের নাম গোপন করে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়া কাতার প্রবাসী স্বামীর নাম দেন। এ নিয়ে দু’পরিবারে মাঝে পূর্বের মামলা চলমান থাকা অবস্থায় নতুন করে বিবাদ সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার ১০ নং পুর্ব ফতেপুর ইউনিয়নের সানাতের কান্দি গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন সিকদারের কন্যার সাথে একই ইউনিয়নের পাশ্ববর্তী সাহাবাজ কান্দি গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন ইব্রাহীমের ২০০৫ সালের ১ এপ্রিল পারিবারিক আয়োজনে বিবাহ হয়। পরবর্তীতে তাদের ঘরে ৫ বছরের ব্যবধানে দুটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়, এদেও একজন বয়স ১১, অপরজনের ৬ বছর।

বিয়ের ৩ বছর পরেই নুরুন্নাহার বেগম শিল্পী কথিত বাবার বন্ধু ও সাবেক ইউপি মেম্বার মাইনুদ্দিনকে চাচা ডাকার ছলে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন।

এ নিয়ে স্বামী ইব্রাহীম প্রথমে বিষয়টি সন্দেহের চোখে না দেখলেও দীর্ঘক্ষণ মোবাইলে কথা বলা নিয়ে শ্বশুর পক্ষকে জানান। তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে না নিয়ে, মাইনুদ্দিন শিল্পীর বাবার বন্ধু, তাই চাচা হিসেবে তার সাথে মোবাইলে কথা বলতেই পারে, এ নিয়ে সন্দেহ করা ঠিক হবে না বলে ইব্রাহীমকে উল্টো সতর্ক করে দেন।

কিন্তু মোবাইলে কথা বলার বছরখানেক ইতি না টানতেই ইব্রাহীমের ধারণাই সত্যি প্রমাণ করে শিল্পী পরকীয়ার টানে দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মাইনুদ্দিনের হাত ধরে চলে যায়।

এ নিয়ে দু’পরিবারের মাঝে সৃষ্ট বিবাদ সমাধানে শিল্পী বেগমকে কথিত চাচা ও পরকীয়া প্রেমিক মাইনুদ্দিনের কাছ থেকে ফিরিয়ে এনে ইব্রাহীমের ঘরে ফিরিয়ে দিতে গিয়েও ব্যর্থ হয়।

পরকীয়া প্রেমিকের সাথে বিয়েবহির্ভুত (প্রবাসী ইব্রাহীমের দাবি) ঘর সংসার করার দুই বছর পর ২০১৫ সালের ২ নভেম্বর শিল্পী বেগম তার স্বামী মো. ইব্রাহীম মিয়া ওরফে সাহাদাতসহ শ্বাশুড়ি, ননদ ও ননদের জামাতার বিরুদ্ধে চাঁদপুর আদালতে নারী নির্যাতনের মামলা (৫২৮/২০১৫) ও পারিবারিক আদালতে খরপোষের (৬১/২০১৭) মামলা দায়ের করেন।

মতলব উত্তর থানার তৎকালিন এসআই এনামুল হক ৩ মাস তদন্ত শেষে নারী নির্যাতন মামলার অভিযোগ থেকে শিল্পীর শুশুর-শ্বাশুড়ি ননদকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ইব্রাহীমের নামে চার্জশীট দেন।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী প্রবাসী ইব্রাহীম মিয়া ওরফে সাহাদাত জানান, ‘ আমি ২০০৫ সালে নুরুন্নাহার শিল্পীকে পারিবারিকভাবে বিয়ে করি। বিয়ের পরেই বুঝতে পারি তার বাবার বন্ধু গ্রাম্য চাচা মাইনুদ্দিনের সাথে পরকীয়া করে। সে থেকেই আমার সংসারে অশান্তি লেগেই থাকতো। ২০০৮ সালে আমার নামে মামলা করে আমিও এলাকার চেয়ারম্যান অফিসে লিখিত নালিশ করি।

শিল্পীর পরিবার স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে অমান্য করে মামলা করে। পরকীয়া নিভৃত করার কৌশল হিসেবে তাকে নিয়ে ঢাকায় এসে বসবাস করি। এতে সে ক্ষ্যান্ত না হয়ে মোবাইলে পরকিয়া চালিয়ে যায়। যদিও মাইনুদ্দিন তখন বিবাহিত ও একাধিক সন্তানের বাবা ছিলেন।

আমি ২০১৩ সালে কাতারে চলে যাই সেই সুযোগে শিল্পী তার বাবার বাড়িতে চলে যায় এবং সেখান থেকে পরকিয়া প্রেমিকের সাথে মতলব বাজার এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে তারা সংসার করে আসছে। আমি ২০১৫ সালে দেশে যাই গিয়ে তাকে তালাক দেই, এতে সে ক্ষীপ্ত হয়ে আমার নামে মিথ্যা বানোয়াট নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করে। ওই মামলার দুই বছর পার না হতেই ২০১৭ সালে খোরপোষের আরেকটি মামলা করে।

আমি বর্তমানেও প্রবাসে আছি, আমার সাথে শিল্পী বেগমের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে এবং তার সাথে আমার দু’টি মামলা চলমান। এ অবস্থায় গ্রেফতার আতংকে দেশে আসতে পারছি না। এছাড়া শিল্পীর সাথে আমার কোনো আপোষও হয়নি। মাইনুদ্দিনকে সে বিয়ে করেছে এমন প্রমাণও আমি স্থানীয় কাজি অফিস থেকে পাইনি। এখন নতুন করে তার পুত্র সন্তান জন্ম হয়েছে। সে সন্তানের বাবা আমি কিভাবে হতে পারি? এটি আমার বোধগম্য নয়।’

তিনি আরো জানান, ‘শিল্পী আমার বিরুদ্ধে অহেতুক হয়রানির উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দিয়েছে আর সে মাইনুদ্দিনকে বিয়ে করেছে বলে গ্রামের লোকজন জানলেও কিন্তুু কবিন করে নাই। লিভটুগেদারের (বিয়ে বহির্ভুত সম্পর্ক) মতো সেখানে থেকে বর্তমানে একটি বাচ্চার জন্ম দিয়েছে। বিষয়গুলো আড়াল করতেই নবজাতক এ সন্তানের বাবা হিসেবে হাসপাতালে আমার নাম দেখিয়েছে। এ সন্তানের বাবা আমি নই। আমি এ বিষয়টির সুষ্ঠ তদন্তপূর্বক মিথ্যা মামলা থেকে রেহাই পেতে চাই।’

এ বিষয়ে ১০ নং পুর্ব ফতেপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজমল হোসেন চাঁদপুর টাইমসকে জানান, ‘প্রবাসী ইব্রাহীম মিয়া ওরফে সাহাদাত হোসেনের বাবার কাছে শুনেছি, বিয়ে বিচ্ছেদ হওয়া নুরুন্নাহার বেগম শিল্পীর কিছুদিন আগে মতলবের একটি হাসপাতালে সন্তান জন্ম হয়েছে। সে নবজাতক সন্তানের পিতা হিসেবে হাসপাতালের রেজিস্টারে ইব্রাহীমের নাম দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আমি হাসপাতালের মালিকপক্ষের সাথে কথা বলেছি। তবে তারা তথ্য দিতে রাজি হয়নি। হাসপাতালটি অন্য থানায় তাই আমরাও বিষয়টি জানতে বেশি জোর করতে পারেনি ’

তিনি আরো জানান, ‘সাবেক মেম্বার মাইনুদ্দিন নুরুন্নাহার বেগম শিল্পীকে ২য় স্ত্রী হিসেবে বিয়ে করেছেন। বর্তমানে তারা মতলব শহরে থাকেন। আর তার প্রথম স্ত্রী ও সন্তানরা গ্রামের বাড়িতে থাকেন। পরকীয়ার বিষয়টি অনেক আগে নুরুন্নাহার শিল্পীর বাবা আমাকে অনেকটা নিরুপায় হয়ে জানিয়েছিলেন যে, মাইনুদ্দিন তাদের ওয়ার্ডের মেম্বার হওয়ায় মেয়ের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে তাকে কিছু বলতে পারছেন না। আমি তখন মাইনুদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করলে সে অস্বীকার করে। যদিও বর্তমানে তো শুনি শিল্পী তার ২য় স্ত্রী।’

এ বিষয়ে অভিযুক্ত নুরুন্নাহার বেগম শিল্পী বেগম চাঁদপুর টাইমসকে জানান, আমার কাছে ইব্রাহীমের দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে, আমি তাদেরকে লালন-পালনসহ পড়ালেখা করাচ্ছি। আমাদের দুটি মেয়ের ভবিষ্যৎ চিন্তা করেই এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

হাসপাতালে রেজিস্টারে সন্তানের বাবা হিসেবে সাবেক স্বামীর দেয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করে বলেন, ‘আমার প্রয়োজনে এটি দিয়েছি। সময় হলে এটার উত্তর জানা যাবে। এখন কিছু বলা যাবে না।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি চাঁদপুর টাইমসকে বলেন, ‘আমি ইব্রাহীমের ঘরে ১০ বছর সংসার করেছি, আইডি কার্ডে স্বামী হিসেবে তার নাম। এজন্যেই আমি ডিভোর্সের পরেও অনেক কিছুতেই স্বামী হিসেবে ইব্রাহীমের নাম দিতে হচ্ছে আইডি কার্ড পরিবর্তন হয়ে গেলে এ সমস্যা আর হবে না।’

এ বিষয়ে শিল্পী বেগমের ২য় স্বামী মাইনুদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও বক্তব্য জানা যায়নি।

ইব্রাহীম ও শিল্পীর পাশাপাশি গ্রাম হওয়ায় এ ঘটনায় দু’গ্রামের মানুষজন কিছুটা ক্ষুব্দ। তাদের দাবি শিল্পীর পরকীয়ার খেসরাত ৩টি পরিবারকেই দিতে হচ্ছে।

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট

Share